সাধারণ মুসলিমরা প্রায় দাবি করেন, ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেছে। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস ও শরিয়তের মূল টেক্সট সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। সত্য এটাই যে, ইসলাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেনি; বরং এই দাসপ্রথা বিলুপ্তির সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পশ্চিমা বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।
১. দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস: পশ্চিমা চাপ বনাম মুসলিম বিশ্বের প্রতিরোধ
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে তৎকালীন প্রসিদ্ধ ইসলামি স্কলার এবং ওলামাগণ দাসপ্রথা নিষিদ্ধের বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে শরিয়ত-বিরোধী ও আল্লাহর হালাল করা বিষয়কে হারাম করার ধৃষ্টতা আখ্যা দিয়ে এর ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। পরবর্তীতে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা শক্তির তীব্র political ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে বাধ্য হয়েই মূলত আরবের মুসলিম দেশগুলো একে একে দাসপ্রথা উচ্ছেদ করে। বিশ্বজুড়ে এই প্রথা আইনিভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার অনেক পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে সৌদি আরব (১৯৬২), ওমান (১৯৭০) এবং মৌরিতানিয়ার (১৯৮১) মতো কট্টর ইসলামি রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কারণে একদম শেষ দিকে এসে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
২. ইসলামি আকীদা: ইসলামের কোন বিধান মানুষের কি নিষিদ্ধ করার অনুমতি আছে?
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস এবং ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, যে জিনিস স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর নবী নিষিদ্ধ করেননি, তা চিরতরে নিষিদ্ধ বা হারাম করার সামর্থ্য পৃথিবীর কোনো মানুষের নেই। কুরআন ও হাদিসে যুদ্ধবন্দী নারী ও পুরুষদের দাস-দাসী বানানোর আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে। শরিয়তের পরিভাষায়, মানুষের তৈরি কোনো আইন আল্লাহর দেওয়া একটি স্থায়ী বৈধ বিধানকে চিরতরে “অবৈধ” ঘোষণা করতে পারে না। ফলে, সমসাময়িক আলেমদের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক চাপে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হওয়াকে কেবলই একটি সাময়িক রাজনৈতিক চুক্তি মনে করেন, ইসলামের দৃষ্টিতে এটি রহিত হয়ে যায়নি।
৩. মডারেট মুসলিমদের গোঁজামিল ও তার স্পষ্ট খণ্ডন
গোঁজামিল ১: “ইসলাম ধাপে ধাপে দাসপ্রথা বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল”
আজকের যুগের মডারেট বা আধুনিকতাবাদী মুসলিমরা এই চতুর দাবিটি করে থাকেন। এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নবী মুহাম্মদ যদি সত্যিই চাইতেন যে ভবিষ্যতে এই প্রথা একসময় সমাজ থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাক, তবে তিনি অবশ্যই শরিয়তের একটি গাইডলাইন বা স্পষ্ট বাণী রেখে যেতেন। তিনি বলতে পারতেন—”আমি এখন যুগের প্রয়োজনে দাসপ্রথা রাখছি, কিন্তু ভবিষ্যতে সামাজিক উন্নয়ন ও সাম্যের প্রয়োজনে তোমরা এটিকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করবে।” কিন্তু নবী এমন কোনো কথা বা ভবিষ্যৎ নির্দেশনা কোথাও বলে যাননি। ইসলামে মদ, জুয়া কিংবা সুদকে যেভাবে ধাপে ধাপে স্পষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে পুরোপুরি হারাম করা হয়েছে, দাসপ্রথার ক্ষেত্রে তেমন কোনো চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা কখনোই আসেনি।
গোঁজামিল ২: “নবী দাস মুক্ত করতে উৎসাহিত করে এই প্রথার উচ্ছেদ চেয়েছেন”
মডারেটরা দাবি করেন, বিভিন্ন কাফফারা বা উপলক্ষে দাস মুক্ত করার সওয়াব ঘোষণা করে ইসলাম অনন্য নজির স্থাপন করেছে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি চরম মিথ্যা ন্যারেটিভ। ইসলাম আসার আগে জাহেলিয়াত বা প্রাক-ইসলামি যুগ থেকেই আরবের পৌত্তলিক ও কাফেরদের মধ্যে বিভিন্ন উপলক্ষে, খুশির সংবাদে কিংবা পাপের কাফফারা হিসেবে দাস মুক্ত করার প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ—স্বয়ং নবী মুহাম্মদের জন্ম উপলক্ষে তাঁর আপন চাচা কাফের আবু লাহাব খুশিতে তাঁর দাসী থুয়াইবাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, বিশেষ উপলক্ষে দাস মুক্তির কালচারটি ইসলামের নিজস্ব কোনো আবিষ্কার নয়, এটি আগে থেকেই সমাজে চালু ছিল।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, বহু সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে স্বয়ং নবী মুহাম্মদ নিজেই ক্ষেত্রবিশেষে দাস মুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীর স্ত্রী মায়মূনা (রা.) যখন নবীর অনুমতি ছাড়াই নিজের একজন দাসীকে মুক্ত করে দেন, তখন নবী তা শুনে অসন্তুষ্ট হন এবং মায়মূনাকে বলেন—”তুমি যদি দাসীটিকে মুক্ত না করে তোমার মামাদের দান করে দিতে, তবে তুমি অনেক বেশি সওয়াব বা পুরস্কার পেতে।” যে নবী স্বয়ং নিজে দাস মুক্তির চেয়ে দাসীকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেওয়াকে বেশি সওয়াবের কাজ বলেন, তিনি দাসপ্রথা উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন—এমন দাবি করা এক চরম তামাশা।
অমুসলিম বিশ্বের সভ্যতা বনাম আরবের অনীহা:
মডারেট মুসলিমদের দাবি—”দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করলে সমাজ ভেঙে পড়ত, তাই ইসলাম তা করেনি।” অথচ ইতিহাস বলে, ইসলাম ছাড়াই বহু অমুসলিম রাষ্ট্র শত শত বছর আগে থেকেই দাসপ্রথামুক্ত সভ্য সমাজ গড়ে তুলেছিল। উদাহরণস্বরূপ, আইসল্যান্ড ১১১৭ সালেই (আজ থেকে ৯০০ বছর আগে) দাসপ্রথা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে (গ্রিক দূত মেগাস্থিনিসের বিবরণ অনুযায়ী) রোম বা আরবের মতো মানুষ কেনা-বেচার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক “দাস-ভিত্তিক অর্থনীতি” ছিলই না; বরং সেখানে মানুষের অধিকার অনেক বেশি সুরক্ষিত ছিল (পরবর্তীতে ব্রিটিশরা ১৮৪৩ সালে আইন করে এটি চিরতরে বন্ধ করে)। জাপানেও ১৫৯০ সালেই দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ হয়। যেখানে খ্রিষ্টান, হিন্দু বা বৌদ্ধ প্রধান এই অমুসলিম সমাজগুলো শত শত বছর আগেই দাসপ্রথা ছাড়া টিকে থাকার মতো সভ্যতার পরিচয় দিয়েছে, সেখানে আরবের ইসলামি রাষ্ট্রগুলো আল্লাহর স্থায়ী বিধানের দোহাই দিয়ে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত এই অমানবিক প্রথা ধরে রেখেছিল।
শেষকথা
দাসপ্রথা বিলুপ্তির পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক বৈশ্বিক আন্দোলন, যা পশ্চিমা বিশ্ব নেতৃত্ব দিয়েছিল। ইসলাম যদি নিজেই এটি বিলুপ্ত করত, তবে জাতিসংঘের চাপ দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। নবী যা নিষিদ্ধ করে যাননি এবং যা ভবিষ্যতে বিলুপ্ত করার কোনো নির্দেশও দেননি, তাকে ইসলামের কৃতিত্ব বলে চালিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক অসততা ছাড়া আর কিছুই নয়।
(কুরআন এবং হাদিসে দাসপ্রথা সম্পর্কে কী কী স্পষ্ট বিধান ও দাসপ্রথার পক্ষে আয়াত রয়েছে, এবং মুসলিমদের দেওয়া অন্যান্য সমস্ত গোঁজামিলের বিস্তারিত ও অকাট্য জবাব জানতে নিচে দেওয়া লিংকে ক্লিক করে আমাদের বিস্তারিত আর্টিকেলটি পড়ুন।)
তথ্যসূত্র :
দাস মুক্ত না করে উপহার দেওয়ার হাদিস: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ২৫৯২; সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৯৯৯ [আন্তর্জাতিক নাম্বার অনুযায়ী ২৪৯৫]।
আবু লাহাবের দাসী মুক্ত করার বিবরণ: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৫১০১।
ইসলামি স্কলারদের ফতোয়া ও অবস্থান: শায়খ সালেহ আল-ফাওজান, খুতাব আল-মিনবারিয়্যাহ (خطب المنبرية), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০৭-২০৮ (যেখানে তিনি দাসপ্রথা ইসলামের চিরস্থায়ী বৈধ বিধান এবং এর বিলোপের দাবিকে অজ্ঞতা বলে উল্লেখ করেছেন)।
দাসপ্রথা ও ইসলামি ইতিহাস: Slavery and Islam, ড. জোনাথন ব্রাউন (জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি)।
আরব বিশ্বে পশ্চিমা চাপ ও বিলুপ্তি: Race and Slavery in the Middle East, বার্নার্ড লুইস (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি)।
নির্দিষ্ট দেশ ও সাল (১৯৬২-১৯৮১): Slavery in the Twentieth Century, সুজান মিয়ার্স।





