স্ত্রীদের পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ করা কি নবীর দ্বিচারিতার প্রকাশ?

ইসলামের ইতিহাস এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যক্তিগত জীবনকে যখন কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি বা আবেগ ছাড়া নিরপেক্ষ সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখা হয়, তখন একটি চরম বৈপরীত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে নিজের স্বার্থে সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানবিক নিয়ম ভেঙে ফেলা, আর অন্যদিকে নিজের মৃত্যুর পরও স্ত্রীদের ওপর চরম বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া—এই দুইয়ের বৈপরীত্যই মূলত তার চরিত্রকে তীব্র প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

নবী নিজে একাধিক বিবাহ করেছেন, বিবাহ ছাড়াও দাসী সহবত করেছেন এবং হীবা প্রথার মাধ্যমে মোহরানা ছাড়াই নারীদের গ্রহণ করার নিয়ম তৈরি করেছিলেন। এছাড়াও নিজের পালক পুত্রের প্রাক্তন স্ত্রীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সমাজের ‘দত্তক প্রথা’র মতো একটি মানবিক নীতি এক নিমেষে বাতিল করে দিয়েছিলেন এই অজুহাতে যে—পালক সন্তান কখনোই নিজের সন্তান নয়, রক্তসম্পর্ক ছাড়া কোনো পাতানো সন্তান বা পাতানো মা আসল সন্তান বা মা হতে পারে না। অথচ, এই একই ব্যক্তি নিজের মৃত্যুর আগে কুরআনের আয়াত নামিয়ে নিজের স্ত্রীদের মুসলিমদের “পাতানো মা” (উম্মুল মুমিনীন) ঘোষণা করে তাদের অন্য কাউকে বিয়ে করার অধিকার চিরতরে নিষিদ্ধ করে দিয়ে যান, যার কারণে তার সবেমাত্র যৌবনে পা রাখা যুবতী বিধবা স্ত্রীদেরও সারাজীবন বিয়ে ছাড়াই কাটাতে হয়েছিলো।

যেখানে নিজের কামনাবাসনা পূরণের জন্য শুধুমাত্র রক্তের সম্পর্ক না থাকার অজুহাতে দীর্ঘ সময় লালন-পালন সত্ত্বেও দত্তক সন্তান ও মাতাপিতার সম্পর্কের কোনো মান্যতা ছিল না এবং “পালক সন্তান সন্তান নয়” বলে নিয়ম তৈরি করে দত্তক প্রথা নিষিদ্ধ করে নিজ পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন, ঠিক সেখানেই নিজের মৃত্যুর পর স্ত্রীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তাদের জোর করে গোটা জাতির “পাতানো মা” ঘোষণা করে পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ করা—এটি এক চরম পর্যায়ের বৈপরীত্য ও ভণ্ডামির জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

এবিষয়ক বিস্তারিত তথ্য এবং প্রতিটি পয়েন্টে ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টদের গোঁজামিল ও সেগুলোর উপযুক্ত খণ্ডন নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ‘হীবা’ প্রথা, বিশেষাধিকার এবং আয়েশার ক্ষোভ

সাধারণ অনুসারীদের জন্য সর্বোচ্চ চারটি বিয়ের নিয়ম বেঁধে দেওয়া হলেও, মুহাম্মদের ক্ষেত্রে সেই সীমার কোনো প্রয়োগ ছিল না। তিনি কেবল একের পর এক বিয়েই করেননি, বরং যুক্ত করেছিলেন ‘হীবা’ প্রথা।
হীবা প্রথা হলো—কোনো নারী যদি কোনো মোহরানা বা অভিভাবকের মধ্যস্থতা ছাড়াই নিজেকে নবীর কাছে সমর্পণ করতে চান, তবে মুহাম্মদ তাকে গ্রহণ করতে পারবেন (সূরা আল-আহজাব, ৩৩:৫০)।

এই প্রথার পেছনে যে মানসিকতা কাজ করছিল, তা বুঝতে আয়েশার দুটি ঐতিহাসিক উক্তিই যথেষ্ট:
১. যখন খাওলা বিনতে হাকিমের মতো নারীরা নিজেদের নবীর কাছে হীবা করতে (বিনা মোহরানায় সমর্পণ করতে) আসতেন, তখন আয়েশা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “ঐ নারীদের কি লজ্জা করে না, যারা কোনো মোহরানা ছাড়াই একজন পুরুষের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে?” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫১১৩, তাওহীদ পাবলিকেশন্স)।
২. পরবর্তীতে যখন এই হীবা প্রথা এবং নবীর ইচ্ছা অনুযায়ী স্ত্রীদের কাছে যাওয়ার পর্যায়ক্রমিক বাধ্যবাধকতা শিথিল করে আয়াত নাজিল হলো, তখন আয়েশা ক্ষোভ ও কটাক্ষ চেপে রাখতে না পেরে সরাসরি মুহাম্মদকে বলেছিলেন, “আমি দেখছি আপনার রব আপনার ইচ্ছা ও কামনা পূরণে কত দ্রুত আয়াত নাজিল করেন!” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭৮৮, তাওহীদ পাবলিকেশন্স)।

