মানুষ কি আসলেই নিখুঁত সৃষ্টি?

ধর্মীয় বা ঐতিহ্যগত বয়ানে প্রায়ই দাবি করা হয় যে মানুষ নাকি বিশ্বজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ও নিখুঁততম সৃষ্টি। আমাদের চেতনা, বুদ্ধিমত্তা ও জটিল শারীরিক গঠন দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে মানুষের শরীর বুঝি কোনো মহা-প্রকৌশলীর নিখুঁত নকশার ফসল। কিন্তু সত্যি কি তাই? বিজ্ঞান ও মানব শারীরবিদ্যার (Human Anatomy) আলোয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষ মোটেই কোনো নিখুঁত নকশা নয়; বরং কোটি কোটি বছরের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া অসংখ্য ভুল, কাটছাঁট আর জোড়াতালির এক অদ্ভুত কোলাজ।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় কুয়োর ব্যাঙের মতো। বাইরে থেকে চোখ, কান, হাত বা পায়ের কাজ দেখে আমাদের মনে হয় সবকিছুই বুঝি চরম সুসংগঠিত। কিন্তু যখন বায়োলজি ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষের ভেতরের অদ্ভুত সব শারীরিক ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে মানুষের শরীর কোনো অলৌকিক নকশা নয়, বরং কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের পথচলায় টিকে থাকার সুবিধার্থে সাময়িকভাবে জোড়াতালি দেওয়া একটি জৈবিক কাঠামো।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের শারীরবৃত্তীয় ও জৈবিক গঠনের মূল কিছু বড় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মেরুদণ্ড ও কোমর ব্যথার কারণ

আমাদের পূর্বপুরুষরা চার পায়ে হাঁটতেন। হঠাৎ করে সোজা হয়ে দুই পায়ে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় বিবর্তন আমাদের মেরুদণ্ডকে একটি উল্লম্ব স্তম্ভে পরিণত করেছে। অথচ আমাদের শরীরের ওপরের অংশের ভার বহন করার জন্য এস-আকারের (S-shaped) এই মেরুদণ্ড মোটেও আদর্শ নকশা নয়। এর ফলেই মানবজাতির একটি বিশাল অংশ সারা জীবন কোমর ব্যথা, সাইটিকা এবং ডিস্ক স্লিপের মতো যন্ত্রণাদায়ক সমস্যায় ভোগে। চারপায়ী প্রাণীদের কখনোই মানুষের মতো এই কোমর ব্যথার সমস্যায় ভুগতে হয় না।

২. খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর বিপজ্জনক প্রতিবেশী

আমাদের গলার ভেতরে বাতাস চলাচলের পথ (শ্বাসনালী) এবং খাবার গিলে খাওয়ার পথ (খাদ্যনালী) একেবারেই পাশাপাশি অবস্থিত এবং এদের প্রবেশপথ একই। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক জৈবিক ত্রুটি। একটু অসাবধান হলেই খাবার বা জল শ্বাসনালীতে ঢুকে মানুষ শ্বাসরোধ হয়ে মারা যেতে পারে। একে বিজ্ঞানে ‘কোকিং হ্যাজার্ড’ বলা হয়। যদি মানুষের গঠন সত্যিই নিখুঁত হতো, তবে শ্বাস নেওয়া ও খাবার খাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা দুটি পাইপ বা পথ থাকত।

৩. দাঁতের জায়গার অভাব ও আক্কেল দাঁতের যন্ত্রণা

আদিম মানুষের চোয়াল ছিল অনেক বড় ও শক্তিশালী। বিবর্তনের ধারায় মানুষের মস্তিষ্ক বড় হয়েছে এবং কাঁচা মাংসের বদলে রান্না করা নরম খাবার খাওয়ার ফলে আমাদের চোয়াল ছোট হয়ে এসেছে। কিন্তু আমাদের জিনগত সংকেতে এখনো ৩২টি দাঁতের নকশাই রয়ে গেছে। ফলে ছোট চোয়ালে শেষ দাঁত বা আক্কেল দাঁতের (Wisdom Teeth) জায়গা হয় না। এতে দাঁত বাঁকা হয়ে ওঠা, মাড়িতে প্রচণ্ড ব্যথা এবং অস্ত্রোপচার করে দাঁত তুলে ফেলার মতো অহেতুক কষ্ট পোহাতে হয়।

৪. অ্যাপেনডিক্স ও অপ্রয়োজনীয় অঙ্গের ঝুঁকি:

মানুষের শরীরে অ্যাপেনডিক্স নামক একটি অঙ্গ রয়েছে, যা আদতে মানবদেহে কোনো প্রয়োজনীয় কাজই করে না। এটি আমাদের শাকাহারী পূর্বপুরুষদের সেলুলোজ হজম করার একটি প্রাচীন অবশিষ্টাংশ মাত্র। কাজ না থাকলেও এই অপ্রয়োজনীয় অঙ্গটিতে অহেতুক ইনফেকশন বা অ্যাপেনডিসাইটিস হতে পারে, যা সময়মতো অস্ত্রোপচার না করলে পচে গিয়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। একটি নিখুঁত নকশায় এমন উদ্দেশ্যহীন ও প্রাণঘাতী অঙ্গের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব।

৫. চোখের ভেতরের অদ্ভুত রিভার্স ওয়্যারিং

বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের চোখের গঠন বিবর্তনের অদ্ভুত এক ভুল নকশা। আমাদের চোখের রেটিনার উল্টো দিকে স্নায়ু বা ওয়্যারিং সাজানো রয়েছে। ফলে আলোর সংকেত রেটিনা ভেদ করে ভেতরে যেতে হয় এবং স্নায়ুগুলো যেখানে চোখের পেছন দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, সেখানে কোনো আলো সংগ্রাহক কোষ থাকে না। ফলে প্রতিটি মানুষের চোখেই একটি ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা অন্ধবিন্দু তৈরি হয়। অথচ অক্টোপাসের চোখের ওয়্যারিং একদম সঠিকভাবে সোজাভাবে সাজানো, তাদের চোখে কোনো ব্লাইন্ড স্পট নেই।

৬. অনাক্রম্যতন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেমের আত্মঘাতী ভুল

আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শরীরকে ক্ষতিকর জীবাণু থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি। কিন্তু প্রায়শই এটি চরম বিভ্রান্তির পরিচয় দেয় এবং শরীরের নিজস্ব সুস্থ কোষগুলোকেই শত্রু মনে করে আক্রমণ করে বসে। একে বলা হয় অটোইমিউন ডিজিজ (যেমন টাইপ-১ ডায়াবেটিস, লুপাস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস)। একটি শক্তিশালী ও নিখুঁত ব্যবস্থার নিজের শরীরকেই নিজে ধ্বংস করা কোনো সুসংগঠিত প্রজ্ঞার পরিচয় হতে পারে না।

৭. সন্তান জন্মদানের প্রাণঘাতী ঝুঁকি

দুই পায়ে হাঁটার কারণে মানুষের পেলভিস বা শ্রোণীবলয় অনেক সংকীর্ণ হয়ে গেছে, অন্যদিকে বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের শিশুর মাথার আকার অনেক বড় হয়েছে। এর ফলে সন্তান জন্মদান মানুষের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও জীবনঘাতী একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার (সি-সেকশন) আবিষ্কারের আগে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কোটি কোটি নারী ও শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃতির অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীকে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে এত উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে হয় না।

৮. বংশগতির ডিএনএ ও সেলুলার ভুল (ক্যানসার)

আমাদের কোষ বিভাজনের প্রক্রিয়াটি মোটেও ত্রুটিমুক্ত নয়। ডিএনএ অনুলিপির সময় প্রতিনিয়ত অসংখ্য মিউটেশন বা ভুল ঘটে। শরীর এই ভুলগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করলেও মাঝে মাঝে ব্যর্থ হয়, যার ফলে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধি পেয়ে ক্যানসারের মতো মারণব্যাধির জন্ম হয়। বিবর্তন যদি মানুষকে পরম নিখুঁত করে বানাত, তবে কোষের এই আত্মঘাতী মিউটেশন ঘটত না।

​৯. প্রজনন ও বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থার অদক্ষ একত্রীকরণ

প্রকৌশল ও স্বাস্থ্যবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রজনন অঙ্গ (যৌনাঙ্গ) এবং বর্জ্য নিষ্কাশন অঙ্গকে (রেচনতন্ত্র) প্রায় একই স্থানে বা গা ঘেঁষে স্থাপন করা একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ নকশা। এর ফলে মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত বিভিন্ন প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সংক্রামক ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। একটি সাধারণ স্বাস্থ্যকর ও সুসংগঠিত নকশায় জীবনদানকারী প্রজনন ব্যবস্থা ও ক্ষতিকর বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে নিরাপদ দূরত্বে আলাদা রাখাই হতো স্বাভাবিক প্রজ্ঞার পরিচয়। অথচ মানুষের শরীরে এদের একই জায়গায় ঘেঁষাঘেঁষি অবস্থান বিবর্তনের অপ্রস্তুত ও অপরিকল্পিত জোড়াতালিরই প্রমাণ দেয়।

তাহলে মানুষ আসলে কী?

বিজ্ঞান স্পষ্ট দেখায় যে মানুষ কোনো অলৌকিক ও নিখুঁত সৃষ্টি নয়; বরং বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বেঁচে থাকার তাগিদে তৈরি হওয়া একটি অপরিপক্ক ও সীমাবদ্ধ জৈবিক সত্তা। প্রকৃতির অন্ধ নিয়ম ও হাজার হাজার বছরের বিবর্তনীয় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টার ফলে আমরা আজকের এই রূপ পেয়েছি। যে ত্রুটি ও শারীরিক সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের বহন করতে হয়, তা প্রমাণ করে যে মানুষ পরম প্রজ্ঞাময় কোনো নিখুঁত নকশার ফসল নয়, বরং অন্ধ বিবর্তনের এক ঐতিহাসিক দলিল।

তথ্যসূত্র:

১. Nature – The evolutionary origin of human back pain and bipedalism https://www.nature.com/articles/s41598-020-72120-w

২. Smithsonian Magazine – Evolution’s Bottom Line: The Blind Spot in the Human Eye https://www.smithsonianmag.com/science-nature/evolution-blind-spot-human-eye-180952080/

৩. National Center for Biotechnology Information (NCBI) – The evolution of human childbirth and pelvic anatomy https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4596068/

৪. Harvard University – The Scar of Human Evolution and Vestigial Organs https://scholar.harvard.edu/files/shleifer/files/evolution.pdf

৫. National Center for Biotechnology Information (NCBI) – The Urogenital System and Evolutionary Trade-offs in Human Anatomy

Related Posts

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মানুষ সাধারণত তার নিজের রূপ, অনুভূতি, কল্পনা এবং সীমাবদ্ধতা দিয়েই সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে চায়। এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism) বা মানব রূপারোপবাদ। সহজ ভাষায়, মানবীয় আবেগ, আকৃতি বা চরিত্রকে কোনো অ-মানবীয় বস্তু বা পরম সত্তার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াই হলো অ্যানথ্রোপোমরফিজম। কার্টুনে পশুপাখির কথা বলা যেমন অ্যানথ্রোপোমরফিজম, ঠিক তেমনি ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব ও ঈশ্বর ভাবনায় মানবীয় গুণাবলী আরোপ করা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।…

Read more

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

যখনই প্রাণের উদ্ভব কীভাবে কোনো অলৌকিক ঈশ্বরের সাহায্য ছাড়াই রাসায়নিক নিয়মে ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করা হয়, তখন ধার্মিকদের তোলা পরবর্তী এবং সর্বশেষ প্রচলিত প্রশ্নটি হয়: “তাহলে এই বিশাল মহাবিশ্ব কোথা থেকে এলো? শূন্য থেকে কি কোনো কিছু এমনি এমনি সৃষ্টি হতে পারে? কোনো না কোনো সৃষ্টিকর্তা বা প্রথম কারণ নিশ্চয়ই থাকতে হবে।” ধার্মিকদের এই আর্গুমেন্টটি দর্শনের ভাষায় ‘ক্যাল্যাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট’ বা কার্যকারণ তত্ত্ব এবং কন্টিনজেন্সি আর্গুমেন্ট নামে পরিচিত। প্রাচীন…

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন