নিজ ধর্মের সত্যতা প্রমাণ করতে ধার্মিকরা প্রায়ই একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন—পরকাল না থাকলে অপরাধীদের বিচার কীভাবে হবে? বিশেষ করে দুনিয়ায় ছাড় পেয়ে যাওয়া অপরাধীদের উদাহরণ টেনে তারা দাবি করেন—যেহেতু ইহজগতে সবার শাস্তি নিশ্চিত হয় না, তাই পরকালের অস্তিত্ব থাকাটাই একমাত্র যৌক্তিক সত্য। তবে যুক্তির বিচারে কোনো বিষয় ‘হলে ভালো হতো’ কিংবা ‘হওয়া উচিত’ বলেই তা সত্য হয়ে যায় না।
মৃত্যুর পরের অনিশ্চিত বিচারে অন্ধ ভরসা রাখা সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার করার বদলে নিষ্ক্রিয় করে তোলে। আজ আমরা খুব ভালোভাবেই দেখব এই দাবিটি কেন ভুল এবং কুরআন-হাদিসের আলোকে ধর্মীয় কাল্পনিক বিচারব্যবস্থাটি আদৌ কোনো ন্যায়বিচার, নাকি বিচারের নামে এক চরম প্রহসন।
১.পরকাল না থাকলে অপরাধীদের বিচার না হওয়া কি পরকালের অস্তিত্ব প্রমাণ করে?
পরকাল থাকলে পৃথিবীর সব বিচারহীন অপরাধের চরম শাস্তি নিশ্চিত হতো এবং তা শুনে একটি মানসিক স্বস্তি পাওয়া যেত—এ কথা সত্য। কিন্তু কোনো একটি বিষয় “হলে খুব ভালো হতো” মানেই যে “সেটি বাস্তবে অস্তিত্বশীল”, যুক্তিশাস্ত্রে এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই।
মানসিক শান্তি পাওয়ার এই প্রবৃত্তি বা প্রবণতাকে দর্শনের ভাষায় ‘Wishful Thinking’ (আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক বিশ্বাস) বা ‘Appeal to Consequences’ (ফলাফলভিত্তিক যুক্তিদোষ) বলা হয়। অর্থাৎ, কোনো ঘটনার ‘ফলাফল’ আমার কাছে প্রিয়, আরামদায়ক কিংবা স্বস্তির বলেই ধরে নেওয়া যে মূল তথ্যটি সত্য।
এই চিন্তাটি ভুল হওয়ার কারণ হলো—কোনো তথ্য বা ঘটনার সত্যতা-মিথ্যাত্ব নির্ভর করে বস্তুগত প্রমাণ ও তথ্যের ওপর, আমাদের আবেগ, ভয় কিংবা পছন্দের ওপর নয়। কোনো বিষয় আমাদের কাছে দারুণ বা ভালো লাগলেই তা সত্য হয়ে যায় না, আর কোনো বিষয় আমাদের কাছে নির্মম বা কষ্টদায়ক মনে হলেই তা মিথ্যা হয়ে যায় না। মহাবিশ্বের বাস্তবতা নিজের প্রাকৃতিক নিয়মে চলে; আমরা কোনো মনগড়া কল্পনা বা তীব্র আকুতি জানালেই তা বাস্তবে রূপ নেয় না।
সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক:
আপনি আন্তরিকভাবে চান যে আপনার কাছে যদি বিলিয়ন ডলার অর্থ থাকত, তবে আপনি পৃথিবীর কোনো শিশুকে খাদ্যের অভাবে মরতে দিতেন না। এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার মানসিকতা এবং এটি হলে মানবজাতির জন্য কতটা ভালোই না হতো! কিন্তু আপনার এই তীব্র ইচ্ছা বা ‘ভালো হতো’ ভাবনার কারণে কি রাতারাতি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিলিয়ন ডলার চলে আসবে, কিংবা আপনি যদি নিজেকে বিলিয়নিয়ার ভেবে বসে থাকেন তবে কি তা সত্য বা বাস্তব? ঠিক তেমনই, পরকালে ন্যায়বিচার থাকলে ভালো হতো এর মানে এটা নয় যে পরকালের বিচারব্যবস্থার ধারণাটি সত্য।
পৃথিবীর অসংগতি ও অন্যায়ের কোনো সমাধান করতে না পেরে একটি ‘কাল্পনিক বিচারালয়’ বানিয়ে নেওয়া মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আত্মপ্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
২. সভ্য ও যৌক্তিক বিচারব্যবস্থা বনাম পরকালীন শাস্তি: প্রতিশোধ নয়, সংশোধনই সুবিচারের মূলভিত্তি
যেকোনো সভ্য ও যৌক্তিক আইনি বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য দুটি: অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া (Rehabilitative Justice) এবং সমাজকে নিরাপদ রাখা। দর্শনে ও আইনশাস্ত্রে কেবল প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে দেওয়া শাস্তিকে (Retributive Justice) অসভ্য ও আদিম মানসিকতা হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিন্তু পরকালীন বিচারে অপরাধীকে শোধরানোর কোনো সুযোগ নেই। সেখানে আগুনে পুড়িয়ে বা শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে অনন্তকাল ধরে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, যা মূলত চরম প্রতিশোধপরায়ণতা ও ক্ষোভের প্রকাশ।
এখানে দুটি মৌলিক যৌক্তিক প্রশ্ন তৈরি হয়:
- সসীম অপরাধের জন্য অসীম শাস্তি কি যৌক্তিক? মানুষ পৃথিবীতে বড়জোর ৬০ থেকে ৮০ বছর বেঁচে থাকে। এই সীমিত জীবনের কোনো অপরাধের জন্য কাউকে অনন্তকাল বা কোটি কোটি বছর ধরে আগুনে পোড়ানো কোনো বিচার হতে পারে না। অপরাধের পরিমাণের চেয়ে শাস্তির মাত্রা যদি অসীম গুণ বেশি হয়, তবে তা যৌক্তিক বিচারের মৌলিক নীতিকেই ধ্বংস করে দেয়।
- যে শাস্তিতে সংশোধন নেই, তার নৈতিক ভিত্তি কী? কাউকে অনন্তকাল ধরে শাস্তি দিলে তার ভেতর কোনো আত্মোপলব্ধি বা সংশোধনের পথ খোলা থাকে না।
সুতরাং, যে বিচারব্যবস্থায় সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই, যেখানে কেবল অসীম শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়াই শেষ কথা—এমন প্রতিশোধমুখী ব্যবস্থা কোনো সভ্য বা যৌক্তিক মানদণ্ডে ন্যায়বিচার হতে পারে না।
৩. আচরণগত দ্বিমুখী নীতি: পরকালের বিচারে ধর্মবিশ্বাসীদের নিজেদেরই কি আস্থা আছে?
যারা দাবি করেন পরকাল না থাকলে ন্যায়বিচার সম্ভব নয়, তারা নিজেরাও কিন্তু বাস্তব জীবনে এই ধারণার ওপর আস্থা রাখেন না।
ধরা যাক, কোনো ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির স্বজন অন্যায্যভাবে খুন হলো। ইসলামিক বিশ্বাস অনুযায়ী—দুনিয়ার বিচার নাকি পরকালের তুলনায় কিছুই নয়, আর পরকালে নাকি অপরাধীকে আগুনে পুড়িয়ে নিখুঁত ও চরম শাস্তি দেওয়া হবে। শুধু তা-ই নয়, ইসলামি আইনশাস্ত্রে (হাদিসের বিধান অনুযায়ী) একটি নিয়ম হলো—কোনো অপরাধের সাজা যদি দুনিয়ার আইনি বিচারে (যেমন: কিসাস বা হদ্দ) কার্যকর হয়ে যায়, তবে পরকালে সেই অপরাধের জন্য আল্লাহ তাকে আর শাস্তি দেবেন না। অর্থাৎ, দুনিয়ার বিচার অপরাধীর জন্য পরকালের অসীম শাস্তি থেকে বেঁচে যাওয়ার ‘কাফফারা’ বা মাফ হিসেবে কাজ করে।
এখন প্রশ্ন হলো, ধর্মবিশ্বাসীরা যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে দুনিয়ার সসীম বিচারের চেয়ে পরকালের বিচার অনেক বেশি ভয়ানক ও নিখুঁত, তবে নিজের স্বজনের খুনিকে তারা কেন পরকালের অসীম শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে চান না? কেন তারা আদালতে মামলা ঠুকে খুনিকে দুনিয়াতেই শাস্তি দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন? তারা তো নিশ্চিন্তে বসে থেকে বলতে পারতেন—”দুনিয়ার জেলের সামান্য সাজা পেয়ে ও পার পেয়ে না যাক, ওর বিচার পরকালের ভয়াবহ জাহান্নামেই হোক!”
কিন্তু একজন ধর্মপ্রাণ মানুষও বাস্তবে এই কাজটি করেন না। শতভাগ নিশ্চিত যে দুনিয়াতে শাস্তি হলে পরকালে আর শাস্তি হবে না জেনেও তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পার্থিব আইনের সাহায্য নিতেই দৌড়াদৌড়ি করেন।
এই আচরণপ্রমাণ করে যে, মানুষ তার গভীর মনস্তত্ত্বে ও অবচেতনে জানে—পার্থিব দৃশ্যমান বিচারই একমাত্র বাস্তব ও চূড়ান্ত সত্য। আর পরকালের অমীমাংসিত বিচারের আকুতিটি কেবল মনকে শান্ত রাখার এবং অসহায়ত্ব ঢাকার একটি মনস্তাত্ত্বিক আত্মছলনা মাত্র।
৪. সামাজিক নিষ্ক্রিয়তা: পরকালের বিশ্বাস কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, নাকি শোষণের হাতিয়ার হয়?
৩ নম্বর পয়েন্টে আমরা দেখেছি, ধর্মবিশ্বাসীরা নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে কখনোই পরকালের আশায় বসে থাকেন না, বরং পার্থিব বিচার নিশ্চিত করতে আদালতে ছোটেন। কিন্তু অসংগতিটি ঘটে তখনই, যখন অন্যায়টি ঘটে সামাজিকভাবে কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো শোষণের ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা ভারতের মতো ধর্মপ্রাণ দেশগুলোতে দেখা যায়—শাসকশ্রেণি, দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালীরা কোনো অন্যায় করলে সাধারণ মানুষ “আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম” বলে চুপ হয়ে যায়। পরকালের এই মনস্তাত্ত্বিক আশ্বাসের কারণে তারা নিজেদের নাগরিক অধিকার বা নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার জন্য রাজপথে নেমে বড় কোনো প্রতিবাদ গড়ে তোলে না। ফলে স্বৈরাচারী শাসক ও শোষকশ্রেণি খুব সহজেই পার পেয়ে যায় এবং সমাজে দুর্নীতি স্থায়িত্ব পায়।
অন্যদিকে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো (যেমন: নরওয়ে, ফিনল্যান্ড) কিংবা জাপানের মতো ধর্মনিরপেক্ষ বা অবিশ্বাসী প্রধান সমাজগুলোর দিকে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। যেহেতু সেখানে নাগরিকরা বিশ্বাস করেন না যে মৃত্যুর পর কোনো বিচার হবে, তাই তারা জানেন যা পাওয়ার এই জীবনেই আদায় করতে হবে। ফলে সামান্যতম দুর্নীতি বা অন্যায় হলেও পুরো সমাজ জাগ্রত হয়ে ওঠে এবং শাসক বা প্রভাবশালীদের জবাবদিহিতায় বাধ্য করে।
ইতিহাস ও বাস্তব দৃশ্যপট এটাই প্রমাণ করে—পরকালের বিচারে অন্ধ ভরসা সমাজে বিচার প্রতিষ্ঠা তো করেই না, বরং তা শোষকদের ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং সমাজকে প্রতিবাদহীন ও দুর্বল বানিয়ে ফেলে।
এবার দেখি মুমিনরা যে উপযুক্ত শাস্তি বা ন্যায়বিচারের দোহাই দিয়ে পরকালে বিশ্বাস করাতে চায়, কুরআন হাদিস অনুযায়ী কি আল্লাহ পরকালে ন্যায়বিচার বা উপযুক্তি শাস্তি নিশ্চিত করবেন, নাকি ক্ষমা করে দেন, একটু দেখি। এমনকি অবিচারও করেন। তাছাড়া, আমাদের দুনিয়ার বিচারব্যবস্থার তুলনায়ও কাল্পনিক আল্লাহর বিচারব্যবস্থা অসভ্য, অনুন্নত এবং পক্ষপাতমূলক। এ প্রসঙ্গে কিছু সহিহ হাদিস দেখি।
৫. ইসলামিক গ্রন্থের আলোকে পরকালের বিচার: নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার নাকি চরম বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্ব?
(পাঠক হিসেবে আপনি হয়তো এতক্ষণ দার্শনিক যুক্তি ও নীতিশাস্ত্রের জায়গা থেকে পরকালের বিচারব্যবস্থা নিয়ে ভাবছিলেন। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আপনার জন্য আসল চমক অপেক্ষা করছে এই শেষ পয়েন্টটিতে। কারণ, আপনি পরকালের বিচারব্যবস্থাকে যতটা নিষ্পাপ, নিরপেক্ষ ও নিখুঁত মনে করেন—স্বয়ং ইসলামি শরিয়তের টেক্সট ও সহিহ হাদিস কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে। চলুন দেখি ইসলামি দলীল অনুযায়ী পরকালের বিচারের বাস্তব রূপটি আসলে কেমন।)
১. শত খুন করলেও ক্ষমা:
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, জনৈক ব্যক্তি ১০০টি খুন করার পরও কেবল তওবার করেই মাফ পেয়ে যায় (সহিহ মুসলিম: ৬৮৯৯, সহিহ মুসলিম: ৬৭৫৫)। অর্থাৎ, কেউ গণহত্যা করেও যদি তওবা করে, তবে ৭ খুন মাফ। এরচেয়ে কি দুনিয়ার বিচারব্যবস্থা ভালো নয়?
২. অপরাধ সংস্কৃতি ও অন্যায়ের লঘুকরণ:
আপনি যতই অপরাধ করেন না কেন এটা আল্লাহর কাছে মুখ্য নয়। এমনকি সহিহ হাদিসে আছে যে মানুষ যদি অপরাধ না করতো তবে আল্লাহ মানুষকে ধ্বংস করে নতুন জাতি সৃষ্টি করতেন। কারণ, আল্লাহ চান যে মানুষ অপরাধ করুক এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাক। আল্লাহ ক্ষমা করবেন এবং এটাতে আল্লাহ আনন্দ পান (সহিহ মুসলিম: ৬৮৫৮)। আল্লাহতে ন্যূনতম বিশ্বাস থাকলেই তিনি আপনার সব গুনাহ মাফ করবেন, নবী আপনার পক্ষে ওকালতি করবেন, এমনকি আপনাকে জান্নাতে নেয়া ছাড়া নবী জান্নাতে যাবে না। বাহ্! কী সুন্দর বিচারব্যবস্থা।
যে বিচারব্যবস্থা অপরাধ থেকে মানুষকে দূরে রাখার বদলে অপরাধ করাকে স্বাভাবিক করে তোলে, তা কখনোই সুবিচারের ভিত্তি হতে পারে না।
৩. বিশ্বাসের খাতিরে মহাপাপ মার্জনা:
যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করে না, সে যত গুনাহই করুক না কেন, সে জাহান্নামে যাবে না। এমনকি যিনা – ব্যভিচার বা চুরির মতো অপরাধ করলেও। ( ইসলামে যেহেতু যিনা-ব্যভিচার এবং চুরিকে অনেক বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হয় তাই উদাহরণস্বরূপ এই দুইটা উল্লেখ করা হয়েছে) (সহিহ বুখারী: ৩১২৫)।
৪. মুসলিমদের পাপ ইহুদি-খ্রিস্টানদের ঘাড়ে চাপানো:
কিয়ামতের ময়দানে মুসলিমরা যদি পাহাড় পরিমাণ গুনাহ নিয়েও হাজির হয়, তবে আল্লাহ তাদের সেই গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং সেই গুনাহগুলো ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের উপর চাপিয়ে দিবেন (সহিহ মুসলিম: ৬৯০২)।
আইনি দর্শনে একের অপরাধে অন্যকে সাজা দেওয়া চরম অসভ্য ও ন্যায়বিচারপরিপন্থী।
৫. নিজ কর্মের অকার্যকারিতা:
মানুষ তার নিজস্ব ভালো বা খারাপ আমল/কাজের ভিত্তিতে নয়, বরং কেবল আল্লাহর ইচ্ছায় জান্নাত বা জাহান্নামে যাবে (সহিহ মুসলিম: ৬৯৯৬)। অর্থাৎ ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও সৎকর্মের কোনো প্রকৃত আইনি মূল্য এখানে নেই।
৬. ভিকটিম বনাম অপরাধীর বৈষম্যমূলক সাজা:
আমরা জানি, ১৯৭১ সালে আমাদের দেশের বহু হিন্দু নারীরা পাকিস্তানি মুসলিম সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলো অথবা কোন মুসলিম একটু হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করলো। বলুনতো এটার বিচার কি হবে?
শস্যদানা পরিমাণ ইমান থাকার কারণে ওই মুসলিম ধর্ষকরা ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে যাবে, অন্যদিকে ধর্ষিতা শিশু, কিশোরী বা নারীটি শুধুমাত্র অমুসলিম হওয়ার কারণে ধর্ষিতা হয়েও চিরজীবন জাহান্নামে জ্বলবে। বাহ্! কী সুন্দর বিচারব্যবস্থা। আমি সত্যিই মুগ্ধ হচ্ছি।
৭. অমুসলিম ঘরে জন্ম নেয়া শিশুরা বিনা হিসেবে জাহান্নামী:
অমুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া নিষ্পাপ শিশুদের পরিণতি নিয়ে ইসলামের অসংগতিপূর্ণ ও অমানবিক অবস্থান পরকালের তথাকথিত ইনসাফকে পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ করে (সহিহ বুখারী: ৫৪৬৭০, সুনান আবূ দাউদ: ৪৬৪২)।
(নোট: এ বিষয়ে ইসলামিক আলেমরা হয়তো দাবি করবেন যে, অমুসলিম শিশুদের জান্নাতে যাওয়ার পক্ষেও সহিহ হাদিস রয়েছে (যেমন: সহিহ বুখারী: ৭০৪৭)। কিন্তু এই বৈপরীতি সমস্যাটিকে সমাধান করে না, বরং সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ, একই বিষয়ে সহিহ হাদিসেই যখন পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়—একদিকে পিতা-মাতার সাথে জাহান্নামী হওয়ার কথা বলা হয় (আবু দাউদ: ৪৭১৩), আবার অন্যদিকে ইব্রাহিম (আ:)-এর সাথে জান্নাতে থাকার কথা বলা হয়—তখন তা পরকালের তথাকথিত ‘সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত’ বিচারব্যবস্থার অনিশ্চয়তাকেই উন্মোচন করে।
আরও বড় অসংগতি তৈরি হয় যখন আলেমদের একাংশ বুখারীর অন্য হাদিসের (হাদিস: ১৩৮৪) দোহাই দিয়ে বলেন—’তারা বড় হলে কী আমল করত, তা আল্লাহই ভালো জানেন।’ এই যুক্তি মেনে নিলে ধর্মপ্রচারকদের নিজেদের প্রধান সাফাই যুক্তিটিই ধসে পড়ে। নাস্তিকদের প্রশ্নের জবাবে তারা সবসময় দাবি করেন—’মানুষ যেন কেয়ামতের দিন পরীক্ষা না নেওয়ার অভিযোগ তুলতে না পারে, সেজন্যই নাকি দুনিয়াতে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।’ এখন প্রশ্ন হলো, পরীক্ষা না দিয়েই যদি শিশুদের সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়, তবে কোটি কোটি মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে এত দুঃখ-কষ্ট ও পরীক্ষার নাটকের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়?
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলবে স্বয়ং কুরআনের সূরা কাহাফে—যেখানে খিজির (আ:) এক অপ্রাপ্তবয়স্ক বালককে হত্যা করে দাবি করেছিলেন যে, বালকটি বড় হলে নাকি কাফের ও নাফরমান হতো! অর্থাৎ, বালকটিকে বাস্তব জীবনে কোনো অন্যায় বা পাপ করার সুযোগ না দিয়ে, কেবল আল্লাহর ‘পূর্বজ্ঞানের’ ওপর ভিত্তি করেই তাকে আগেই হত্যা করা হলো। এটি প্রমাণ করে—ইসলামে ‘পরীক্ষা নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার দেওয়ার’ যে দাবি করা হয়, তা কুরআনিক কাহিনী ও হাদিসের জটিলতায় নিজেই নিজের ভিত্তি ধসিয়ে দেয়। কারণ, সম্ভাব্য অপরাধের (Pre-crime) ওপর ভিত্তি করে যদি পরীক্ষা ছাড়াই বিচার বা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তবে পুরো মানবজাতির জন্য ‘দুনিয়ার পরীক্ষাগার’ ধারণাটিই সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও বাতিল হয়ে যায়।)
অতএব কাল্পনিক ইসলাম এবং পরকালের বিচারব্যবস্থা শুধু মিথ্যাই নয়, অমানবিকও বটে। তাই আমাদের উচিত কাল্পনিক পরকালের আশা না করে দুনিয়াতেই আমাদের এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিৎ যেখানে মানুষ অপরাধপ্রবণ হবে না ; প্রতিশোধপরায়ণতা এবং প্রতিহিংসা থাকবে না এবং যারা অপরাধ করে তাদের সুবিচার নিশ্চিত হবে।
ধার্মিকদের বহুল জিজ্ঞাসিত এমন আরও প্রশ্নের জবাব পেতে এখানে ক্লিক করুন।