এছাড়া আয়েশা থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ যতদিন না তার জন্য যেকোনো নারীকে গ্রহণ করা হালাল করা হয়েছে, ততদিন পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। যুদ্ধে প্রাপ্ত বন্দীদের ক্ষেত্রে দাসী হিসেবে গ্রহণ ও তাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বৈধতাও তিনি নিজের জন্য আমৃত্যু বহাল রেখেছিলেন।

অ্যাপোলজিস্টদের গোঁজামিল ও তার খণ্ডন:

  • অ্যাপোলজিস্টদের দাবি: ইসলাম প্রচারের স্বার্থে, রাজনৈতিক জোট গঠন এবং অসহায় নারীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য নবীর ৪টির বেশি বিয়ে এবং হীবা প্রথার দরকার ছিল।
  • খণ্ডন: রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কারণের দাবিটি একেবারেই ফাঁপা ও একটি চতুর অজুহাত মাত্র। আয়েশাকে ৬-৯ বছর বয়সে বিয়ে করার পেছনে কী রাজনীতি বা কূটনৈতিক কৌশল কাজ করেছিল? জয়নাব বিনতে জাহশের ক্ষেত্রে কি রাজনীতি ছিল, যিনি তার নিজের ফুফাতো বোন ছিলেন? আর রূপ দেখে যুদ্ধের বন্দীদের মধ্য থেকে সাফিয়া বা জুয়াইরিয়াকে নিজের জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে কিসের কূটনীতি? রাজনৈতিক জোটের বাহানা দিয়ে মূলত কামনাবাসনা ঢাকাই উদ্দেশ্য। বিশেষ করে ‘হীবা’ প্রথার কথা ধরলে তো সেখানে কোনো রাজনৈতিক কারণ বা বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না; কোনো ধরনের মোহরানা, আকদ বা সামাজিকভাবে রাজনৈতিক জোট গঠন ছাড়াই নারীদের সরাসরি ভোগ করার এই নিয়ম নিছকই যৌন সুবিধার ছাড়পত্র। রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রয়োজন থাকলে সাধারণ সামাজিক উপায়ে তা দেওয়া যেত, আইন ভেঙে নিজের জন্য বিশেষ সুবিধা বা বিনা মোহরানায় শরীর দান করার প্রথা তৈরি করার দরকার পড়ত না।
  • এর সাথে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, নবুয়ত ও নবুয়তের দাবির নেপথ্যে কোনো ঐশ্বরিক রাজনৈতিক ছক ছিল না, বরং ছিল সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক প্রভাব। খাদিজাকে বিয়ে করার পরেই মূলত তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের সাথে ঘনিষ্ট পরিচয়ের সুযোগ তৈরি হয়। ওয়ারাকা ছিলেন তৎকালীন সময়ে আব্রাহামিক ধর্ম, তোরাহ এবং বাইবেলের ওপর অগাধ পণ্ডিত ও আরবি ভাষায় অনুবাদকারী। তাঁর সংস্পর্শে এসেই মূলত ধর্মীয় জ্ঞান ও নবুয়তের ধারণার সূচনা ঘটে, যা পরবর্তীকালে নিজেকে নবী হিসেবে দাবি করার মূল ভিত্তি তৈরি করে।
  • তাছাড়া, ধর্মপ্রচার বা রাজনৈতিক জোটের স্বার্থে একাধিক বিয়ে করার এই যুক্তিটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে নবুয়তের সময়কাল ও আয়ুষ্কালের দিকে তাকালে।
  • প্রথমত, ইসলাম প্রচার এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করাই যদি প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে নবুয়ত কেন ৪০ বছর বয়সে এসে দেওয়া হলো? আল্লাহ চাইলে তো তাঁকে ১৮ বছর বয়সেই নবুয়ত দিতে পারতেন। যৌবনের শুরুতেই নবুয়ত পেলে ইসলাম প্রচারের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া যেত, তরুণ বয়সের শক্তি কাজে লাগিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যেত এবং কম বয়সে বিয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক জোট গঠনের সুযোগও বহুগুণ বাড়ত।
  • দ্বিতীয়ত, ধর্মপ্রচারের স্বার্থের কথা বলা হলেও তাঁকে মাত্র ৬২-৬৩ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা হলো কেন? সেই যুগেও মানুষ ৮০ থেকে ১০০ বছর বা তারও বেশি বাঁচত, এমনকি আজও মানুষ ১০০ বছর বাঁচে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যদি তাঁর নবীকে ১০০ বছর বাঁচিয়ে রাখতেন, তবে ধর্মপ্রচার আরও কত সুদৃঢ় ও ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করত! শুধু তা-ই নয়, নবীর দীর্ঘ উপস্থিতি নিশ্চিত করলে তাঁর মৃত্যুর পর সাহাবীদের মধ্যে ক্ষমতার রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব ঘটত না এবং শিয়া-সুন্নি উপদলে বিভক্ত হয়ে ইসলামের এই বিভাজন ও রক্তপাতও হয়তো এড়ানো যেত।
  • অতএব, যখন দেখা যায় জীবনের প্রথমভাগে ধনী খাদিজার অর্থ ও ওয়ারাকার ধর্মীয় রূপরেখার ওপর ভর করে নবুয়তের দাবি তৈরি করা হয়েছে, এবং শেষ বয়সে এসে একের পর এক বিশেষ সুবিধাভিত্তিক বিয়ে করা হয়েছে, অথচ নবুয়তের সময়কাল ও আয়ুষ্কাল ছিল তুলনামূলক সীমিত—তখন ‘ধর্মপ্রচার’ বা ‘রাজনৈতিক প্রয়োজনে বিয়ে’র এই অজুহাতটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন এবং নিজের সুবিধা হাসিলের এক চরম স্ববিরোধী রূপ হিসেবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২. বিবাহবহির্ভূত দাসী সহবত ও ‘ঐশ্বরিক’ বাণীর সুবিধাজনক প্রয়োগ

ঘরে একই সাথে নয়জন স্ত্রী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মুহাম্মদ প্রথাগত দাসী ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে দাসীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক (সহবত) আমৃত্যু বহাল রেখেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে তার দাসী মারিয়া আল-কিবতিয়াকে কেন্দ্র করে, যা স্পষ্ট করে দেয় কীভাবে পারিবারিক অসন্তোষ ও নিজের আচরণকে ঢাকা দিতে ‘ঐশ্বরিক বাণী’ ব্যবহার করা হয়েছিল।

ঘটনাটি ঘটেছিল নবীর অল্পবয়সী স্ত্রী হাফসার ঘরে। হাফসা বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনুমতি নিয়ে বের হওয়া মাত্রই মুহাম্মদ হাফসার নিজ বিছানায় দাসী মারিয়াকে নিয়ে সহবাসে লিপ্ত হন। কিন্তু হাফসা কোনো কারণে মাঝপথ থেকেই ফিরে আসেন এবং নিজ চোখে তার ঘরে ও নিজ বিছানায় দাসীর সাথে মুহাম্মদকে এই অবস্থায় দেখতে পান।

পারিবারিক মর্যাদাহানি ও অপমানের তীব্রতায় হাফসা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তোলেন, “আপনি আমার ঘরে, আমার অনুপস্থিতিতে এবং আমারই বিছানায় একজন দাসীর সাথে এই কাজ করলেন?” হাফসার এই তীব্র অসন্তোষ দেখে মুহাম্মদ তাকে শান্ত করতে কসম খেয়ে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি মারিয়াকে নিজের জন্য চিরতরে হারাম (নিষিদ্ধ) করে নিচ্ছেন এবং হাফসাকে অনুরোধ করেন ঘটনাটি যেন গোপন রাখা হয়।

কিন্তু হাফসা ঘটনাটি আয়েশাকে জানিয়ে দিলে সব স্ত্রীরা একত্রিত হয়ে মুহাম্মদের এই আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। সাধারণ নীতিতে এটি একটি চরম বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা হলেও, এখানেও পরিস্থিতি সামাল দিতে নাজিল করা হয় সূরা আত-তাহরীম (আয়াত ১-৫)।

১ নম্বর আয়াতে মুহাম্মদকে প্রশ্ন করা হয়:
“হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদের খুশি করার জন্য কেন তা নিজের জন্য হারাম করছেন?”

পরবর্তী আয়াতগুলোতে মুহাম্মদের অন্যায় ঢাকা তো দূরে থাক, উল্টো প্রতিবাদী স্ত্রীদের একযোগে তালাক দেওয়া এবং আল্লাহ তাকে আরও ভালো স্ত্রী এনে দেবেন—এমন হুমকি দিয়ে ধর্মীয় ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
এই পুরো ঘটনার স্পষ্ট সনদ রয়েছে ইসলামী গ্রন্থগুলোতে:

অ্যাপোলজিস্টদের গোঁজামিল ও তার খণ্ডন:

  • সহীহ নাসায়ী (হাদিস নম্বর ৩৯৫৯): আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীর একটি দাসী ছিল, যার সাথে তিনি সহবাস করতেন। আয়েশা ও হাফসা (রা.) এই নিয়ে তার পেছনে লেগে থাকলে নবী ঐ দাসীকে নিজের জন্য হারাম করেন। তখন আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন—”হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি তা কেন হারাম করছেন?”

    এত বড় বিতর্কের পরেও মুহাম্মদ দাসী সহবত বন্ধ করেননি। তিনি মারিয়াকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিয়ে সেখানে যাওয়া-আসা অব্যাহত রাখেন এবং একপর্যায়ে স্ত্রীদের ওপর রাগ করে পুরো এক মাস তাদের ছেড়ে ওই দাসীর সাথেই অবস্থান করেন। নয়জন স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও দাসী সম্ভোগ এবং স্ত্রীরা নিজের অধিকারের প্রশ্নে প্রতিবাদ করলে কোরআনের আয়াত নামিয়ে তালাকের হুমকি দেওয়া—নিজের কামনাবাসনা ও সুবিধাকে টিকিয়ে রাখতে ধর্মীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের অন্যতম প্রমাণ।

  • অ্যাপোলজিস্টদের দাবি: মারিয়াকে মিশর থেকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল এবং তৎকালীন আরব সংস্কৃতিতে দাসীদের সাথে মেলামেশা বৈধ ছিল। আর সূরা তাহরীমের আয়াত নাজিল হয়েছিল মধুপানের ঘটনার জন্য, দাসী সহবাসের জন্য নয়।
  • খণ্ডন: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পরিভাষায় কিংবা যেকোনো ভাষার অলংকারশাস্ত্রে কোনো স্পর্শকাতর শব্দকে সরাসরি না বলে সুন্দর বা মার্জিত রূপক দিয়ে প্রকাশ করাকে ‘ব্যঞ্জনা’ বা ‘ইউফেমিজম’ (Euphemism) বলা হয়। বিশেষ করে যৌনতা বা সহবাস সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমাজে কিংবা প্রাচীন সাহিত্যে সরাসরি উচ্চারণ না করে রূপক ভাষায় প্রকাশ করার প্রথা নতুন কিছু নয়।
  • ইসলামিক টেক্সট এবং আরব সংস্কৃতিতেও সহবাস বা যৌন মিলনের আনন্দ ও শারীরিক সম্পর্ক প্রকাশ করতে ‘মধুপান’ বা ‘মধুর স্বাদ আস্বাদন’ শব্দটি রূপক হিসেবে ব্যবহার করার একাধিক স্পষ্ট নজির রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি বিখ্যাত হাদিসে (রিফা’আ আল-কুরাযীর স্ত্রীর হাদিস) নবী মুহাম্মদ নিজে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর তার পূর্ববর্তী স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার (হালালা) শর্ত হিসেবে স্পষ্টভাবে সহবাসের বিকল্প হিসেবে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন। হাদিসে এসেছে— “যতক্ষণ না সে তোমার মধুর স্বাদ এবং তুমি তার মধুর স্বাদ আস্বাদন করছো (অর্থাৎ যতক্ষণ না তোমরা সহবাস করছ)।”
  • এই হাদিসটির স্পষ্ট রেফারেন্স নিচে দেওয়া হলো:
  • সহীহ বুখারী: তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বর ২৬৩৯ (এছাড়াও ২৬৪০, ৫২৬১, ৫২৬৫, ৫৮২৫ ও ৬০৮৪ নম্বর হাদিস)।
  • সহীহ মুসলিম: ইসলামিক ফাউন্ডেশন / তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বর ৩৪৩৯।

