যুগ-প্রেক্ষাপটের নামে দেয়া গোঁজামিলের সংক্ষিপ্ত জবাব

​ইসলামের কোনো বিধান যখন কোনো আধুনিক মানুষের কাছে অপছন্দনীয় বা অনৈতিক মনে হয়, তখন অ্যাপোলজিস্টরা বলে থাকেন—“ওটা তো অমুক যুগের বিশেষ প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছিল, তাই এই যুগে সেটি প্রযোজ্য নয়।”

​কিন্তু প্রশ্ন হলো—কুরআন বা হাদিসের কোথায় বলা আছে যে কোনো নির্দিষ্ট বিধান কেবল ৭ম শতকের প্রেক্ষাপটের জন্য প্রযোজ্য, আর পরবর্তী যুগের মানুষের জন্য নয়? ইসলামের শাশ্বত দাবি অনুযায়ী এর প্রতিটি বিধানই তো কোনো না কোন যুগ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে।

​ইসলাম যেখানে শৌচকার্য করা, হাত-মুখ ধোয়া, কোন্ পা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করা কিংবা কীভাবে আহার করা—এমন অতি নগণ্য দৈনন্দিন আচরণেরও স্পষ্ট ও বিস্তারিত নিয়ম বাতলে দেয়। তাহলে মানুষের সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক জীবনের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দেওয়া কোনো বিধান যদি সত্যিই শুধু একটি নির্দিষ্ট যুগ ও সমাজের প্রেক্ষাপটের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে কুরআন বা হাদিসে সেটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকত না কেন?

আর যদি এমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকে,
তাহলে কোন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে কোন বিধান চিরকাল প্রযোজ্য আর কোনটি শুধু সেই সময়ের জন্য বা বিশেষ প্রেক্ষাপটের জন্য ছিল? যদি একটি বিধানকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে আজকের জন্য অপ্রযোজ্য বলা যায়, তাহলে একই যুক্তি অন্য বিধানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হবে না কেন? নাকি আধুনিক নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধানগুলোর ক্ষেত্রে শুধু নিজেদের সুবিধামতো “প্রেক্ষাপট” নামক অজুহাত ব্যবহার করা হচ্ছে?

ধরা যাক, এই ‘যুগ ও প্রেক্ষাপট’-এর অজুহাতটিকে যদি আমরা একটি সার্বজনীন আইনি নীতি হিসেবে গ্রহণ করি, তবে একই স্কেল বা মানদণ্ড প্রয়োগ করে আধুনিক যুগে কোনো নিষিদ্ধ বিষয়কে হালাল কিংবা কোনো অনুমোদিত বিষয়কে হারাম বা অপ্রযোজ্য দাবি করা হলে কী দাঁড়ায়?

  • উটের মূত্র পান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান:
    সহীহ বুখারীতে (হাদিস: ৫৬৮৬) উটের মূত্র পানের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। অ্যাপোলজিস্টরা বলেন, এটি ৭ম শতকের আরবের চিকিৎসা প্রথার প্রেক্ষাপট ছিল, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে অপ্রযোজ্য। যদি প্রাচীন চিকিৎসা প্রথাকে ‘প্রেক্ষাপট’ বলে বাতিল করা যায়, তবে অন্যান্য সামাজিক নীতিকে বাদ দেওয়া যাবে না কেন?
  • শিশুবিবাহ ও দাসপ্রথা: শিশুবিবাহ বা যুদ্ধবন্দিনী ও দাস-দাসী ভোগের ক্ষেত্রে বলা হয়—তৎকালীন আরবে এটিই ছিল সামাজিক বাস্তবতা, যা আজকের মানবাধিকারের যুগে অমানবিক।
  • হুদুদ বা মধ্যযুগীয় শাস্তি: চুরি করলে হাত কেটে ফেলা কিংবা ব্যভিচারের জন্য পাথর মেরে হত্যার (রজম) মতো শারীরিক অঙ্গচ্ছেদের বিধানগুলো সেই যুগের বিচারব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিলো বলে আজকের আধুনিক মানবাধিকারের সভ্য যুগে এটাকেও অপ্রযোজ্য বা বাতিল বলা যাবে না?
  • জিনা বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক (যা তৎকালীন প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ ছিল): ৭ম শতকে পিতৃত্ব পরিচয় নিশ্চিত করা বা বংশধারা রক্ষা করার জন্য কোনো কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (Contraceptive) কিংবা ডিএনএ টেস্ট ছিল না। ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে যখন নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক পিতৃত্ব পরীক্ষার প্রযুক্তি রয়েছে, তখন ‘আধুনিক প্রযুক্তির প্রেক্ষাপট’ দেখিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিভিত্তিক জিনা বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে কেন হালাল বা বৈধ বলা যাবে না?
  • জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জনসংখ্যা বিস্ফোরণ: তৎকালীন আরবে সন্তান জন্মদান ও বংশবৃদ্ধি উৎসাহিত করা হলেও এবং কিছু ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ নিরুৎসাহিত করা হলেও, আধুনিক যুগে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সেকালের প্রেক্ষাপটের অজুহাতে যদি প্রাচীন নীতি বাদ দেওয়া যায়, তবে বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় কি জন্মনিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বৈধ ও আবশ্যক নয়?
  • সুদ (রিবা) ও আধুনিক অর্থনীতি: তৎকালীন আরবের মহাজনী শোষণের প্রেক্ষাপটে রিবা হারাম হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক বৈশ্বিক ব্যাংকিং ও অর্থব্যবস্থার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাহলে ‘আধুনিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট’ দেখিয়ে সুদের বিধানকে কেন পুনর্বিবেচনা করা যাবে না?
  • সমকামিতা ও বিজ্ঞানের বিকাশ: তৎকালীন ধারণার ওপর ভিত্তি করে সমকামিতা নিষিদ্ধ হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব যখন একে স্বাভাবিক মানসিক বৈচিত্র্য হিসেবে গণ্য করে, তখন ‘বিজ্ঞানের আধুনিক প্রেক্ষাপট’ দেখিয়ে এখানে নীতি শিথিল করা হয় না কেন?
  • চিত্তবিনোদন, সংগীত ও চিত্রশিল্প: বাদ্যযন্ত্র, গান-বাজনা এবং প্রাণীর ছবি বা মূর্তি আঁকা হাদিসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। সেকালের মূর্তিপূজা বা অপসংস্কৃতির প্রেক্ষাপট পার হয়ে আজ যখন এগুলো মানসিক বিকাশ ও শিক্ষার মাধ্যম, তখন ‘আধুনিক সুস্থ সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট’ দেখিয়ে এগুলোকে সার্বজনীনভাবে হালাল করা যাবে না কেন?

মূল প্রশ্ন

যদি “যুগ ও প্রেক্ষাপট” অজুহাত দেখিয়ে শিশুবিবাহ, দাসপ্রথা, উটের মূত্র সম্পর্কিত হাদিস কিংবা হুদুদ শাস্তির মতো অস্বস্তিকর বিষয়গুলোকে ‘সেকালের সামাজিক বাস্তবতা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়—তবে একই যুক্তি ব্যবহার করে যে কেউ কেন নিজের সুবিধামতো যেকোনো হারাম বিষয়কে (যেমন: জিনা, সুদ, গান-বাজনা, সমকামিতা) আজকের যুগে হালাল দাবি করবে না?

কুরআন বা হাদিসের কোথায় সেই বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ নীতি নির্ধারণ করা আছে—যার ভিত্তিতে অ্যাপোলজিস্টরা নিজেরা ঠিক করেন কোন্ বিধানটি ‘চিরন্তন শাশ্বত’ আর কোন্ বিধানটি ‘সেকালের মেয়াদি প্রেক্ষাপট’?

যদি এই পার্থক্য নির্ধারণের কোনো নির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ ঐশ্বরিক মানদণ্ড না থাকে, তবে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে—“যুগ ও প্রেক্ষাপটের দোহাই” কোনো যুক্তিসঙ্গত ধর্মীয় নীতি নয়; বরং আধুনিক নৈতিকতা, মানবাধিকার ও বিজ্ঞান যখনই কোনো ধর্মীয় বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখনই সুবিধাজনক বিধানগুলোকে টিকিয়ে রাখা আর অস্বস্তিকর বিধানগুলোকে আড়াল করার জন্য ব্যবহৃত এটি একটি দ্বিমুখী ও চতুর গোঁজামিল মাত্র।

Related Posts

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামী ধর্মগ্রন্থে প্রাণী সংক্রান্ত নানা বিতর্কিত নির্দেশনার কথা অনেকেরই জানা, তবে উদ্ভিদের মতো একটি সম্পূর্ণ অচেতন ও নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতি ধর্মীয় বিদ্বেষ আরোপের ঘটনাও কিন্তু কম নয়। পরিবেশ সুরক্ষা ও বৃক্ষরোপণের কথা বলে ইসলামকে অনেক সময় পরিবেশবান্ধব হিসেবে প্রচার করা হলেও, হাদিস ও কোরআনের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় সেখানে নির্দিষ্ট কিছু গাছকে ‘শত্রুর গাছ’ বা ‘অভিশপ্ত বৃক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কেবল অলৌকিক…

Read more

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামের উত্তরাধিকার আইন  নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি কথা প্রায়ই শোনানো হয় যে, “ইসলামে নারীরা কেবল অর্ধেক পায় না, বরং বহু ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও বেশি সম্পত্তি পায়।” কিন্তু আইনের তুলনামূলক মূলনীতি এবং সম-পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিচারে এই দাবিটির বাস্তবতা কতটুকু, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোনো আইনের সমতা বা বৈষম্য পরিমাপ করতে হয় একই স্তরের দুটি আফটার-ইফেক্ট বা সম-পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে। অসদৃশ অবস্থার সাথে অসম তুলনা টেনে নারীর অধিকারকে বেশি…

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন