ইসলামি শরীয়তে বাদ্যযন্ত্র এবং সুরের স্থান অত্যন্ত বিতর্কিত। অধিকাংশ সনাতনপন্থী স্কলারদের মতে, ইসলামে বাদ্যযন্ত্র এবং গান-বাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম। এর সপক্ষে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অনেকগুলো বাণী বা হাদিস পেশ করা হয়, যেখানে বিশেষ করে বাঁশিকে “শয়তানের আওয়াজ” বা “শয়তানের বাদ্যযন্ত্র” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চরম বিস্ময়কর বিষয় হলো, যখন স্বয়ং নবীর কাছে আল্লাহর তরফ থেকে সবচেয়ে পবিত্র জিনিস অর্থাৎ ‘ওহী’ বা ঐশ্বরিক বাণী নাজিল হতো, তখন তার আওয়াজকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি এই নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্র বা ঘণ্টার আওয়াজের সাথেই উপমা দিয়েছেন। এই গভীর স্ববিরোধিতা ওহীর পবিত্রতা এবং ইসলামের আইনি কাঠামোকে এক বিশাল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও হাদিসের বিবরণ
ওহীর আওয়াজ ও বাঁশি বিতর্কে নবীর এই স্ববিরোধিতা স্ববিরোধিতাটি বুঝতে হলে ইসলামের নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ থেকে দুটি ভিন্ন বর্ণনাকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করতে হবে:
১. ওহী আসার শব্দ কেমন ছিল?
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে ওহী কীভাবে আসত, তা জানতে চেয়ে সাহাবীরা একবার প্রশ্ন করেছিলেন। এর জবাবে নবী ওহী আসার তীব্রতা ও শব্দের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা বুখারী ও মুসলিমের অন্যতম প্রধান হাদিস:
সহীহ বুখারী (হাদিস নং ২, তাওহীদ পাবলিকেশন্স):
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনে হিশাম (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে ওহী কীভাবে আসে?” রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “কোনো কোনো সময় তা আমার কাছে ঘণ্টার ধ্বনি বা বাঁশির আওয়াজের মতো (صلصلة الجرس – সালসালাতিল জারাস) আসে। আর এটিই আমার ওপর সবচেয়ে কষ্টদায়ক হয়…”
(নোট: মূল আরবি শব্দ ‘জারাস’ এবং ‘সালসালাহ’ দ্বারা অবিরাম ধাতব ঝনঝনানি, ঘণ্টার আওয়াজ বা বাঁশির তীব্র তীক্ষ্ণ সুরের প্রতি সংকেত করা হয়, যা বাংলা হাদিস গ্রন্থগুলোতে সাধারণত ‘ঘণ্টার আওয়াজ’ বা ‘বাঁশির ন্যায় শব্দ’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।)
২. বাঁশি ও ঘণ্টার ব্যাপারে ইসলামের আইনি অবস্থান
এবার দেখা যাক, যে ঘণ্টার শব্দ বা বাঁশির সুরের সাথে ওহীর তুলনা করা হলো, সাধারণ মানুষের জীবনে সেটির অবস্থান ইসলামে কেমন:
সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ৫৫৫৬, তাওহীদ পাবলিকেশন্স):
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, *”ঘণ্টা বা বাঁশি হলো শয়তানের বাদ্যযন্ত্র (المزمار مزمور الشيطان – বাদ্যযন্ত্র হলো শয়তানের বাদ্য)।”
সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ৫৫৫৫, তাওহীদ পাবলিকেশন্স):
নবী (সা.) আরও বলেছেন, “ফেরেশতারা এমন কোনো কাফেলার (দলের) সাথে ভ্রমণ করেন না, যাদের সাথে কুকুর বা ঘণ্টা/বাঁশি থাকে।”
সমালোচকদের মূল আপত্তি
ইসলামের এই দুটি প্রতিষ্ঠিত বর্ণনাকে পাশাপাশি রাখলে সমালোচকেরা অত্যন্ত ধারালো কিছু প্রশ্ন তোলেন:
১. শয়তানের উপমায় ঐশ্বরিক বাণী?
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, শয়তান হলো পরম অপবিত্র, অভিশপ্ত এবং আল্লাহর শত্রু। আর ওহী হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র এবং ঐশ্বরিক বিষয়।
সমালোচকদের প্রশ্ন: আল্লাহ বা জিবরাঈল (আ.) যখন নবীর সাথে যোগাযোগ করছেন, তখন সেই পবিত্রতম শব্দের উপমা দিতে গিয়ে নবী কেন শয়তানের বাদ্যযন্ত্র (বাঁশি বা ঘণ্টা)-এর সাহায্য নিলেন? একজন ঐশ্বরিক দূরদর্শী নবী কি ওহীর শব্দের বর্ণনা দেওয়ার জন্য প্রকৃতি বা মহাবিশ্বের অন্য কোনো পবিত্র এবং সুন্দর উপমা খুঁজে পেলেন না?
২. ফেরেশতাদের আগমন বনাম ঘণ্টার শব্দ
হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যেখানে ঘণ্টা বা বাঁশির শব্দ থাকে, সেখানে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না বা দূর দিয়ে চলে যান। অথচ, প্রধান ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) যখন স্বয়ং ওহী নিয়ে আসতেন, তখন নবীর কানে সেই ঘণ্টার ঝনঝনানি বা বাঁশির তীব্র আওয়াজই প্রতিধ্বনিত হতো!
সমালোচকদের প্রশ্ন: যে শব্দের কারণে ফেরেশতারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে পালায়, সেই একই শব্দের রূপ ধরে ফেরেশতা জিবরাঈল কীভাবে নবীর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন? এটি কি স্পষ্ট লজিক্যাল স্ববিরোধিতা নয়?
ইসলামি অ্যাপোলজিস্টদের ‘গোঁজামিল’ এবং তার খণ্ডন
এই চরম টেক্সটচুয়াল বা আইনি স্ববিরোধিতা ঢাকতে ইসলামি স্কলাররা যুগের পর যুগ যে সমস্ত খোঁড়া যুক্তি দিয়ে আসছেন, আধুনিক যুক্তির সামনে তা খড়কুটোর মতো উড়ে যায়:
গোঁজামিল ১: “নবী আসলে বাঁশির সুর বোঝাননি, তিনি শব্দের তীব্রতা বোঝাতে ‘ঝনঝনানি’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।”
খণ্ডন: অ্যাপোলজিস্টরা দাবি করেন আরবি ‘সালসালাহ’ মানে কেবল ধাতব ঝনঝনানি। কিন্তু সমস্যা হলো, আরবের মানুষেরা ঘণ্টার ভেতরের দুলুনি বা বাঁশির ফু দিয়ে তৈরি করা একটানা তীক্ষ্ণ সুর বোঝাতেই এই শব্দটি ব্যবহার করত। সবচেয়ে বড় কথা, তৎকালীন আরবরা ঘণ্টার বাদ্য ও বাঁশির আওয়াজের সাথে অত্যন্ত পরিচিত ছিল। নবী যদি কেবল “তীব্র শব্দ” বোঝাতে চাইতেন, তবে তিনি মেঘের ডাক বা বজ্রপাতের উপমা দিতে পারতেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে ‘জারাস’ (ঘণ্টা/বাঁশির সুর) শব্দটাই বেছে নিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে শয়তানের বাদ্য হিসেবে পরিচিত ছিল।
গোঁজামিল ২: “ওহীর আওয়াজ শুনে শয়তান যেন পালিয়ে যায়, সেজন্য ওটা ঘণ্টার শব্দের মতো শোনাত।”
খণ্ডন: এটি একটি হাস্যকর গোঁজামিল। কারণ, ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী ঘণ্টা বা বাঁশির শব্দ শুনলে শয়তান পালায় না, বরং শয়তান সেখানে উপস্থিত হয় এবং নাচানাচি করে (যেহেতু একে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র বলা হয়েছে)। শয়তানকে তাড়ানোর জন্য ইসলামে আযান বা কুরআনের বাণীর কথা বলা হয়েছে, ঘণ্টার শব্দের কথা বলা হয়নি। অতএব, ওহীর শব্দকে শয়তানের প্রিয় বাদ্যযন্ত্রের সাথে মেলানো কোনোভাবেই জাস্টিফাই করা যায় না।
গোঁজামিল ৩: “এটি কেবল একটি উপমা মাত্র, বাস্তব শব্দের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।”
খণ্ডন: যদি এটি কেবলই একটি সাধারণ উপমা হয়, তবে তা আরও বড় বিপত্তি তৈরি করে। কারণ, একজন আদর্শ শিক্ষক বা নবী তাঁর উম্মতকে কোনো কিছুর বর্ণনা দেওয়ার সময় এমন উপমা ব্যবহার করবেন যা পবিত্র এবং ইতিবাচক। যে বস্তুটিকে তিনি নিজেই সমাজে ‘হারাম’ এবং ‘শয়তানি’ বলে নিষিদ্ধ করছেন, নিজের জীবনের সবচেয়ে পবিত্রতম অভিজ্ঞতার (ওহী) গভীরতা বোঝাতে সেই নিষিদ্ধ বস্তুর উপমা দেওয়া চরম মনস্তাত্ত্বিক স্ববিরোধিতা ও ভণ্ডামির লক্ষণ।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সমালোচকদের মতে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে ইসলামের ওহী বা শরীয়তের বিধানগুলো কোনো সুসংগত ঐশ্বরিক পরিকল্পনা থেকে আসেনি। যখন সঙ্গীত বা বাদ্যযন্ত্রকে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন হয়েছে, তখন সেটিকে ঢালাওভাবে “শয়তানের বাদ্য” বলে দেওয়া হয়েছে। আবার যখন ওহী আসার মনস্তাত্ত্বিক ও কাল্পনিক তীব্রতা বোঝানোর দরকার হয়েছে, তখন নিজের অজান্তেই আরবের অতি পরিচিত ঘণ্টা বা বাঁশির একটানা তীক্ষ্ণ সুরের আশ্রয় নিতে হয়েছে। নিজের তৈরি করা ধর্মীয় ট্যাবু বা নিষিদ্ধ বিষয়ের বেড়াজালে স্বয়ং নবীর এই আটকে পড়াই প্রমাণ করে যে—ইসলামের ঐশ্বরিক বাণী এবং এর নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত তৎকালীন মানুষের চিন্তাভাবনা ও পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত একটি মানবিক সৃষ্টি মাত্র।
নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র:
ওহী আসার সময় ঘণ্টা বা বাঁশির শব্দের বিবরণ: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ২ (অধ্যায়: ওহীর সূচনা)।
ঘণ্টা ও বাঁশি শয়তানের বাদ্যযন্ত্র হওয়ার বিবরণ: সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৫৫৫৬ (অধ্যায়: কিতাবুল লিবাস ওয়ায যাহীনাহ বা পোশাক ও সাজসজ্জা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: কুকুর ও ঘণ্টা সাথে রাখা মাকরুহ)।
ফেরেশতারা ঘণ্টা ও বাঁশি থাকলে আসেন না: সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৫৫৫৫।