    অর্থাৎ, ইসলামী ফিকহ ও রূপক ভাষায় ‘মধুপান’ বা ‘মধুর স্বাদ’ মানেই হলো যৌন মিলনের চরম আনন্দ বা সহবাস।
    এখন অ্যাপোলজিস্টদের দাবিটি বিশ্লেষণ করা যাক। তারা প্রায়ই আসল ঘটনাকে আড়াল করতে একটি বালখিল্য গল্প সামনে আনে যে—নবী তার স্ত্রী জয়নাব বিনতে জাহশের ঘরে সাধারণ মধু পান করেছিলেন, আর আয়েশা ও হাফসা হিংসা করে নবীর মুখে দুর্গন্ধের অযুহাত বানিয়েছিলেন!
  • একজন সাধারণ বিবেকবান মানুষ মাত্রই বোঝেন যে, এটি কত বড় একটি গোঁজামিল। একজন নবীর মুখে সামান্য মধু পানের কারণে তার ঘরে এমন কী মহাপ্রলয় ঘটে গেল যে, সমগ্র রাজপ্রাসাদ ও পরিবারে চরম অস্থিরতা তৈরি হলো? সামান্য মধু পানের অপরাধে কি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ তার স্ত্রীদের ওপর এক মাসের জন্য রাগ করে দূরে থাকে? কিংবা সামান্য মধু পানের পারিবারিক কলহ থামাতে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তাকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আয়াত নাজিল করতে হয়? তার চেয়েও বড় কথা, সাধারণ মধু পানের প্রতিবাদ করার জন্য কি কোনো নবীর স্ত্রীদের কোরআনের বাণী নামিয়ে একযোগে ‘তালাক দেওয়ার’ এবং ‘অন্য নারী এনে প্রতিস্থাপন করার’ মতো চূড়ান্ত হুমকি দিতে হয়? এটি একটি সাধারণ বুদ্ধির মানুষের কাছেও অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর শোনায়।
  • বাস্তবতা হলো, রূপক অর্থে ‘মধু পান’ বলা হোক কিংবা সরাসরি বলা হোক—মূল ঘটনা ছিল হাফসার ঘরে, হাফসার অনুপস্থিতিতে ও তার নিজ বিছানায় দাসী মারিয়া আল-কিবতিয়ার সাথে নবীর শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন। হাফসা নিজ চোখে তার বিছানায় নিজের স্বামীকে দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে দেখেন এবং একে নিজের জন্য চরম অপমানজনক মনে করেন। নিজের বিশ্বাসভঙ্গ ঢাকা দিতে এবং ক্ষুব্ধ হাফসাকে শান্ত করতে নবী তখন কসম খেয়ে মারিয়াকে নিজের জন্য হারাম (নিষিদ্ধ) করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু হাফসা তা আয়েশাকে জানিয়ে দিলে সব স্ত্রীরা একজোট হয়ে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। এমনকি এবিষয়ে তাফসিরকারকদের মধ্যে যে দুটি মত আছে তার মধ্যে শক্তিশালী মতটিই হলো দাসী মারিয়া কিবতিয়ার সাথে সহবাস করা সম্পর্কিত মতটি।
  • অ্যাপোলজিস্টদের সব ধরনের গোঁজামিলকে ধুলিসাৎ করে দেয় সহীহ নাসায়ীর ৩৯৫৯ নম্বর সহীহ হাদিস (ইসলামিক ফাউন্ডেশন / তাওহীদ পাবলিকেশন)। যেখানে স্পষ্টভাবে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে—নবীর একটি দাসী ছিল, যার সাথে তিনি সহবাস করতেন। আয়েশা ও হাফসা এই নিয়ে তার পেছনে লাগলে নবী ঐ দাসীকে নিজের জন্য হারাম ঘোষণা করেন। ঠিক তখনই আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন— “হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি তা কেন হারাম করছেন?” (সূরা আত-তাহরীম: ১)।

    ​এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে উপহার পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে। মিশরের তৎকালীন খ্রিস্টান শাসক মুকাওকিস (Muqawqis) নবীর কাছে উপহার হিসেবে দুজন দাসী পাঠিয়েছিলেন—মারিয়া আল-কিবতিয়া এবং তার বোন সিরিন। মানুষ সাধারণত কাউকে কোনো উপহার দিলে তার পছন্দ-অপছন্দ ও রুচির ওপর ভিত্তি করেই উপহার দেয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তৎকালীন শাসকরাও বুঝতেন যে নবীর কাছে সুন্দরী দাসী বা নারী উপহার পাঠানোটা অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি বিষয়।
  • ​এখন কথা হচ্ছে, নিজেকে নবুয়তের ও মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি দাবি করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো উপহার পান যা মানবতাবিরোধী বা দাসপ্রথার রূপ, তবে তার প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত ছিল? তিনি কি সরাসরি সেই শাসককে বার্তা পাঠাতে পারতেন না যে দাসীকে দাসী হিসেবে উপহার না দিয়ে তাদের মুক্ত ঘোষণা করা হোক? এমনকি শাসককে অসম্মান না করে উপহার গ্রহণের পর ওই দুই দাসীকে সাথে সাথে মুক্ত করে দিয়ে সমাজে এক নজিরবিহীন মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সম্পূর্ণ সুযোগও তার কাছে ছিল। কারণ আইয়ামে জাহেলিয়াত বা প্রাক-ইসলামী যুগেও আরবরা বিভিন্ন আনন্দ বা শুভ ঘটনা উপলক্ষে দাস-দাসী মুক্ত করত এবং দাস-দাসী মুক্ত করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু নবী তা করেননি; মারিয়ার বোনকে অন্য একজনকে দিয়ে নিজে মারিয়াকে রেখে দেন এবং সারাজীবন তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখেন।
  • ​সাংস্কৃতিক বৈধতার দোহাই দিয়ে বা ‘উপহার’ হিসেবে পাওয়ার দোহাই দিয়ে নিজ স্ত্রীর বিছানায় দাসীকে নিয়ে যাওয়া, স্ত্রীকে দেওয়া কসম ভঙ্গ করা এবং দাসীকে মুক্ত না করে আজীবন সহবত করে যাওয়াকে কোনো অবস্থাতেই কোনো নীতিবান মানুষের আচরণ বলা যায় না। আর এই ব্যক্তিগত বিশ্বাসভঙ্গ ও পারিবারিক ক্ষোভ সামাল দিতে যখন ঐশ্বরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে স্ত্রীদের তালাকের হুমকি দেওয়া হয়, তখন তা আর নীতি-নৈতিকতার পর্যায়ে থাকে না—তা হয়ে দাঁড়ায় নিজের কামনাবাসনা ও সুবিধাকে রক্ষা করার জন্য ধর্মীয় শক্তির এক চরম অপব্যবহার।

৩. দত্তক প্রথা বিলোপ বনাম জোরপূর্বক “পাতানো মা” বানানো

তৎকালীন আরব সমাজে দত্তক বা পালক সন্তানকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ ও অধিকার দেওয়া হতো। কিন্তু যখন মুহাম্মদ তার পালক পুত্র জায়েদ বিন হারিসার স্ত্রী জয়নাবের প্রতি আকৃষ্ট হন, এবং লোকলজ্জার ভয়ে পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারছিলেন না, ঠিক তখনই সেই প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে রাতারাতি বদলে ফেলা হয়।
নাজিল করা হয় সূরা আল-আহজাবের ৩৭ নম্বর আয়াত। যুক্তি দেওয়া হলো—দত্তক নেওয়া সন্তান আসল সন্তান নয়, তাই পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করাতে কোনো বাধা নেই। একটি মানবিক সামাজিক প্রথাকে বাতিল করতে তার বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয়নি।
কিন্তু মূল টুইস্ট বা চরম ভণ্ডামিটি সামনে আসে ঠিক এর পরেই। নিজের বেলায় “পাতানো সম্পর্ক সন্তান বা মা নয়” বলে প্রথা ভাঙলেও, নিজের স্ত্রীদের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো নীতি গ্রহণ করা হলো। সূরা আল-আহজাবের ৫৩ নম্বর আয়াতে নবীর স্ত্রীদের মুমিনদের “মা” ঘোষণা করা হলো এবং তাদের জন্য পুনর্বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ করা হলো।

নিজের সুবিধার সময় পাতানো সম্পর্ক কোনো সম্পর্কই নয়, কিন্তু নিজের মৃত্যুর পর অল্পবয়সী স্ত্রীরা যাতে অন্য কারো সংসার না করতে পারে, সেজন্য তাদের বানিয়ে দেওয়া হলো পুরো জাতির “পাতানো মা”! নিজের স্বার্থে নীতি তৈরি এবং নিজের স্বার্থেই নীতি উল্টে দেওয়ার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? শুধুমাত্র রক্তের সম্পর্ক না থাকার কারণে এতদিন একটি শিশুকে লালন পালন করা সত্ত্বেও ওই সন্তান নাকি সন্তান হয় না, অথচ কোন ধরনের রক্তের সম্পর্ক এবং পরিচয় বা লালন-পালন ছাড়া এই নবীর স্বার্থে পাতানো মা নাকি মা হয়ে যায়। আসলে এটাকে ভণ্ডামির চূড়ান্ত লেভেল বলে।


অ্যাপোলজিস্টদের গোঁজামিল ও তার খণ্ডন:

  • অ্যাপোলজিস্টদের দাবি: দত্তক প্রথা ছিল একটি সামাজিক ‘কুসংস্কার’ এবং উত্তরাধিকার আইন স্পষ্ট করতেই পালক পুত্রকে বঞ্চিত করে এটি বাতিল করা হয়েছিল।
  • খণ্ডন: দত্তক প্রথা কোনো কুসংস্কার ছিল না; এটি ছিল নিঃসন্তান দম্পতি এবং অনাথ শিশুদের জন্য একটি অত্যন্ত কল্যাণকর সামাজিক ব্যবস্থা। শুধুমাত্র নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে একটি মহা মানবিক প্রথাকে ‘কুসংস্কার’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করা হয়। আর উত্তরাধিকার আইনের কথা বললে, দত্তক সন্তানকে সম্পদ দেওয়ার তো হাজারো উপায় ছিল (যেমন অসিয়ত করা), তাকে বঞ্চিত করে দত্তক প্রথাই তুলে দেওয়া কতটা অমানবিক! তাছাড়া এর আগেও তো উত্তরাধিকারের বিভিন্ন নিয়ম নির্ধারিত হয়েছিল, তখন কি পালক পুত্রের প্রথা বাতিল করতে হয়েছিল? জায়েদের স্ত্রীকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি, কিন্তু ঠিক যখনই নিজ পালক পুত্রের স্ত্রী পছন্দ হলো, তখনই রাতারাতি ‘ঐশ্বরিক আদেশে’ দত্তক প্রথা অবৈধ হয়ে গেল। এটা কি কাকতালীয় নাকি নিজের উদ্দেশ্য সাধনের নগ্ন রূপ?

৪. স্ত্রীদের জন্য পুনর্বিবাহের নিষেধাজ্ঞা: যৌবনের ওপর চিরস্থায়ী শৃঙ্খল

মুহাম্মদের এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তের বলি হতে হয়েছিল তার মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া তরুণী স্ত্রীদের। মুহাম্মদের মৃত্যুর সময় তাদের বয়স ছিল জীবনের একদম প্রারম্ভে:

  • আয়েশার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
  • সাফিয়ার বয়স ছিল ২১ বছর।
  • জুয়াইরিয়ার বয়স ছিল ২৩ বছর।
  • হাফসার বয়স ছিল ২৬ বছর।

যে বয়সে একজন নারী স্বাভাবিক জীবন, সংসার, ভালোবাসা এবং মাতৃত্বের পূর্ণ আশা রাখে, ঠিক সেই সময়ে—যৌবনে পা দেওয়ার পরপরই—তাদের ওপর চিরদিনের জন্য বৈবাহিক সুখ বঞ্চিত রাখার ধর্মীয় আদেশ চাপিয়ে দেওয়া হয়। আয়েশা তার জীবনের পরবর্তী প্রায় ৪০ বছর একাকী কাটাতে বাধ্য হন।
মুহাম্মদ নিজে বহুবিবাহ, দাসী সম্ভোগ এবং হীবা প্রথার পূর্ণ স্বাধীনতা শেষদিন পর্যন্ত উপভোগ করলেও, নিজের মৃত্যুর পর সেই তরুণী স্ত্রীরা যাতে অন্য কারো সাথে জীবন সাজাতে না পারে, সেই পথ জোরপূর্বক “মা” বানানোর দোহাই দিয়ে চিরতরে বন্ধ করে যান।

অ্যাপোলজিস্টদের গোঁজামিল ও তার খণ্ডন:

  • অ্যাপোলজিস্টদের দাবি: নবীর স্ত্রীরা ছিলেন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, তাই তাদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার্থেই তাদের পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
  • খণ্ডন: ‘সম্মানের’ দোহাই দিয়ে কোনো মানুষের প্রেম, পরিবার ও স্বাভাবিক জীবন কাটানোর মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া এক ধরনের চরম নির্যাতন। যদি মর্যাদা রক্ষার্থেই বিয়ে বন্ধ করার যুক্তি সত্যি হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—মুহাম্মদ নিজে কেন প্রথম স্ত্রী খাদিজার মৃত্যুর পর বা অন্যান্য স্ত্রীদের মৃত্যুর পর একাধিক বিয়ে করলেন? সর্বকালের সবচেয়ে ‘মর্যাদাবান’ ব্যক্তি হয়েও যদি তিনি নিজে একের পর এক বিয়ে করতে পারেন এবং এত নারীর সাথে মেলামেশা করতে পারেন, তবে তার মর্যাদায় তো কোনো টান পড়েনি! তাহলে তার মৃত্যুর পর কেবল তরুণী স্ত্রীদের বেলাতেই কেন ‘মর্যাদার দোহাই’ দিয়ে সাধারণ মানবিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো? নিজের বেলায় অফুরন্ত স্বাধীনতা ভোগ করা আর অন্যদের বেলায় ‘মর্যাদার মোড়ক’ গায়ে দিয়ে বন্দি করা—এটিকে পরিষ্কারভাবে চরম ঈর্ষাপরায়ণতা এবং একনায়কতান্ত্রিক ভণ্ডামি বলা ছাড়া উপায় নেই।

উপসংহার

নিজের বেলায় আইনের সমস্ত শিথিলতা ও বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করা, নিজের কামনার সামনে সামাজিক প্রথাকে ধূলিসাৎ করা, আর নিজের মৃত্যুর পর অল্পবয়সী স্ত্রীদের “পাতানো মা” বানিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া—এটিকে কোনো মানবিক বা আদর্শ চরিত্রের নিদর্শন বলা যায় না। এটি কেবলই ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতিহীনতা এবং এক চরম অমানবিক সিদ্ধান্তের বহির্প্রকাশ।

তথ্যসূত্র (প্রকাশনীসহ)

১. হীবা প্রথা, বিশেষ অধিকার ও আয়েশার হাদিস:

  • কোরআন: সূরা আল-আহজাব (৩৩:৫০)।
  • সহীহ বুখারী: কিতাবুত তাফসীর, হাদীস নম্বর ৪৭৮৮ (আয়েশার উক্তি: “আপনার রব আপনার ইচ্ছা পূরণে কত দ্রুত আয়াত নাজিল করেন”)।
  • সহীহ বুখারী: কিতাবুন নিকাহ, হাদীস নম্বর ৫১১৪ (খাওলা বিনতে হাকিম ও আয়েশার মন্তব্য সংক্রান্ত হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশনী)।
    ২. দাসী সহবত ও মারিয়া আল-কিবতিয়ার ঘটনা:
  • কোরআন: সূরা আত-তাহরীম (৬৬:১-৫)।
  • সহীহ নাসায়ী: হাদীস নম্বর ৩৯৫৯ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশনী)।
    ৩. দত্তক প্রথা বাতিল ও “পাতানো মা” বানিয়ে বিয়ে নিষেধাজ্ঞা:
  • কোরআন: সূরা আল-আহজাব (৩৩:৩৭) – পালক সন্তান যে নিজের সন্তান নয় তার ঘোষণা।
  • কোরআন: সূরা আল-আহজাব (৩৩:৫৩) – স্ত্রীদের উম্মুল মুমিনীন (বিশ্বাসীদের মাতা) ঘোষণা ও তাদের পুনর্বিবাহে চিরতরে নিষেধাজ্ঞা।
  • তাফসীর ইবনে কাছীর: খণ্ড ৮, সূরা আল-আহজাবের ৩৭ ও ৫৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা (দারুসসালাম / ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
    ৪. স্ত্রীদের বয়স ও পরবর্তী জীবন:
  • আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ইমাম ইবনে কাছীর রচিত, খণ্ড ৫ ও খণ্ড ৮ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
  • সহীহ বুখারী: হাদীস নম্বর ৩৮৯৪ ও ৫০১৭ (আয়েশার বয়স সংক্রান্ত বিবরণ)।

Related Posts

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামী ধর্মগ্রন্থে প্রাণী সংক্রান্ত নানা বিতর্কিত নির্দেশনার কথা অনেকেরই জানা, তবে উদ্ভিদের মতো একটি সম্পূর্ণ অচেতন ও নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতি ধর্মীয় বিদ্বেষ আরোপের ঘটনাও কিন্তু কম নয়। পরিবেশ সুরক্ষা ও বৃক্ষরোপণের কথা বলে ইসলামকে অনেক সময় পরিবেশবান্ধব হিসেবে প্রচার করা হলেও, হাদিস ও কোরআনের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় সেখানে নির্দিষ্ট কিছু গাছকে ‘শত্রুর গাছ’ বা ‘অভিশপ্ত বৃক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কেবল অলৌকিক…

Read more

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামের উত্তরাধিকার আইন  নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি কথা প্রায়ই শোনানো হয় যে, “ইসলামে নারীরা কেবল অর্ধেক পায় না, বরং বহু ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও বেশি সম্পত্তি পায়।” কিন্তু আইনের তুলনামূলক মূলনীতি এবং সম-পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিচারে এই দাবিটির বাস্তবতা কতটুকু, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোনো আইনের সমতা বা বৈষম্য পরিমাপ করতে হয় একই স্তরের দুটি আফটার-ইফেক্ট বা সম-পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে। অসদৃশ অবস্থার সাথে অসম তুলনা টেনে নারীর অধিকারকে বেশি…

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন