ইসলামকে গ্লোরিফাই করার জন্য মুসলিমরা যেই মিথ্যাচারগুলো করে থাকে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আইয়্যামে জাহেলিয়া। তারা আইয়্যামে জাহেলিয়া নিয়ে এমনভাবে অপপ্রচার চালায় যেন মনে হয় ইসলাম আসার পূর্বে বুঝি আরবে, এমনকি পৃথিবীতে জ্ঞান বিজ্ঞান বা সভ্যতা বলতে বুঝি ছিলো না। এটা নিয়ে সাধারণত যে ৪ ধরনের অপপ্রচার হয় তা হলো :
১. ইসলামের পূর্বে সমগ্র বিশ্বে আইয়ামে জাহেলিয়া ছিলো
২. ইসলামের পূর্বে সমগ্র আরবে আইয়ামে জাহেলিয়া ছিলো
৩. ইসলামের পূর্বে আরবে কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো
৪. ইসলামের পূর্বে নারীদের কোন অধিকার ছিলো না
১. ইসলামের পূর্বে সমগ্র বিশ্বে আইয়ামে জাহেলিয়া ছিলো?
ইসলাম এসেছে মাত্র ১৪০০ বছর পূর্বে। অথচ খ্রিষ্টের পূর্বেই গ্রিস, রোম, ব্যবলিন, মিশর এবং ভারতীয় উপমহাদেশে জ্ঞান- বিজ্ঞান এবং সভ্যতার চর্চা ছিলো। কথায় আছে যে মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, ঠিক তেমই মুমিনদের দৌড় ১৪০০ বছর পর্যন্ত। তারা ভাবে যে ১৪০০ বছর পূর্ব বুঝি মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান,দর্শন, রাজনীতি এসব সম্পর্কে কিছুই জানতো না। ইসলাম আসার পরই বুঝি মানুষ জানতে পেরেছে। এজন্যই জাকির নায়েক কুরআনের বিভিন্ন আয়াতকে মূল পরিবর্তন বা নতুন নতুন অর্থ তৈরি করে দর্শন এবং বিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে বলে যে ১৪০০ বছর পূর্বে এমন তথ্য কে জানতো? অথচ ওই জাকির নায়েক এবং তার অনুসারীরা জানে না যে ১৪০০ বছর পূর্বে তা অনেকেই জানতো। বরং কুরআনে এমন কিছু নেই যা ১৪০০ বছর পূর্বে মানুষ জানতো না বা মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিলো না।
খ্রিষ্টের পূর্বে থেকেই গ্রিসে জ্ঞান বিজ্ঞানের জয়জয়কার ছিলো। বিজ্ঞানের জনক থেলিস, চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস এবং জ্ঞানপিতা সক্রেটিসের জন্মই তো নবী মোহাম্মদের জন্মের বহু পূর্বে। গ্রিসে তখনই দর্শন স্কুল, মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। গ্রিসের দর্শন, পৌরনীতি এবং বিজ্ঞান সম্পর্কিত বইগুলো পরবর্তীতে আরবরা অনুবাদ করে। মুসলিমরা যেই গণতন্ত্রকে ইসলামিক গণতন্ত্র বলে এবং হাদিস লেখার আইডিয়া সেই দুটোই গ্রিকরা বহু আগে বলে এবং করে গিয়েছিলো।
নবী মোহাম্মদের জন্মের বহু পূর্বেই গ্রিকরা শুধু বলেই নি বরং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে দিয়েছিলো যে পৃথিবী সমতল নয় বরং গোলাকার। আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে গ্রিক বিজ্ঞানী ডেমোক্রিটাস পরমাণুর ধারণা দিয়েছিলো যা অবাক করার মতো এনেক্সাগোরাস বলেছিলেন যে চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই। পিথাগোরাস যে জ্যামিতি আবিষ্কার করেছিলেন তা এখনও নির্ভুল এবং প্রাসঙ্গিক। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলদের কথা নাই বললাম।
এদিকে আমাদের ভারতবর্ষের গণিতবিদ বৌধায়ন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্ট, চিকিৎসা বিজ্ঞানী চরক এবং সুশ্রুত, চাইনিজ বিজ্ঞানী জিং ফ্যাং, এনাদের জন্মও নবী মোহাম্মদের জন্মের বহু পূর্বে। ভারতীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানী সুশ্রুতই সর্বপ্রথম অস্ত্রোপচার ও প্লাস্টিক সার্জারির বিষয়ে উল্লেখ করেন তার সুশ্রুত সংহিতা বইতে। উল্লেখ্য যে, চরক এবং সুশ্রুত এর বইগুলো পরবর্তীতে ইবনে সিনা আরবিতে অনুবাদ করেন। কোন ইসলামিক গ্রন্থ নয়,বরং অনৈসলামিক গ্রন্থ থেকেই থেকেই পরবর্তী আরব বিজ্ঞানীরা জ্ঞানের খোরাক জোগান।
২. তাহলে ইসলামের পূর্বে কি সমগ্র আরবে আইয়্যামে জাহেলিয়া ছিলো?
ঐতিহাসিকদের মতে সেটা সমগ্র আরবে নয়, বরং আরবের কিছু অঞ্চলে। তাছাড়া, আমরা ইতিহাস থেকে এমনকি ইসলামী সোর্স থেকেও দেখতে পাই যে ইসলামের পূর্বেই আরবে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা ছিলো। তখনকার আরবের অনেকেই জ্ঞান বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয় তথাপি মানুষের জন্ম রহস্য, মহাকাশ বিদ্যা, সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী সম্পর্কে জানতো। এছাড়াও, তৎকালীন আরবে সাহিত্য অনুরাগ এবং সাহিত্যের চর্চা লক্ষণীয়।
আরবের লোকেরা গ্রিক মেডিক্যালে পড়াশোনা করতো এবং গ্রিক চিকিৎসা বিজ্ঞানী গেইলেন লিখিত বহু বই সিরিয়াক এবং পরবর্তীতে আরবিতে অনূদিত হয়েছিলো যা আরবের লোকজন অধ্যায়ন করে ডাক্তার হতেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইবনে হুজিম, হারিস ইবনে কালাদাহ, নাদির ইবনে হারিস প্রমুখ। যারা ইসলামের পূর্বেই বিজ্ঞ ডাক্তার ছিলেন।
তৎকালীন আরবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হারিস ইবনে কালাদাহর সুখ্যাতি এতটাই ছিল যে পারস্য সম্রাট খসরু তাকে রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। স্বয়ং নবী মুহাম্মদ হারিসের তার চিকিৎসাবিদ্যার ওপর গভীর আস্থা রাখতেন এবং তার সাহাবীরা (যেমন সাদ ইবনে আবি ওক্কাস) অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসার জন্য হারিস ইবনে কালাদাহর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। তৎকালীন আরবে প্রচলিত এই গ্রিক ও পারসিক চিকিৎসাবিদ্যার প্রভাব ও মিথস্ক্রিয়াই মূলত পরবর্তীতে কুরআনের কিছু বর্ণনায় প্রতিফলিত হয়েছে।এমনকি কুরআনে বর্ণিত মানব ভ্রূণের বিকাশের যে ধাপগুলো পাওয়া যায়, তা খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক গেইলেনের (Galen) ভ্রূণতত্ত্বের ধারণার সাথে হুবহু মিলে যায়। হারিস ইবনে কালাদাহ যেহেতু গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন এবং নবীজির সাথেও তার সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল, তাই নবীজির পক্ষে সমসাময়িক এই বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো জানা একেবারেই অসম্ভব ছিল না। অনেক মুসলিম দাবি করেন ১৪০০ বছর আগে এই তথ্য নবীজি কীভাবে জানলেন, অথচ ইতিহাস প্রমাণ করে তৎকালীন আরবেই হারিসের মতো চিকিৎসকদের মাধ্যমে গ্রিক বিজ্ঞানের এই ধারণাগুলো আগে থেকেই উপস্থিত ছিল।
প্রাক ইসলামি সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইমরুল কায়েস। যার কবিতা নকল করে কুরআনে সুরা লেখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ আছে। এছাড়াও, আল রাবী , কাব ইবনে আশরাফ, তারাফা ইবনে আল আবদ, আবি সুলমা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য কবি ছিলেন। তাদের মধ্যে কবি কাব বিন আশরাফ এবং মহিলা কবি আসমা বিনতে মারওয়ানকে নবী মোহাম্মদ হত্যা করে।
এদিকে তৎকালীন মিশরের কথা নতুন করে কিছু বলার নেই৷ জ্ঞান বিজ্ঞান এবং সভ্যতার অন্যতম আঁধার ছিলো তৎকালীন মিশর। মিশরেই বিশ্বের প্রথম নারী গণিতবিদ এবং দার্শনিক হাইপেশিয়ার জন্ম হয় নবী মোহাম্মদেরও জন্মের পূর্বে।
‘লাইব্রেরি অব আলেক্সআন্দ্রিয়া ‘ যেটি মিশরে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লাইব্রেরি ছিলো, তা ইসলামি শাসনামলে খলিফা ওমরের নির্দেশে ধ্বংস করা হয়েছিলো বলে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল কিফতি তার তারিখুল হুকামা নামক বইয়ে পাওয়া যায়। সুতরাং ইসলামের পূর্বে পুরো আরব অন্ধকারচ্ছন্ন না থাকলেও ইসলামি আগ্রাসনের ফলে ঠিকই অন্ধকারচ্ছন্ন ছিলো দীর্ঘ সময়।
৩. প্রাক-ইসলামী আরবে কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো?
প্রাক-ইসলামী আরবে কন্যাসন্তানদের ঢালাওভাবে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো—এই বহুল প্রচলিত ধর্মীয় দাবিটি ঐতিহাসিক, সমাজবৈজ্ঞানিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। এটি যদি সমগ্র আরবের সার্বজনীন কোনো সামাজিক প্রথা হতো, তবে সে যুগের জনসংখ্যায় মারাত্মক লিঙ্গবৈষম্য দেখা দিত এবং আরব জাতি বংশ বিলুপ্তির মুখে পড়ত। অথচ মূলধারার ইসলামিক ইতিহাস ও হাদিস গ্রন্থগুলো থেকেই স্পষ্ট জানা যায় যে নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তার প্রায় প্রতিটি সাহাবীর একাধিক স্ত্রী ও কন্যাসন্তান ছিল।
আধুনিক নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, ‘ওয়াদ’ বা কন্যাসন্তান হত্যার ঘটনাটি আরবের কোনো জাতীয় নিয়ম বা সামাজিক মানদণ্ড ছিল না। এটি মূলত বনু তামীম বা বনু আসাদের মতো নির্দিষ্ট কিছু প্রান্তিক যাযাবর বেদুঈন গোত্রের চরম কট্টর ও অতি-রক্ষণশীল কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে ধর্মীয় সাহিত্যে নতুন ধর্মের সংস্কারমূলক অবদানকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এবং অতি-রঞ্জিত (Hyperbolized) করে উপস্থাপন করতেই এই আঞ্চলিক অপরাধটিকে সমগ্র প্রাক-ইসলামী আরব সমাজের সর্বজনীন স্বভাব বলে তকমা দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টিকে আধুনিক প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করলেই এর অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্ট হয়। বর্তমান যুগেও পাকিস্তান, জর্ডান কিংবা ইরানের কিছু উপজাতীয় অঞ্চলে ‘অনার কিলিং’ বা পরিবারের সম্মানের নামে নারী হত্যার মতো নারকীয় ঘটনা ঘটে। কিন্তু এর ওপর ভিত্তি করে যেমন দাবি করা যায় না যে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য বা ওই দেশগুলোর পুরো সমাজই নারী হত্যাকারী, ঠিক একইভাবে প্রাক-ইসলামী আরবের কতিপয় বিচ্ছিন্ন অপরাধকে পুরো আরব সভ্যতার জাতীয় পরিচয় বানানো একটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক অতি-সরলীকরণ ও অপপ্রচার।
অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, যেসব নির্দিষ্ট কট্টর পরিবারে এই নৃসংশতা ঘটত, তার পেছনে মূলত দুটি প্রধান সংকট কাজ করত:
১. চরম দারিদ্র্য ও ‘অর্থনৈতিক বোঝা’র মনস্তত্ত্ব:
মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশে থাকা এসব বেদুঈনদের অর্থনীতি মূলত পশুপালন, শিকার এবং যুদ্ধ বা লুটপাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে সম্পদ ছিনিয়ে আনার কাজ পুরুষেরা করতে পারত, কিন্তু তৎকালীন সামাজিক কাঠামোর কারণে নারীদের সেই সুযোগ ছিল না। ফলে চরম দারিদ্র্য ও অনাহারের সময়ে অভাবী পরিবারগুলো কন্যাসন্তানকে কোনো সম্পদ এনে দিতে না পারা কেবল একটি অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে গণ্য করত।
২. শত্রুপক্ষের যৌনদাসী হওয়ার ভীতি ও বংশীয় অপমান:
আরবের এসব বেদুঈন গোত্রগুলোর মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত, যেখানে পরাজিত গোত্রের নারীদের বন্দী করে যৌনদাসী বানানো হতো। গোত্রপতিরা ভাবত, ভবিষ্যতে তাদের কন্যাসন্তান শত্রুর হাতে অপহৃত হয়ে যৌনদাসী বা ভোগপণ্য হলে বংশের চরম অপমান হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও তথাকথিত ‘সম্মান’ বাঁচানোর অন্ধ তাড়না থেকেই তারা কন্যাসন্তানকে শৈশবেই হত্যা করত।
সবচেয়ে বড় আয়রনি বা বৈপরীত্য হলো—ইসলাম কন্যাসন্তান হত্যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করলেও, যে দুটি মূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কারণে এই অপরাধটি ঘটত, তার কোনো টেকসই সমাধান ইসলাম দিতে পারেনি। উল্টো সেই সংকটগুলোকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও চিরস্থায়ী করেছে।
প্রথমত, নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ না দিয়ে, তাকে আজীবন পুরুষ অভিভাবকের ওপর পরাশ্রয়ী ও মুখাপেক্ষী করে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যে যুদ্ধবন্দী নারীদের দাসী বানানো ও যৌন ভোগপণ্য হিসেবে ব্যবহার করার ভয়ে পরিবারগুলো কন্যাসন্তান হত্যা করত—ইসলাম সেই দাসপ্রথা এবং যুদ্ধবন্দী নারী ভোগের প্রথাকে বিলুপ্ত করা তো দূরের কথা, বরং তাকে ধর্মীয় অনুশাসন ও আইনের মাধ্যমে আজীবনের জন্য বৈধতা দিয়েছে।
সুতরাং, প্রাক-ইসলামী সমাজকে ‘জাহেলিয়াত’ বা নৈতিক অন্ধকার প্রমাণের তাগিদে কতিপয় প্রান্তিক গোত্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে পুরো প্রাক-ইসলামী আরব সমাজকে ‘কন্যাসন্তান হত্যাকারী’ হিসেবে চিত্রায়িত করা তথ্যবিকৃতি এবং অকাট্য ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ মাত্র।
এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে এই তথ্যবহুল লেখাটি পড়ুন।
৪. ইসলামের পূর্বে নারীদের কোন অধিকার ছিলো না?
ইসলামের পূর্বে যে আরবের নারীরা তুলনামূলক স্বাধীন এবং মর্যাদাবান ছিলো তার কিছু উদাহরণ দেখি :
★ খাদিজাতুল কুবরা ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন ধন্যাট্য ব্যবসায়ী এবং স্বাবলম্বী স্বাধীন নারী। তিনি কোন পুরুষের সাহায্য ছাড়াই একা চলাফেরা করতেন এবং কাজে সিরিয়া যেতেন। তিনি নিজের পছন্দ করে নবী মোহাম্মদকে বিয়ে করে করুণা করেন এবং বেকার নবী মোহাম্মদের দায়িত্ব নিয়ে কর্মসংস্থান করেন। উল্লেখ্য যে, খাদিজা বেঁচে থাকতে নবী কোন বিয়ে করতে পারেনি এবং কোন দাসীও রাখতে পারেনি যদিও তখন নবী টগবগে যুবক ছিলেন। কিন্তু যেই খাদিজার মৃত্যু হলো, সেই নবীর বহু বিয়ে, বুড়ো বয়সে শিশু বিয়ে, পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে, এবং দাসী সহবাসের ধুম পড়েছিলো।
★ কুরাইশদের মধ্যেই কয়েকজন প্রভাবশালী মহিলা ছিলেন যারা কুরাইশদের নেতৃত্ব দিতেন। তাদের অন্যতম ছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা। আবু সুফিয়ানের সঙ্গে ডিভোর্স হবার পর তিনি একা স্বাধীন জীবনযাপন করেছিলেন। এতে প্রমাণ হয় তখনকার নারীদের কতখানি স্বাধীনতা ছিলেন।
★ আসমা বিনতে মারোয়ান ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন প্রভাবশালী এবং মর্যাদাবান নারী কবি, যাকে নবী মোহাম্মদ ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা লেখার অভিযোগে গুপ্তঘাতক পাঠিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। এছাড়াও নারী কবিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আফিরা বিনতে আব্বাদ, লায়লা ইবনে লুকাইজ, লুবনা বিনতে হাজার, উম্মে জামিল প্রমুখ।
★ বনু ফাযারা গোত্রের নেত্রী উম্মে কিরফা ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সম্মানিত নারী। সহিহ হাদিস, ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের সিরাত গ্রন্থ এবং তাবারির র ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদের নির্দেশে যায়েদ ইবনে হারিসার নেতৃত্বে ‘সারিয়্যায়ে বনু ফাযারা’ নামক একটি আক্রমণাত্মক হামলা বা অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে বৃদ্ধা উম্মে কিরফাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়—তার দুই পায়ে দুটি উট বেঁধে দুই দিকে তাড়িয়ে দিয়ে তার শরীরকে দুই খণ্ডে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছিল। হত্যার পর তার রূপসী কন্যাকে যৌনদাসী বানানো হয়েছিল। তৎকালীন সমাজে একজন নারী গোত্রপ্রধান হিসেবে তার যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ছিল, তা ইসলামের বিজয়ের পর কীভাবে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল, এই ঘটনা তারই একটি বড় প্রমাণ।
★ সুলাফা এবং হুব্বা ২জন নারী হওয়া সত্ত্বেও উত্তরাধিকারসূত্রে ক্বাবার চাবি রক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন যা তৎকালীন আরবে খুবই সম্মানী দায়িত্ব ছিলো। অথচ মুসলিমদের ক্বাবা দখলের পর কখনও এমন দায়িত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে নারীদের দেয়া হয়নি।
★ পৌত্তলিকদের প্রধান দেবী ছিলেন তিনজন নারী যাদের নাম হল যথাক্রমে আল উজ্জা, আল লাত ও আল মান্নাত । নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তুলনামূলক সমান অধিকারে বিশ্বাসী তারা নারীকে দেবীর আসনে বসিয়েছিলেন। যেখানে আমরা ইসলামে সকল কতৃত্ব, আল্লাহ, ফেরেশতা, নবীরদের বেলায় পুরুষের সদৃশ্য দেখতে পাই। যদিও বলা হয় যে আল্লাহ এবং ফেরেশতাদের লিঙ্গ নেই, কিন্তু তাদের নামগুলো যে পুরুষের নামের সাথে সামঞ্জস্য তা থেকেই এটা স্পষ্টই বুঝা যায় এগুলোর সৃষ্টি পুরুষ কল্পনা থেকেই।
এবার নারী অধিকারের কথা বলি :
ইসলাম পূর্ববর্তী আরবে পুরুষদের মতো নারীরাও একাধিক বিয়ে করতে পারতো, তালাক দিতে পারতো, দাসী রাখতে পারতো, কোন অভিবাবক ছাড়াই নিজ পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করতে পারতো, নারীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে এবং মাহরুম পুরুষ ছাড়াই চলাফেরা করতে পারতো, নেতৃত্ব দিতে পারতো, নারী পুরুষের অর্ধেক বলে বিবেচনা করা হতো না এবং আরও অনেক অধিকার ছিলো ইসলামী বিশ্বে কল্পনাও করা যায় না। ইসলাম নারীর ক্ষেত্রে এসব অধিকার ঠিকই কেড়ে নিলো কিন্তুু পুরুষের ক্ষেত্রে শুধু বহালই রাখেনি উদ্বুদ্ধও করেছে। উল্লেখ্য, যে ইসলামে নারী তালাক চাইতে পারে কিন্তু দিতে পারে না, চাওয়া আর দেয়া এক নয়। প্রাক ইসলামি যুগে নারী পুরুষ উভয়ই একে অপরকে মারতো কিন্তুু বৈধতা ছিলো না, অথচ ইসলাম পুরুষকে ঠিকই স্ত্রী পেটানোর বৈধতা দিয়েছে কিন্তুু নারীকে দেয় নি।
ইসলামের পূর্বে নারীদের কোন অধিকার বা মর্যাদা ছিলো না এমনটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কিছু কিছু গোত্রে অবশ্যই বৈষম্য ছিলো কিন্তুু সেটা কখনও আরবের সাধারণ চিত্র ছিলো না। ইসলামের চেয়ে তৎকালীন আরবে নারীদের অধিকার বেশি ছিলো। ইতিহাস ও বাস্তবতা বলে ইসলামের পূর্বের নারীরা তুলনামূলক বেশি স্বাধীন, স্বাবলম্বী এবং মর্যাদাবান ছিলো। কিছু গোত্রে নারীরদের অবস্থা নাজুক ছিলো ঠিকই, কিন্তুু সেটা পুরো আরবের চিত্র ছিলো না। কিছু গোত্রের নারীদের দূর্দশা দূর করার নামে ইসলাম সমগ্র আরবের নারীদের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলো। ব্যাপারটা হলো এমন যে কিছু নারীকে ক্ষণস্থায়ী সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়ার নামে বাকি নারীদেরও চিরস্থায়ী কারাগারে বন্ধী করা।
তথ্যসূত্র (References)
১. ইসলামের পূর্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান
//en.m.wikipedia.org/wiki/Science_in_classical_antiquity
https://plato.stanford.edu/entries/anaxagoras
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Planetshine
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Anaxagoras
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Embryology
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Charaka
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sushruta
২. প্রাক-ইসলামী আরবে ‘ওয়াদ’ (কন্যাসন্তান হত্যা) এবং এর বৈজ্ঞানিক/ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ
- বিষয়: কন্যাসন্তান হত্যার সীমানা, বেদুঈন গোত্রের মনস্তত্ত্ব এবং এর প্রতি প্রাক-ইসলামী ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির গবেষণা।
- লিঙ্ক: Female Infanticide in Pre-Islamic Arab Society: A Quranic and Historical Perspective
৩. প্রাক-ইসলামী আরবে নারীদের সামাজিক অবস্থান, সামাজিক অধিকার ও স্বাধীনতা
- বিষয়: জাহেলি যুগে নারীদের মর্যাদা, খাদিজা (রাঃ)-এর স্বাধীন ব্যবসা এবং নারী অধিকার ও স্বাবলম্বিতার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা।
- লিঙ্ক: BAR Publishing – Women in Pre-Islamic Arabia by Hatoon AL-Fassi
৪. প্রাচীন ও প্রাক-ইসলামী আরবে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
- বিষয়: প্রাক-ইসলামী আরবের দেব-দেবী, রাজনৈতিক কাঠামো ও নারীদের ভূমিকার ঐতিহাসিক বিবরণ।
- লিঙ্ক: Academic Research – Religion in the Arabian Peninsula by Abkar Al-Sakaff
৫. ইসলামী দাসপ্রথা এবং যুদ্ধবন্দিনী/যৌনদাসী ব্যবস্থা
- বিষয়: যুদ্ধবন্দী নারীদের দাসী বানানো, প্রাক-ইসলামী ভীতি এবং ইসলামিক আইনি কাঠামোয় দাসপ্রথার স্থায়িত্ব।
- লিঙ্ক: Farrar, Straus and Giroux – Islam’s Black Slaves: The Other Black Diaspora by Ronald Segal
৬. প্রাক-ইসলামী আরবের সামাজিক ইতিহাস ও গোত্রীয় ব্যবস্থা
- বিষয়: ব্রোঞ্জ যুগ থেকে ইসলাম আগমন পর্যন্ত আরবদের জীবনযাত্রা, গোত্রযুদ্ধ এবং বেদুঈন সংস্কৃতি।
- লিঙ্ক: Routledge – Arabia and the Arabs: From the Bronze Age to the Coming of Islam by Robert G. Hoyland
৭. প্রাক-ইসলামী আরবে নারীদের শিক্ষা, মর্যাদা ও ইসলামের ভূমিকা
- বিষয়: আধুনিক ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের আলোকে মুসলিম এবং প্রাক-ইসলামী বিশ্বে নারী ও লিঙ্গভিত্তিক অধিকারের তুলনা।
- লিঙ্ক: Yale University Press – Women and Gender in Islam by Leila Ahmed
৮. প্রাক-ইসলামী আরবে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধবন্দিনী প্রথা (সিরাত ও ইতিহাস)
- বিষয়: উম্মে কিরফা, আসমা বিনতে মারওয়ান এবং বনু ফাযারা অভিযানের ঐতিহাসিক বিবরণ এবং বিজিতদের পরিণতি।
- লিঙ্ক: The Life of Muhammad (English Translation of Ibn Ishaq’s Sirat Rasul Allah by A. Guillaume)
৮. ইসলামী ফিকহ ও হাদিস ব্যাকরণ গ্রন্থ (যুদ্ধবন্দিনী ও দাসী সম্পর্ক)
- বিষয়: ইসলামী আইনে যুদ্ধবন্দিনী ও দাসী সংক্রান্ত আহকাম ও ব্যাখ্যামূলক দলিল।
- লিঙ্ক: Musannaf of Abd al-Razzaq al-Sanani





