নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর স্ত্রীগণ কি আসলেই অসহায় ছিলেন?

১. নবী মুহাম্মদ (সা.) এর যেসব স্ত্রীগণ অসহায় ছিলেন না :

১. আয়েশা বিনতে আবী বকর (৬)
তিনি ছিলেন মদিনা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ও নবীর বন্ধু আবু বকর (রা.)-এর কনিষ্ঠ ও কুমারী কন্যা। তিনি কোনো প্রকার দারিদ্র্য, নির্যাতন বা সামাজিক অসহায়ত্বের মধ্যে ছিলেন না; বরং সচ্ছল ও পরম আদরে লালিত-পালিত ছিলেন। বিয়ের সময় আয়েশার বয়স ছিলো মাত্র ৬।

২. হফসা বিনতে উমর (২১): তিনি প্রভাবশালী সাহাবি উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রা.)-এর কন্যা ছিলেন। বদর যুদ্ধে তাঁর স্বামী খুনাইস ইবনে হুযাফা নিহত হওয়ার পর তিনি বিধবা হন। তবে উমর (রা.)-এর মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বের আশ্রয়ে থাকায় তিনি কোনো ধরনের আর্থিক বা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন না। ২১ বছর বয়সী হাফসাকে নবী মুহাম্মদ বিয়ে করেন।

৩. জয়নব বিনতে জাহাশ (৩৫):  তিনি কোনো অসহায় বিধবা বা নিরাস্রয় নারী ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশীয় অভিজাত নারী এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পালকপুত্র জায়েদ ইবনে হারেসার স্ত্রী। কিন্তু নবী তাকে স্বল্পবস্ত্রে দেখে ফেললে নবীর মনের পরিবর্তন ঘটে। ফলে কুরআনের আয়াত নাজিল হয় এবং তৎকালীন আরবের দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা দত্তকপ্রথা বাতিল হয় এবং জায়েদ তাকে দিলে নবী তাকে বিয়ে করেন।

৪. মায়মুনা বিনতে আল-হারিস (রা.) (২৭) : তিনি ছিলেন মক্কার প্রভাবশালী ইবনে আব্বাস ও খালিদ ইবনে আল-ওয়ালিদের মতো ব্যক্তিত্বের আত্মীয়া। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কাজা ওমরাহ পালনকালে মক্কায় তাঁর সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়।

৫. জয়নব বিনতে খুজায়মাহ (৩০): তিনি কোনো নিরাস্রয় বা সামাজিকভা‌বে অসহায় নারী ছিলেন না; বরং তিনি চরম দানশীলতার জন্য প্রাক-ইসলামিক যুগ থেকেই ‘উম্মুল মাসাকীন’ (মিসকীনদের মাতা) উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। তাঁর প্রথম স্বামী ওবায়দা ইবনুল হারিস (অথবা মতান্তরে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ) বদর ও উহুদ যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর তিনি বিধবা হন। তবে তিনি কেবল অসহায়ত্বের কারণে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি, বরং তাঁর মহৎ চরিত্র ও সমাজে তাঁর ইতিবাচক প্রভাবের প্রতি সম্মান জানিয়ে নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁকে বিবাহ করেন।

৬. খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (৪০): তিনি ছিলেন প্রাক-ইসলামি যুগের অত্যন্ত ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নারী। নবী শুরুতে তাঁর একজন কর্মচারী ছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পর খাদিজার বিপুল ধনসম্পদ ও সামাজিক প্রভাব দিয়ে নবি (সা.)-এর দাওয়াতি কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও অনন্য ভূমিকা পালন করেন। এমনকি খাদিজা নবী মুহাম্মদের চাচা আবু তালিবের আর্থিক সমস্যার কারণে নবীর চাচাতো ভাই আলীর দায়িত্বও নিয়েছিলেন।

২. যেসব নারীদের পরিবার ও স্বামীদের হত্যা করে অসহায় বানিয়ে নবী মুহাম্মদ বিয়ে করেন:

১. সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (১৭): তিনি খাইবার বিজয়ের পূর্বে বিজিত বিজোড় গোত্রের সর্দারের কন্যা এবং উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। খাইবারের যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা.)- এবং তার সাহাবিদের হাতে তাঁর পিতা, ভাই এবং স্বামী কিনানা নিহত হন। এরপর নবী মুহাম্মাদ তাকে বন্দি করে মদিনায় ফেরার পথেই বিয়ে এবং সহবাস সহবাস করেন। সাফিয়ার বয়স ছিল মাত্র ১৭।

২.জুওয়াইরিয়া বিনতে আল-হারিস (২০):
বনু মুসতালিক গোত্রের ওপর নবী মুহাম্মদ (সা.) এর বাহিনী আকস্মিক আক্রমণ করে জুওয়াইরিয়ার স্বামী মুসাফি ইবনে সাফওয়ানকে হত্যা করে  জুওয়াইরিয়াকে বন্দি করে। তারপর নবী মুহাম্মদের পছন্দ হলে তাকে বিয়ে করেন। জুয়াইরিয়ার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।

নবী মুহাম্মদ (সা.) এর যেসব স্ত্রীগণ আসলেই অসহায় ছিলেন:

১. উম্মে হাবীবা (৩৫): তাঁর এর আসল নাম ছিল রামলাহ বিনতে আবি সুফিয়ান। তিনি ছিলেন মক্কার শক্তিশালী কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের কন্যা। তিনি ও তাঁর স্বামী উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহাশ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। কিন্তু সেখানে তাঁর স্বামী খ্রিস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করলে তিনি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েন। তখন নবী আবিসিনিয়ার খ্রিষ্টান রাজা  নাজাশির মাধ্যমে তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান এবং বিবাহ সম্পন্ন করেন।

২. উম্মে সালমা (৩০): উম্মে সালমা (রা.) ছিলেন কুরাইশদের অত্যন্ত প্রভাবশালী বনু মাখজুম গোত্রের কন্যা। তবে উহুদ যুদ্ধে স্বামী আবু সালমা শহীদ হওয়ার পর এতিম শিশুদের নিয়ে তিনি চরম বিপদে পড়েন। তখন নবী তাকে বিয়ে করেন।

৩. সাওদা বিনতে জামআ (৫০): তিনি ও তাঁর প্রথম স্বামী সাকরান ইবনে আমর (রা.) প্রাথমিক যুগের মুসলিম ছিলেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। মক্কায় ফেরার পর তাঁর স্বামী মারা যান।
স্বামী মারা যাওয়ার পর তাঁর নিজের কাফের পরিবারের কাছে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। তাই নবী তাকে বিয়ে করেন। একপর্যায়ে যদিও সাওদার বয়সের ভার ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে নবি (সা.) তাঁকে বিচ্ছেদ দিতে চাইলে তিনি আকুল অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, জাগতিক প্রাপ্য নয়, বরং আখেরাতে নবি (সা.)-এর স্ত্রী হিসেবে পুনরুত্থানের সুবিধার্থেই তিনি এই দাম্পত্যে থাকতে চান। এজন্য তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর নির্ধারিত রাতের ভাগটি আয়েশা (রা.)-কে ছেড়ে দিয়ে নবির ঘরেই শেষ জীবন অতিবাহিত করেন।

তথ্যসূত্র (Reference Box)

১. আয়েশা বিনতে আবী বকর (রা.):

  • বয়স ও বিবাহ: সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৮৯৪, ৫১৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪২২।
  • মর্যাদা ও পরিবার: ইবনে হিশাম, আল-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩৭।
    ২. হাফসা বিনতে উমর (রা.):
  • বিবাহ ও বয়স: সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৪০০৫ (উমর রা.-এর প্রস্তাব ও বিবাহ সংক্রান্ত); ইবনে সা’দ, আল-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৮১।
    ৩. জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.):
  • ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রথা বাতিল: সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৭।
  • পরিচয় ও বিবাহ: ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৪৪-১৪৬।
    ৪. মাইমুনা বিনতে আল-হারিস (রা.):
  • কাজা ওমরাহ ও বিবাহ: সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৫১০৯, ৪২৫৯; ইবনে সা’দ, আল-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৩২।
    ৫. জয়নব বিনতে খুজায়মাহ (রা.):
  • বিবাহ ও উম্মুল মাসাকীন উপাধি: ইবনে আব্দুল বার্, আল-ইস্তিয়াব ফি মা’রিফাতিল আসহাব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৬৩৭; ইবনে সা’দ, আল-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১১৫। (নোট: উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন আবু সালামা নয়, বরং ওবায়দা ইবনুল হারিস বা আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ; আবু সালামা [রা.] ছিলেন উম্মে সালমার স্বামী)।
    ৬. খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.):
  • ধনে-সম্পদে ভূমিকা ও বিবাহ: ইবনে হিশাম, আল-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৭-১৯১; ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯৩।
    ৭. সফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রা.):
  • খাইবার অভিযান, পরিবার পরিজন ও বিবাহ: সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৩৭১, ৪২১৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩৬৫।
  • বয়স ও ইতিহাস: ইবনে সা’দ, আল-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১২০।
    ৮. জুওয়াইরিয়া বিনতে আল-হারিস (রা.):
  • বনু মুস্তালিক যুদ্ধ ও মুক্তি: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৯৩১; ইবনে হিশাম, আল-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯৪-২৯৫।
    ৯. উম্মে হাবীবা (রা.):
  • আবিসিনিয়ায় পরিস্থিতি ও রাজা নাজাশির মধ্যস্থতা: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৮১; ইবনে সা’দ, আল-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৯৬-৯৮।
    ১০. উম্মে সালমা (রা.):
  • আবু সালমার শাহাদাত ও বিবাহ: সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৯১৮; ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৯১।
    ১১. সাওদা বিনতে জামআ (রা.):
  • আবিসিনিয়া থেকে ফেরা ও বিবাহ: ইবনে সা’দ, আল-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫২-৫৪।
  • রাতের ভাগ আয়েশাকে প্রদান: সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৫২১৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪৬৩; সূরা আন-নিসা, আয়াত ১২৮ (প্রেক্ষিত)।

Related Posts

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মানুষ সাধারণত তার নিজের রূপ, অনুভূতি, কল্পনা এবং সীমাবদ্ধতা দিয়েই সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে চায়। এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism) বা মানব রূপারোপবাদ। সহজ ভাষায়, মানবীয় আবেগ, আকৃতি বা চরিত্রকে কোনো অ-মানবীয় বস্তু বা পরম সত্তার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াই হলো অ্যানথ্রোপোমরফিজম। কার্টুনে পশুপাখির কথা বলা যেমন অ্যানথ্রোপোমরফিজম, ঠিক তেমনি ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব ও ঈশ্বর ভাবনায় মানবীয় গুণাবলী আরোপ করা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।…

Read more

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

যখনই কেউ প্রশ্ন করে, জন্মগতভাবে একটা শিশুকে প্রতিবন্ধী বানিয়ে বা ভয়ানক রোগ দিয়ে আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন? অবুঝ শিশুদের কষ্ট দিয়ে তিনি কিসের পরীক্ষা নেন? এগুলো কি আসলে দয়ার নমুনা নাকি নির্দয়তার নমুনা? আল্লাহ কি আসলেই পরম দয়ালু? নিজের বিবেককে একবার প্রশ্ন করুন তো! ধরুন, আপনি নিজে যদি আল্লাহ হতেন, তাহলে কি কখনো পরীক্ষার অজুহাতে এরকম অমানবিক কাজ করতে পারতেন?

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন