ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামের উত্তরাধিকার আইন  নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি কথা প্রায়ই শোনানো হয় যে, “ইসলামে নারীরা কেবল অর্ধেক পায় না, বরং বহু ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও বেশি সম্পত্তি পায়।” কিন্তু আইনের তুলনামূলক মূলনীতি এবং সম-পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিচারে এই দাবিটির বাস্তবতা কতটুকু, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কোনো আইনের সমতা বা বৈষম্য পরিমাপ করতে হয় একই স্তরের দুটি আফটার-ইফেক্ট বা সম-পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে। অসদৃশ অবস্থার সাথে অসম তুলনা টেনে নারীর অধিকারকে বেশি হিসেবে দেখানো আইনি যুক্তির সাথে মেলে না।

নিচে ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের বিস্তারিত হিসেব এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নারীর সম্পত্তি প্রাপ্তির আসল চিত্র পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো।

Table of Contents

১. যেসব ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পায়

ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে একই রক্তের সম্পর্ক ও একই প্রজন্মের আত্মীয়দের মধ্যে যখন বণ্টন করা হয়, তখন নারী পুরুষের অর্ধেক অংশ পায়।

​১.১ সন্তান হিসেবে (ভাই ও বোনের তুলনা): 

মৃত ব্যক্তির যদি ছেলে এবং মেয়ে উভয়ই থাকে, তবে ছেলে পাবে ২ ভাগ এবং মেয়ে পাবে ১ ভাগ (সূরা নিসা: ১১)। অর্থাৎ সন্তান হিসেবে ভাই যে পরিমাণ সম্পত্তি পাবে, বোন সবসময় তার ঠিক অর্ধেক অংশ পাবে।

১.২ একমাত্র সন্তান হিসেবে (একমাত্র ছেলে বনাম একমাত্র মেয়ে):

যদি কোনো ব্যক্তির মাত্র একটি ছেলে সন্তান থাকে, তবে সেই ছেলে একা বাবার রেখে যাওয়া ১০০% সম্পত্তিই আসাবা (অবশিষ্টভোগী) হিসেবে পেয়ে যায়। এখানে চাচা বা অন্য দূরের আত্মীয়রা কোনো সম্পত্তি পায় না। 

কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির মাত্র একটি মেয়ে সন্তান থাকে, তবে সেই মেয়ে কখনোই ১০০% সম্পত্তি পায় না। কোরআনের বিধান অনুযায়ী সে পাবে ঠিক ৫০% (অর্ধেক)। বাকি ৫০% সম্পত্তি চলে যাবে মৃতের ভাই (মেয়েটির চাচা) বা অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়দের কাছে। (উল্লেখ্য: অনেকে এটিকে “মেয়ে চাচার চেয়ে বেশি পেল” বলে দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তুলনাটি চাচার সাথে নয়, মূল তুলনাটি একমাত্র ছেলের সাথে। একমাত্র ছেলে একা ১০০% পেলেও একমাত্র মেয়ে পায় ৫০%, যা স্পষ্ট নির্দেশ করে এখানে কন্যা সন্তান অর্ধেকই পাচ্ছে।)

১.৩ বৈবাহিক সূত্রে সম্পত্তি বণ্টন: স্বামী বনাম স্ত্রীর তুলনা

দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্ত্রী মারা গেলে স্বামী যে অধিকার পান, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী তার অর্ধেক অধিকার পান। অর্থাৎ এখানেও নারীর অংশ পুরুষের অর্ধেক।

১. সন্তান না থাকলে:

স্ত্রী মারা গেলে এবং তাদের কোনো সন্তান না থাকলে, স্বামী পায় স্ত্রীর মোট সম্পত্তির ৫০% (অর্ধেক)।

অন্যদিকে স্বামী মারা গেলে এবং কোনো সন্তান না থাকলে, স্ত্রী পায় স্বামীর মোট সম্পত্তির মাত্র ২৫% (এক- চতুর্থাংশ)।

২. সন্তান থাকলে:

স্ত্রী মারা গেলে এবং তাদের সন্তান থাকলে, স্বামী পায় ২৫% (এক-চতুর্থাংশ)।

অন্যদিকে স্বামী মারা গেলে এবং সন্তান থাকলে, স্ত্রী পায় মাত্র ১২.৫% (এক-অষ্টমাংশ)।

(এখানে স্পষ্ট যে, বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতেও নারী বা স্ত্রী পুরুষের তুলনায় সবসময় অর্ধেক অংশই পেয়ে থাকেন।)

২. যেসব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান সম্পত্তি পায়

উত্তরাধিকার ব্যবস্থার কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে নারী ও পুরুষের অংশের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি; দুজনকেই সমান অংশ দেওয়া হয়েছে।

২.১ সন্তানের সম্পত্তিতে মা ও বাবার অংশ:

কোনো সন্তান মারা গেলে এবং তার নিজের সন্তান (মৃতের সন্তান) থাকলে, মৃত ব্যক্তির মা এবং বাবা উভয়েই ১/৬ (ছয়দশের এক ভাগ) করে সমান সম্পত্তি পান। এখানে মা (নারী) ও বাবা (পুরুষ) সমান অংশ পেয়ে থাকেন।

২.২ মায়ের দিকের ভাই-বোন (বৈমাত্রেয়/বৈপিত্রেয় ভাই-বোন):

মা এক কিন্তু বাবা আলাদা—এমন ভাই ও বোনের ক্ষেত্রে মৃতের সম্পত্তিতে তারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান অংশ (১/৬ বা ১/৩) পেয়ে থাকেন।

৩. ইসলামে নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে প্রচলিত ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

তাহলে কেন বলা হয় নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায় এবং এই ভুল ধারণা কিভাবে প্রচলিত হয়েছে?

ইসলামিক স্কলার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভুল ধারণাটি মূলত তৈরি হয়েছে ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের কিছু বিরল ও দূরবর্তী সম্পর্কের উদাহরণকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে। তারা দাবি করেন যে  আইনে নাকি এমন বহু ক্ষেত্র আছে যেখানে নারীরা পুরুষের সমান বা পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পান। কিন্তু বাস্তব আইনি ও গাণিতিক বিচারে এই দাবিগুলোর পেছনে যে বিভ্রান্তি রয়েছে, তা নিচের ভুল ধারণাগুলোর খণ্ডনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভুল ধারণা ১: “নারীরা দুই দিক থেকে সম্পত্তি পায়, কিন্তু পুরুষ পায় না”

খণ্ডন: এটি অত্যন্ত প্রচলিত একটি ভুল ধারণা। বলা হয় নারী বাবার বাড়ি এবং স্বামীর বাড়ি—দুই জায়গা থেকেই সম্পত্তি পায়, তাই পিতৃসম্পত্তিতে অর্ধেক পেলেও সার্বিকভাবে নাকি নারীই বেশি পায়। এই যুক্তির মূল কৌশলটি হলো, এতে চালাকি করে পুরুষের ঠিক একই অধিকার গোপন রাখা হয়। একজন পুরুষও তার বাবার সম্পত্তি পায় এবং স্ত্রী মারা গেলে স্ত্রীর সম্পত্তিও পায়।

বরং বাস্তব সত্য হলো, পুরুষ দুই দিক থেকে পাওয়ার পাশাপাশি দুটো জায়গাতেই নারীর চেয়ে দ্বিগুণ লাভ করে। স্ত্রী মারা গেলে স্বামী পায় ৫০% বা ২৫%, কিন্তু স্বামী মারা গেলে স্ত্রী পায় মাত্র ২৫% বা ১২.৫%। অর্থাৎ দুই দিক থেকে পাওয়ার খেলায়ও সম্পূর্ণভাবে নারী পুরুষের চেয়ে অর্ধেক পায়। সুতরাং এই যুক্তি দিয়ে পিতৃসম্পত্তির বৈষম্য ঢাকা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।

ভুল ধারণা ২: “দূরসম্পর্কের নিকটাত্মীয়ের চেয়ে নারী বেশি পায়, সুতরাং নারী বেশি পেল”

খণ্ডন: ইসলামিক স্কলারগণ প্রায়ই একটি উদাহরণ দেন যে মৃত ব্যক্তির এক কন্যা থাকলে সে একা পায় ৫০% সম্পত্তি, আর দূরসম্পর্কের চাচারা সবাই মিলে পায় বাকি ৫০%। ফলে কন্যা একা এক চাচার চেয়ে বেশি পেল। কিন্তু এটি একটি আইনি বিভ্রান্তি। উত্তরাধিকার আইনে যে রক্তের সম্পর্কে যত কাছে, সে এমনিতেই বেশি সম্পত্তি পাবে—তা সে নারী হোক বা পুরুষ।

মূল তুলনা তো হতে হবে একই স্তরের ও সম-পর্যায়ের মানুষের সাথে। একমাত্র কন্যা যেখানে ৫০% পায়, সেখানে একমাত্র পুত্র একা পেয়ে যায় ১০০%। সম-পর্যায়ের পুত্রের সাথে তুলনা না করে দূরসম্পর্কের চাচার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তুলনা টেনে “নারী বেশি পাচ্ছে” দাবি করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

ভুল ধারণা ৩: “দেনমোহর দিয়ে পিতৃসম্পত্তির অর্ধেকের ঘাটতি পূরণ করা হয়”

খণ্ডন: দাবি করা হয় যে বিয়ের সময় দেনমোহর পাওয়ার কারণে নারীর পিতৃসম্পত্তির অর্ধেকের ঘাটতি মিটে যায়। তবে বাস্তবতা হলো দেনমোহর কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা বংশানুক্রমিক জমির বিকল্প হতে পারে না। এটি একটি এককালীন সামান্য উপহার বা অর্থ, যার সিংহভাগ সমাজে নারীরা কখনোই হাতে পান না।

বৈবাহিক চুক্তির একটি সামান্য উপহারকে নিজ জন্মগত পিতৃসম্পত্তির স্থায়ী অধিকারের সাথে মেলানো এবং তা দিয়ে ৫০% ঘাটতি ঢেকে দেওয়া আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অকৃত্রিম ও কৃত্রিম অজুহাত। আর সেই অজুহাত দেখিয়ে নারীরা সম্পত্তি বেশি পায় এমনটি দাবি করা আরও বড় অসততা।

ভুল ধারণা ৪: “ভরণপোষণের আর্থিক দায়িত্বের অজুহাত”

খণ্ডন: এই দাবিতে বলা হয়, পুরুষকে সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতে হয় এবং নারীর কোনো আর্থিক দায়িত্ব নেই, তাই পুরুষকে দ্বিগুণ সম্পত্তি দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এই যুক্তিটি আইনি সততা ও মানবিক মর্যাদার মৌলিক ধারণার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

প্রথমত, ভরণপোষণ দেওয়ার অর্থ এই নয় যে পুরুষ তার প্রতি মাসে উপার্জিত সম্পদের বা নগদ টাকার অর্ধেক অংশ স্ত্রীকে দিয়ে দিচ্ছে। বরং, উপার্জনের সমস্ত মালিকানা ও আর্থিক ক্ষমতা পুরোপুরি পুরুষের হাতেই থেকে যায়। ফলে নারীকে প্রতিটা ছোটখাটো প্রয়োজনেও পুরুষের কাছে হাত পেতে টাকা চাইতে হয়। এতে নারী সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক পরাধীনতার শিকার হন, যা তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও আত্মসম্মানের পরিপন্থী। নিজস্ব স্থায়ী সম্পত্তির মালিকানা কেড়ে নিয়ে কেবল খাবারের খোরপোশ দেওয়ার মাধ্যমে কখনোই একজন মানুষের অধিকার পূরণ হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, এর বিনিময়ে নারীকে উল্টো ভয়াবহ সামাজিক মাশুল গুনতে হয়। সারাদিন সংসারের রান্নাবান্না, ঘর সামলানো এবং সন্তান লালন-পালনের মতো নিখরচায় অদৃশ্য শ্রম দেওয়া সত্ত্বেও নারীকে শুনতে হয় “তাকে বসে বসে খাওয়ানো হচ্ছে”। নিজের নামে স্থাবর সম্পত্তি বা উপার্জনের স্বাধীনতা না থাকার কারণে শ্বশুরবাড়িতে তাকে চরম অমূল্যায়ন, শাশুড়ি বা ননদের অবহেলা ও খোঁটা সহ্য করতে হয়। পরিবারে তার মতামতের তেমন গুরুত্বও থাকে না। অর্থাৎ, পুরুষ থেকে খোরপোশ পাওয়ার নামে নারীকে আজীবন অপমান, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক পরাধীনতা সহ্য করতে হয়।

