যখনই প্রাণের উদ্ভব কীভাবে কোনো অলৌকিক ঈশ্বরের সাহায্য ছাড়াই রাসায়নিক নিয়মে ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করা হয়, তখন ধার্মিকদের তোলা পরবর্তী এবং সর্বশেষ প্রচলিত প্রশ্নটি হয়: “তাহলে এই বিশাল মহাবিশ্ব কোথা থেকে এলো? শূন্য থেকে কি কোনো কিছু এমনি এমনি সৃষ্টি হতে পারে? কোনো না কোনো সৃষ্টিকর্তা বা প্রথম কারণ নিশ্চয়ই থাকতে হবে।” ধার্মিকদের এই আর্গুমেন্টটি দর্শনের ভাষায় ‘ক্যাল্যাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট’ বা কার্যকারণ তত্ত্ব এবং কন্টিনজেন্সি আর্গুমেন্ট নামে পরিচিত। প্রাচীন ধর্ম সংস্কার ও আধুনিক বিজ্ঞানের বাস্তবতার মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, ধর্ম কোনো অনুসন্ধান ছাড়াই রূপকথার মাধ্যমে একটি সহজ উত্তর তৈরি করে দেয়, আর বিজ্ঞান কঠিন গণিত, পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধানের মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রকৃত নিয়মগুলো প্রকাশ করে।
১. মহাবিশ্ব কি শূন্য থেকে তৈরি হওয়া সম্ভব?
ধার্মিকেরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে শূন্য থেকে কোনো কিছু তৈরি হতে পারে না, তাই মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে একজন ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা দরকার। কিন্তু আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্স এই প্রাচীন ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে।
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে ‘শূন্য’ মানে পরম কিছু না থাকা নয়। যাকে আমরা ফাঁকা বা শূন্য স্থান (Vacuum) বলি, সেখানেও অবিরাম শক্তি ও কণার উপস্থিতি থাকে। কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন (Quantum Fluctuation)-এর কারণে শূন্য স্থানের মধ্যেও অতিপারমাণবিক কণা বা ভার্চুয়াল পার্টিকেলস মুহূর্তের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয় এবং আবার বিলীন হয়ে যায়। এর জন্য কোনো অলৌকিক স্রষ্টার আদেশের প্রয়োজন হয় না। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এবং লরেন্স ক্রাউসের মতে, মহাবিশ্ব ঠিক এই ধরনের একটি কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মাধ্যমেই উৎপত্তি লাভ করেছিল। অর্থাৎ, পদার্থবিজ্ঞানের আইন অনুযায়ী ‘শূন্য’ থেকেই কোনো কারণ ছাড়া একটি মহাবিশ্বের উদ্ভব হওয়া পুরোপুরি সম্ভব।
২. কার্যকারণ তত্ত্ব বা ‘ফার্স্ট কজ’ আর্গুমেন্টের বৈজ্ঞানিক ভুল
ধার্মিকদের বহুল প্রচলিত যুক্তি হলো: “প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি কারণ থাকে, তাই মহাবিশ্বের পেছনেও নিশ্চয়ই একজন কারণ বা সৃষ্টিকর্তা আছেন।” এই যুক্তির মধ্যে দুইটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক ভুল লুকিয়ে রয়েছে।
প্রথমত, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকারণ সম্পর্ক (Cause and Effect) কেবল মহাজাগতিক ও মহাবিশ্বের ভেতরের ঘটনাবলীর ওপর প্রযোজ্য, যেখানে সময় বিদ্যমান। কিন্তু বিগ ব্যাং (Big Bang) বা মহাবিস্ফোরণের মুহূর্তে কেবল স্থান (Space) নয়, সময়েরও (Time) উৎপত্তি ঘটেছিল। বিগ ব্যাংয়ের পূর্বে ‘সময়’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই ছিল না। সময় যদি না থাকে, তবে ‘আগে’ বা ‘পরে’ বলে কিছু হয় না। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ‘আগে’ কেউ একজন বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে মহাবিশ্ব বানিয়েছেন, এই ধারণাই একটি বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি।
দ্বিতীয়ত, ধার্মিকরা যদি দাবি করেন যে প্রতিটি জিনিসের একটি কারণ বা সৃষ্টিকর্তা থাকতে হবে, তবে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে: “ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করল?” যদি ঈশ্বর কোনো কারণ ছাড়াই অনন্তকাল ধরে থাকতে পারেন, তবে একই কথা এই মহাবিশ্ব বা তার পেছনের ভৌত নিয়মের ক্ষেত্রে কেন প্রযোজ্য হতে পারবে না? ঈশ্বর নামক একটি অপ্রমাণিত সত্তাকে কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া কেবল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পথ বন্ধ করে দেওয়ার একটি চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩. কন্টিনজেন্সি আর্গুমেন্ট ও কম্পোজিশন ফল্যাসির খণ্ডন
ধার্মিকদের অন্যতম বড় যুক্তি হলো কন্টিনজেন্সি আর্গুমেন্ট (Contingency Argument)। তারা বলেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু নির্ভরশীল বা আকস্মিক (Contingent), তাই পুরো মহাবিশ্বকে টিকে থাকতে হলে এমন একজন ‘অনিবার্য সত্তা’ (Necessary Being) বা ঈশ্বরের প্রয়োজন, যিনি নিজে কারো ওপর নির্ভর করেন না।
এই যুক্তির প্রধান ভুল হলো কম্পোজিশন ফল্যাসি (Fallacy of Composition)। কোনো ব্যবস্থার ভেতরের প্রতিটি অংশের যে বৈশিষ্ট্য, পুরো ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যও ঠিক তাই হবে—এমন কোনো কথা নেই। উদাহরণস্বরূপ, একটি ইটের ওজন হালকা মানেই পুরো ইট দিয়ে তৈরি বাড়িটি হালকা নয়। ঠিক তেমনি, মহাবিশ্বের ভেতরের বিভিন্ন উপাদান একে অপরের ওপর নির্ভর করলেও সামগ্রিক মহাবিশ্বটি কোনো বাহ্যিক ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল নাও হতে পারে। পদার্থবিদ্যার থার্মোডাইনামিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, শক্তি অবিনশ্বর; একে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। অর্থাৎ মহাবিশ্বের মূল শক্তি কোনো ঈশ্বর দ্বারা তৈরি হয়নি, এটি নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
তাছাড়া, পদার্থবিজ্ঞানের থার্মোডাইনামিক্সের প্রথম সূত্র (First Law of Thermodynamics) অনুযায়ী শক্তির কোনো সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই, আছে কেবল রূপান্তর; যা সরাসরি প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের শক্তি কোনো বাহ্যিক ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্ট নয়, বরং শক্তির উপস্থিতি অনাদিকাল থেকেই ভৌত নিয়মের অংশ
৪. বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও মহাবিশ্বের প্রসার
বিগ ব্যাং কোনো অলৌকিক বিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল স্থানের অতি দ্রুত প্রসারণ। প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি অতি-ঘন এবং অতি-উত্তপ্ত বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি (Singularity) থেকে আমাদের এই মহাবিশ্বের প্রসার শুরু হয়।
১৯২৯ সালে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান যে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় মহাবিশ্ব দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞানী আরনো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন আবিষ্কার করেন ‘কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন’ (CMBR), যা বিগ ব্যাংয়ের পর রয়ে যাওয়া আলো ও তাপের প্রাচীনতম প্রমাণ। এই বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও গণিতের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর নয়।
৫. ফাইন-টিউনিং আর্গুমেন্ট এবং মাল্টিভার্স তত্ত্ব
অনেক সময় দাবি করা হয় যে মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক ধ্রুবকগুলো (যেমন অভিকর্ষ বল বা ইলেকট্রনের চার্জ) এমন নিখুঁতভাবে সাজানো যে এগুলো সামান্য ভিন্ন হলেই মানুষের জীবন সম্ভব হতো না, তাই নিশ্চয়ই কেউ এটা টিউনিং বা নকশা করেছেন।
এই দাবির বৈজ্ঞানিক উত্তর হলো ‘এন্থ্রোপিক প্রিন্সিপল’ (Anthropic Principle)। পরিবেশ মানুষের থাকার উপযোগী বলেই মানুষ বেঁচে আছে এবং এই প্রশ্নটি তুলতে পারছে; মহাবিশ্ব মানুষের জন্য বিশেষ করে বানানো হয়নি। যদি পরিবেশ ভিন্ন হতো, তবে হয়তো মানুষ তৈরিই হতো না বা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো রূপ পেত। এছাড়া আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ‘মাল্টিভার্স’ (Multiverse) বা বহু-মহাবিশ্ব তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের মহাবিশ্বের মতোই অসংখ্য মহাবিশ্ব বিদ্যমান থাকতে পারে, যেগুলোর ভৌত নিয়ম একেক রকম। তার মধ্যে যে মহাবিশ্বে প্রাণ ধারণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে, আমরা সেখানেই বিবর্তিত হয়েছি।
উপসংহার
মহাবিশ্বের উৎপত্তি কীভাবে হলো তা বোঝার জন্য আকাশ কুসুম কোনো ঈশ্বর বা ঈশ্বরের মহাজাগতিক রূপকথার আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞান প্রতিদিন তার দূরবীন, কণা ত্বরক যন্ত্র (Hadron Collider) এবং গণিতের মাধ্যমে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করে চলেছে। ঈশ্বর হলো মানুষের অজ্ঞতার শেষ সীমান্ত; যেখানে বিজ্ঞান এখনো কোনো উত্তর স্পষ্ট করেনি, সেখানে ঈশ্বরকে বসিয়ে দেওয়া কেবল সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি সহজ কৌশল মাত্র।
প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স
১. Hawking, S. W., & Mlodinow, L. (2010). The Grand Design. Bantam Books. (গ্র্যান্ড ডিজাইন গ্রন্থে স্টিফেন হকিং কীভাবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই ঈশ্বর ছাড়া শূন্য থেকে মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে তা ব্যাখ্যা করেছেন)।
২. Krauss, L. M. (2012). A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather Than Nothing. Free Press. (কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এবং শূন্য থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি সংক্রান্ত লরেন্স ক্রাউসের গবেষণাধর্মী বই)।
৩. Hubble, E. (1929). “A relation between distance and radial velocity among extra-galactic nebulae”. Proceedings of the National Academy of Sciences, 15(3), 168-173. (মহাবিশ্বের প্রসার সংক্রান্ত এডউইন হাবলের মূল পর্যবেক্ষণভিত্তিক পেপার)।
৪. Penzias, A. A., & Wilson, R. W. (1965). “A Measurement of Excess Antenna Temperature at 4080 Mc/s”. The Astrophysical Journal, 142, 419-421. (বিগ ব্যাং-এর অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন বা CMBR আবিষ্কারের গবেষণা নিবন্ধ)।
৫. Guth, A. H. (1981). “Inflationary universe: A possible solution to the horizon and flatness problems”. Physical Review D, 23(2), 347. (মহাবিশ্বের দ্রুত প্রসারণ বা ইনফ্লেশন তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিসংক্রান্ত পেপার)।
৬. Helmholtz, H. von. (1847). Über die Erhaltung der Kraft (On the Conservation of Force). G. Reimer.
(বিজ্ঞানী হারমান ফন হেলমহোল্টজের ঐতিহাসিক গবেষণা পত্র, যেখানে তিনি শক্তির অবিনশ্বরতা ও রূপান্তরের নীতি অর্থাৎ ‘ল অফ কনজারভেশন অফ এনার্জি’ প্রথম গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞানসম্মতভাবে উপস্থাপন করেন)।





