ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের আবেগের জায়গা হলেও, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও যুক্তি চলে চিরন্তন প্রমাণের ভিত্তিতে। ইসলামে বহুল প্রচলিত একটি দাবি হলো—প্রধান চার কিতাবের আগে আল্লাহ বিভিন্ন যুগে ১০০টি সহিফা বা ছোট কিতাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা এবং সাধারণ যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করলে এই দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। নিচে এর পক্ষে প্রধান প্রধান যুক্তিগুলো তুলে ধরা হলো:
১. লজিক্যাল বা যৌক্তিক অসারতা: স্রষ্টার নিজের কিতাবের নাম ভুলে যাওয়া?
সবচেয়ে বড় যৌক্তিক প্রশ্নটি আসে ইসলামের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থের ভেতরের তথ্য থেকেই। মুসলিমদের আল্লাহ যদি সত্যিই মানবজাতির হেদায়েতের জন্য ১০০টি সহিফা পাঠিয়েই থাকেন, তবে তিনি নিজেই কেন তার শেষ এবং চূড়ান্ত কিতাব ‘কুরআন’-এ সেগুলোর নাম উল্লেখ করতে পারলেন না? কুরআনে তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল বা ইব্রাহিমের সহিফার কথা বলা হলেও, বাকি সহিফাগুলোর কোনো নাম বা সুনির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া হয়নি।
এমনকি অন্য সব বাদ দিলেও, ইসলামের দাবি অনুযায়ী পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী ও মহামানব আদম (আ.)-এর ওপর যে প্রথম সহিফা অবতীর্ণ হয়েছিল, স্রষ্টা স্বয়ং কুরআনে তার নামটাও কেন গোপন রাখলেন বা উল্লেখ করলেন না? মানবজাতির আদি পিতার পাওয়া কিতাবটির নাম বা তার ভাষা কী ছিল—তা স্বয়ং স্রষ্টাও তার শেষ কিতাবে বলেননি, আবার ইতিহাসের পাতাতেও তার কোনো চিহ্ন নেই। স্রষ্টা নিজে কিতাব পাঠাবেন অথচ তার নাম বা তালিকা সংরক্ষণ করতে পারবেন না—এটি চরম একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যৌক্তিক স্ববিরোধিতা।
২. সম্পূর্ণ বিলুপ্তি বনাম মানুষের তৈরি গ্রন্থের স্থায়িত্ব
মানুষ যদি তার নিজের তৈরি বই হাজার বছর ধরে সংরক্ষণ করতে পারে, তবে মহাবিশ্বের স্রষ্টার পাঠানো ১০০টি ঐশ্বরিক নির্দেশনার একটি পৃষ্ঠাও কেন আজ পৃথিবীতে অক্ষত নেই? মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, হাজার হাজার বছর আগের মানুষের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ বা মহাকাব্য (যেমন: গিলগামেশের মহাকাব্য, প্রাচীন মিশরের মৃতদের বই, ভারতের বৈদিক সাহিত্য, কিংবা প্লেটো-অ্যারিস্টটলের দর্শন) আজ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে টিকে আছে। কিন্তু স্রষ্টার পাঠানো কিতাব এভাবে সম্পূর্ণ ধুলোয় মিশে যাবে, আর মানুষের তৈরি সাধারণ বই টিকে থাকবে—এই দাবি সাধারণ বুদ্ধি ও যুক্তিকে অপমান করার শামিল।
৩. সহিফাগুলোর অস্তিত্বের ঐতিহাসিক শূন্যতা
সহিফাগুলোর বিবরণ তো দূরের কথা, ১০০টি সহিফার কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা বা নামও ইতিহাসের কোথাও পাওয়া যায় না। যদি এগুলো সত্যিই এসে থাকে, তবে অন্তত সেগুলোর নাম তো মানুষের মুখে মুখে হলেও টিকে থাকার কথা ছিল।
ইসলামে কিছু দুর্বল বর্ণনায় বলা হয় শীষ (আ.)-এর ওপর ৫০টি, ইদ্রিস (আ.)-এর ওপর ৩০টি, ইব্রাহিম (আ.)-এর ওপর ১০টি এবং মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাতের আগে ১০টি সহিফা নাজিল হয়েছিল। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। এমনকি মূলধারার প্রাচীন ইহুদি বা খ্রিস্টান ঐতিহ্যেও এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ‘১০০ সহিফা’র বিবরণ পাওয়া যায় না। এটি মূলত পরবর্তীকালের কিছু অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা বা ইসরাঈলিয়াতের (ইহুদি লোকগাথা) ওপর ভিত্তি করে মুসলিম সমাজে ডালপালা মেলেছে।
৪. ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক সভ্যতায় সহিফার শূন্য অবদান
ইসলামের ইতিহাস ও বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় সব নবী-রাসূল এবং কিতাব এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে (যেমন: বর্তমান সৌদি আরব, ফিলিস্তিন, ইরাক, মিশর ও সিরিয়ার আশেপাশে)। বনী ইসরাইলদের হাজারো নবীকে হত্যা করার ইতিহাসও এই অঞ্চলের সাথেই যুক্ত।
অনেক সাধারণ মুসলিম, যারা নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বা হাদিস সম্পর্কে গভীরভাবে জানেন না, তারা না বুঝেই আন্দাজে দাবি করেন যে, এই ১০০টি সহিফা হয়তো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন চীন, ভারত, ইউরোপ বা আমেরিকা) বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর কাছে পাঠানো হয়েছিল। আর সেই সহিফাগুলো পড়েই নাকি প্রাচীন মানুষেরা জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখেছিল বা সভ্য হতে পেরেছিল। মূলত, তারা এটা ভাবতেই পারে না যে মানুষ কোনো তথাকথিত ঐশ্বরিক গ্রন্থ ছাড়াই স্রেফ নিজের মেধা ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে, প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনাকে অবলোকন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সভ্যতা গড়ে তুলতে পারে। মানুষের এই হাজার বছরের বিবর্তন ও মেধার কৃতিত্বকেও তারা জোর করে ধর্মীয় রূপকথার পকেটে পুরে দিতে চায়।
অথচ, তাদের এই দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া প্রমাণিত হয় ইসলামের নিজস্ব বর্ণনার দ্বারাই। ইসলামের ঐতিহ্যগত বিবরণী (যেমন ইবনে হিব্বানের হাদিস) অনুযায়ী, এই ১০০টি সহিফা কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়ানো-ছিটানো কোনো নবীর ওপর নাজিল হয়নি। বরং ঘুরেফিরে মাত্র চারজন নির্দিষ্ট নবীর ওপরই এগুলো ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল—শীষ (আ.)-এর ওপর ৫০টি, ইদ্রিস (আ.)-এর ওপর ৩০টি, ইব্রাহিম (আ.)-এর ওপর ১০টি এবং মুসা (আ.)-এর ওপর ১০টি। আর আমরা সবাই জানি, এই চারজন নবীর প্রত্যেকেই ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য বা মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের। সুতরাং, ইসলামের নিজস্ব দলিলই প্রমাণ করে যে এই কথিত সহিফাগুলোর সাথে চীন, ভারতবর্ষ, ইউরোপ বা আমেরিকার মতো প্রাচীন সভ্যতার দূর-দূরান্তের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ধারণা, যা বৈশ্বিক হেদায়েতের দাবিকে যৌক্তিকভাবেই নাকচ করে দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে প্রাচীন চীনের সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা (ভারতবর্ষ), মায়া বা অ্যাজটেক সভ্যতা (আমেরিকা) কিংবা প্রাচীন ইউরোপের গ্রিক ও রোমান সভ্যতা—এই বিশাল অঞ্চলগুলোতে কি কোনো সহিফা এসেছিল? যদি এসে থাকে, তবে সেসব অঞ্চলের প্রাচীন লিপিতে, দেয়ালে বা পুথিতে তার কোনো প্রমাণ নেই কেন? মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন এবং নৈতিকতার যে বিকাশ আমরা প্রাচীন চীন, ভারত বা গ্রিসে দেখি (যেমন কনফুসিয়াস, বুদ্ধ বা সক্রেটিসের দর্শন), সেগুলোতে এই কথিত ১০০ সহিফার কোনো প্রভাব বা অবদান খুঁজে পাওয়া যায় না। স্রষ্টা যদি পুরো পৃথিবীর অধিপতি হন, তবে তার প্রেরিত জ্ঞান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি ক্ষুদ্র ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বাকি পৃথিবী সেই জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকবে—এই ধারণা ভৌগোলিক পক্ষপাতিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: [এখানে অনেক মুসলিম দাবি করতে পারেন যে, ১০০ সহিফার এই ভাগাভাগির হাদিসটি তো ‘জঈফ’ বা দুর্বল। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত, ইসলামের ইতিহাস ও নবীদের জীবনীর (সীরাত) কিতাবগুলোতে এই জঈফ বা ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই এই পুরো তত্ত্বটি যুগের পর যুগ ধরে তারা নিজেরা প্রচার করে আসছে। সুতরাং, যদি তারা এই বর্ণনাকে জঈফ বলে বাতিল করতে চায়, তবে ১০০টি সহিফার পুরো দাবিটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিত্তিহীন ও হাওয়া থেকে পাওয়া গল্পে পরিণত হয়; আর যদি তারা ইতিহাস হিসেবে একে সত্য বলে ধরে নেয়, তবে তা সরাসরি তাদের ভৌগোলিক দাবির অসারতাই প্রমাণ করে—উভয় সংকটেই জয় কিন্তু যুক্তিরই হচ্ছে।]
উপসংহার
১০০টি সহিফার এই দাবিটি মূলত কোনো বাস্তব ঐতিহাসিক বা যৌক্তিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। স্বয়ং কুরআনে এগুলোর নামের অনুপস্থিতি, পৃথিবীর প্রথম সহিফা থেকে শুরু করে বাকি কিতাবগুলোর কোনোটিরই একটি পৃষ্ঠাও অক্ষত না থাকা এবং বৈশ্বিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে এগুলোর কোনো চিহ্ন না থাকা এটাই প্রমাণ করে যে, এই দাবিটি কেবলই একটি ধর্মীয় মিথ বা রূপকথা, যার পেছনে কোনো বস্তুনিষ্ঠ, যৌক্তিক বা অকাট্য প্রমাণ নেই।
প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র:
১. ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক উৎস ও দুর্বলতা:
১০০টি সহিফার এই সুনির্দিষ্ট সংখ্যার বিবরণটি মূলত পাওয়া যায় ইবনে হিব্বান এবং আবু জর আল-গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে। তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী, ইমাম ইবনে জাওজী সহ বহু বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও হাদিস বিজ্ঞানী এই হাদিসটিকে অত্যন্ত ‘যয়ীফ’ (দুর্বল) বা ‘মাওজু’ (মনগড়া/বানোয়াট) বলে চিহ্নিত করেছেন। (দেখুন: ইবনে জাওজী, কিতাবুল মাওজুয়াত)। সুতরাং, খোদ ইসলামী শাস্ত্রের নিয়মেই এই ১০০ সহিফার দাবিটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রমাণিত নয়।
২. প্রাচীন পুথির স্থায়িত্ব (Manuscript Evidence): প্রাচীনতম টিকে থাকা গ্রন্থ বা লিপি যেমন—Epic of Gilgamesh (খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ অব্দ), মিশরের Papyrus of Ani বা মৃতদের বই (খ্রিস্টপূর্ব ১২৫০ অব্দ)। এগুলো মানুষের তৈরি হয়েও যদি টিকে থাকতে পারে, তবে কথিত ঐশ্বরিক সহিফাগুলোর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ না থাকা প্রমাণ করে এগুলোর বাস্তব কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
৩. ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র: প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে রচিত উইল ডুরান্টের বিখ্যাত গ্রন্থ The Story of Civilization (Our Oriental Heritage)। এই গ্রন্থে চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন সভ্যতার বিশদ বিবরণ রয়েছে, যা দেখায় যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে হিব্রু বা সেমিটিক ধর্মীয় ধারণার কোনো অস্তিত্ব বা প্রভাব প্রাচীন বিশ্বের প্রধান প্রধান সভ্যতায় ছিল না।