​তৃতীয়ত, ঘরের নিখরচায় অদৃশ্য শ্রম। রান্নাবান্না, ঘর সামলানো, সন্তান লালন-পালন এবং কৃষি বা ছোটখাটো উপার্জনের পেছনে একজন নারী যে অক্লান্ত শ্রম দেন, সেটিকে যদি আর্থিক মূল্যে মাপা হতো, তবে তার পরিমাণ পুরুষের উপার্জনের চেয়ে কোনো অংশে কম হতো না। অথচ নারীর এই অসামান্য অবদানকে শূন্য ধরে নিয়ে বলা হয় “নারীকে বসে খাওয়ানো হয়”।

চতুর্থত, দাবি করা হয় যে পুরুষকে তার মা-বাবার দেখাশোনা ও খরচ বহন করতে হয় বলে তাকে সম্পত্তি বেশি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পুরুষ কেবল আর্থিক খরচ বহন করে (বা অনেক সময় করে না), আর সেই মা-বাবা বা শ্বশুর-শাশুড়ির দৈনন্দিন সেবা-শুশ্রূষা, রান্নাবান্না, সেবা যত্ন ও দেখাশোনার সমস্ত শারীরিক ও মানসিক শ্রম কিন্তু ঘরের নারীটিকেই একা দিতে হয়। তাছাড়া বহু নারীকে নিজের বৃদ্ধ মা-বাবার যাবতীয় আর্থিক দায়িত্ব ও খরচ একা কাঁধে তুলে হয়। দায়িত্ব ও সেবার হিসাব করলে পুরুষ ও নারীর অবদান কার্যত সমান সমান।

পঞ্চমত, যদি ভরণপোষণের দায়িত্বই সম্পত্তি কম বা বেশি পাওয়ার মূল কারণ হতো, তবে তো যে পুরুষ পরিবারের দায়িত্ব পালন করে না, তাকে সম্পত্তিতে কম দেওয়া উচিত ছিল। আবার যে নারী চাকরি বা ব্যবসা করে সংসারে সমান অবদান রাখছেন, কিংবা একা হাতে মা-বাবা ও সন্তানের যাবতীয় খরচ চালাচ্ছেন, তার সম্পত্তি বাড়িয়ে কেন পুরুষের সমান করা হয় না?

কাজেই, নারীকে দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করিয়ে, মা-বাবার দায়িত্ব পালনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এবং শ্বশুরবাড়ির খোঁটা ও অমূল্যায়নের শিকার বানিয়ে রেখে “তোমাকে তো ভরণপোষণ দেওয়া হচ্ছে”—এই অজুহাতে স্থায়ী সম্পত্তির ন্যায়সংগত অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা একটি চরম বৈষম্যমূলক ও দুর্বল কৃত্রিম বাহানা মাত্র।

ভুল ধারণা ৫: “ভিন্ন বিষয় টেনে এনে বিষয় ঘুরিয়ে দেওয়া”

খণ্ডন: যখনই প্রশ্ন তোলা হয় যে ইসলামিক উত্তরাধিকার আইনে নারী কেন কম বা অর্ধেক পাচ্ছে, তখনই মূল সম্পত্তির গাণিতিক হিসাব থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেনমোহর, খোরপোশ বা পারিবারিক দায়িত্বের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু দেনমোহর বা ভরণপোষণ কোনোভাবেই এটা প্রমাণ করে না যে নারী সম্পত্তিতে বেশি পাচ্ছে। ইসলামিক উত্তরাধিকার আইনের সমান্তরাল বা সম-পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে (যেমন ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী) হিসাব করলে দেখা যায় নারী কখনোই পুরুষের চেয়ে বেশি বা সমান পায় না, বরং সবসময় অর্ধেক অংশই পেয়ে থাকে।

উপসংহার:

অতএব, “ইসলামে নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়”—এই কথাটি মূলত অসম পরিস্থিতির তুলনা, অবাস্তব সামাজিক অজুহাত এবং মূল হিসাবকে আড়াল করার জন্য নির্মিত একটি বহুল প্রচলিত বিভ্রান্তি মাত্র।

প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়?

উত্তর: না, এটি একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা। উত্তরাধিকার আইনের সমান্তরাল বা সম-পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচার করলে দেখা যায় নারী কখনোই পুরুষের চেয়ে বেশি বা সমান সম্পত্তি পায় না। সন্তান হিসেবে বোন পায় ভাইয়ের অর্ধেক, একমাত্র কন্যা পায় ৫০% অথচ একমাত্র পুত্র পায় ১০০%, এবং বৈবাহিক সূত্রে স্ত্রী পান স্বামীর প্রাপ্ত অংশের ঠিক অর্ধেক। কেবল কিছু দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তুলনা টেনে “নারী বেশি পাচ্ছে” দাবি করা হয়, যা আইনি ও গাণিতিক বিচারে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

প্রশ্ন ২: দেনমোহর পাওয়ার মাধ্যমে কি পিতৃসম্পত্তিতে নারীর অর্ধেকের ঘাটতি পূরণ বা জাস্টিফাই করা যায়?

উত্তর: না, কোনোভাবেই যায় না। দেনমোহর হলো বৈবাহিক চুক্তির একটি এককালীন উপহার বা সামান্য নগদ অর্থ, যা সমাজে বেশিরভাগ সময়ই নামমাত্র থাকে বা অনাদায়ী থেকে যায়। অন্যদিকে পিতৃসম্পত্তি হলো বংশানুক্রমিক জমির মতো স্থায়ী স্থাবর সম্পত্তি, যার মূল্য সময়ের সাথে বাড়তে থাকে। একটি বিয়ের সামান্য অর্থ দিয়ে জন্মগত পিতৃসম্পত্তির স্থায়ী অধিকারের ৫০% ঘাটতি ঢেকে দেওয়া সম্পূর্ণ অবাস্তব ও কৃত্রিম অজুহাত।

প্রশ্ন ৩: ভরণপোষণের দায়িত্বের অজুহাত দেখিয়ে কি নারীদের কম সম্পত্তি পাওয়াকে জাস্টিফাই করা যায়?

উত্তর: না, ভরণপোষণের অজুহাত দিয়ে নারীর অর্ধেকের বৈষম্যকে কোনোভাবেই সঠিক প্রমাণ করা যায় না। পুরুষ খোরপোশ দেওয়ার অর্থ এই নয় যে সে উপার্জিত অর্থের অর্ধেক স্ত্রীকে লিখে দিচ্ছে; বরং সমস্ত অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরুষের কাছেই থাকে এবং নারীকে পরাধীন হয়ে হাত পেতে টাকা চাইতে হয়। উপরন্তু, সংসারে বিনাবেতনে অসীম শ্রম দেওয়া সত্ত্বেও নারীকে উল্টো অমূল্যায়ন ও খোঁটা সহ্য করতে হয়। তাছাড়া বর্তমানে বহু নারী চাকরি করে সংসারে অবদান রাখছেন এবং একা মা-বাবার দায়িত্ব নিচ্ছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্পত্তিতে তাদের অধিকার পুরুষের সমান করা হয় না। ফলে ভরণপোষণের অযুহাতটি একটি দুর্বল সামাজিক বাহানা মাত্র।

নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র :

​১. যেসব ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পায়

​১.১ সন্তান হিসেবে (ভাই ও বোনের তুলনা)

আইনি রেফারেন্স: মোল্লা’স প্রিন্সিপালস অব মহামেডান ল, অধ্যায় ১২ (উত্তরাধিকার), ধারা ৬৩ এবং কোরআনিক শেয়ারার তালিকা।

আইনি বিধান: ফারাইজ নীতি অনুযায়ী পুত্র এবং কন্যা একসাথে থাকলে কন্যা আসাবা বা অবশিষ্টভোগী হয় এবং ভাইয়ের পাওয়া অংশের অর্ধেক পায় (২:১ অনুপাত)।

​১.২ একমাত্র সন্তান হিসেবে (একমাত্র ছেলে বনাম একমাত্র মেয়ে)

আইনি রেফারেন্স: মোল্লা’স প্রিন্সিপালস অব মহামেডান ল, অধ্যায় ১২, ধারা ৬৩ (কন্যার অংশ) এবং ধারা ৬৫ (অবশিষ্টভোগী হিসেবে পুত্রের অংশ)।

আইনি বিধান: একমাত্র কন্যা জাবিল আরহাম বা কোরআনিক অংশীদার হিসেবে স্থায়ী ৫০% পায়। অন্যদিকে একমাত্র পুত্র ধারা ৬৫ অনুযায়ী আসাবা হিসেবে সম্পূর্ণ ১০০% সম্পত্তির মালিক হয়।

​১.৩ বৈবাহিক সূত্রে সম্পত্তি বণ্টন (স্বামী বনাম স্ত্রীর তুলনা)

আইনি রেফারেন্স: মোল্লা’স প্রিন্সিপালস অব মহামেডান ল, অধ্যায় ১২, ধারা ৬৩ (স্বামী ও স্ত্রীর অংশের তালিকা)।

আইনি বিধান:

সন্তান না থাকলে স্বামী পায় ৫০% এবং স্ত্রী পায় ২৫%।

সন্তান থাকলে স্বামী পায় ২৫% এবং স্ত্রী পায় ১২.৫%।

​২. যেসব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান সম্পত্তি পায়

​২.১ সন্তানের সম্পত্তিতে মা ও বাবার অংশ

আইনি রেফারেন্স: মোল্লা’স প্রিন্সিপালস অব মহামেডান ল, অধ্যায় ১২, ধারা ৬৩ (মাতা ও পিতার অংশের তালিকা)।

আইনি বিধান: মৃতের সন্তান থাকলে পিতা ও মাতা উভয়েই নির্ধারিত অংশীদার হিসেবে ১/৬ (১৬.৬৬%) করে সমান অংশ পান।

​২.২ মায়ের দিকের ভাই-বোন (বৈপিত্রেয় ভাই-বোন)

আইনি রেফারেন্স: মোল্লা’স প্রিন্সিপালস অব মহামেডান ল, অধ্যায় ১২, ধারা ৬৩ (উত্তরাধিকারীদের তালিকা)।

আইনি বিধান: এক মায়ের সন্তান বা বৈপিত্রেয় ভাই-বোনদের ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে কোনো বৈষম্য ছাড়াই প্রত্যেকে সমান ১/৬ বা যৌথভাবে ১/৩ অংশ পান।

Related Posts

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মানুষ সাধারণত তার নিজের রূপ, অনুভূতি, কল্পনা এবং সীমাবদ্ধতা দিয়েই সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে চায়। এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism) বা মানব রূপারোপবাদ। সহজ ভাষায়, মানবীয় আবেগ, আকৃতি বা চরিত্রকে কোনো অ-মানবীয় বস্তু বা পরম সত্তার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াই হলো অ্যানথ্রোপোমরফিজম। কার্টুনে পশুপাখির কথা বলা যেমন অ্যানথ্রোপোমরফিজম, ঠিক তেমনি ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব ও ঈশ্বর ভাবনায় মানবীয় গুণাবলী আরোপ করা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।…

Read more

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামী ধর্মগ্রন্থে প্রাণী সংক্রান্ত নানা বিতর্কিত নির্দেশনার কথা অনেকেরই জানা, তবে উদ্ভিদের মতো একটি সম্পূর্ণ অচেতন ও নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতি ধর্মীয় বিদ্বেষ আরোপের ঘটনাও কিন্তু কম নয়। পরিবেশ সুরক্ষা ও বৃক্ষরোপণের কথা বলে ইসলামকে অনেক সময় পরিবেশবান্ধব হিসেবে প্রচার করা হলেও, হাদিস ও কোরআনের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় সেখানে নির্দিষ্ট কিছু গাছকে ‘শত্রুর গাছ’ বা ‘অভিশপ্ত বৃক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কেবল অলৌকিক…

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন