যুক্তি দেওয়া কি শয়তানের কাজ? নাকি দাবিটি প্রতারকদের তৈরি এক অন্ধ জাঁতাকল?

আমাদের সমাজে একটি কথা খুব চতুরতার সাথে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে—“বেশি যুক্তি দেওয়া ভালো না, শয়তানের যুক্তির কোনো অভাব নেই।” যখনই কেউ কোনো প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস, কুসংস্কার বা প্রচলিত নিয়ম নিয়ে একটু গভীরভাবে প্রশ্ন তোলে, তখনই তার মুখে এই বুলি ছুঁড়ে দিয়ে আলোচনা থামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বুঝতে পারবেন, এই সরল বাক্যটির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক চালবাজি।

​আজ আমরা একটু খতিয়ে দেখব—যুক্তি দেওয়া বা ‘বেশি যুক্তি’ খোঁজা কি আসলেও কোনো নেতিবাচক বিষয়, নাকি এটি মানুষকে অন্ধ বানিয়ে রাখার এক প্রাচীন হাতিয়ার?

​প্রতারকদের তৈরি এক মোক্ষম হাতিয়ার

​ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের দিকে তাকালে একটি সত্য খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেকোনো যুগে যখনই কোনো কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা তথাকথিত গুরুরা সাধারণ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে শাসন ও শোষণ করতে চেয়েছে, তখনই তারা মানুষের প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে ‘পাপ’ বা ‘শয়তানি’ বলে ব্র্যান্ডিং করেছে।

​কারণটা খুব সহজ—মানুষ যখনই বুদ্ধি আর যুক্তি খাটাতে শুরু করবে, তখন আর তাদের সাথে বিশ্বাসের নামে বাটপারি বা প্রতারণা করা সম্ভব হবে না। অলৌকিকতার ভয় দেখিয়ে বা অন্ধ বিশ্বাসের আফিম খাইয়ে মানুষকে দাস বানিয়ে রাখার একমাত্র শর্ত হলো, তাদের মগজের চিন্তাভাবনা করার দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া। আর সেই দরজা বন্ধ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, যুক্তিকে ‘শয়তানের অস্ত্র’ হিসেবে ঘোষণা করা।

​‘বেশি যুক্তি’র ভয় কেন?

​অনেকে বলেন, “অল্প যুক্তি ঠিক আছে, কিন্তু বেশি যুক্তি দেওয়া ভালো না।” এই ‘বেশি যুক্তি’র ধারণাটি আসলে কী?

​আসলে যখন কোনো সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রচলিত বিশ্বাসের দেয়াল নড়বড়ে হয়ে যায়, তখনই প্রতিপক্ষ সেটাকে ‘বেশি যুক্তি’ বা ‘কুতর্ক’ বলে দেগে দেয়। সত্য যদি আসলেও খাঁটি, অবিচল এবং পরম কিছু হয়ে থাকে, তবে তা মানুষের হাজারো যুক্তি বা প্রশ্নের সামনে ভেঙে পড়বে কেন? একটি কাঁচের ঘর সামান্য আঘাতেই ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু একটা পাথরের পাহাড় তো ঝড়ের সামনেও অটল থাকে। তাহলে বিশ্বাসের ভিত যদি সত্যেরই হয়, তবে তা মানুষের ‘বেশি যুক্তি’কে এত ভয় পায় কেন?

​আসলে ভয়টা শয়তানকে নিয়ে নয়, আসল ভয় হলো মানুষের জেগে ওঠা বুদ্ধি আর বিবেককে নিয়ে। কারণ মানুষ গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করতে শিখলে, বিশ্বাসের নামে চালানো অনেক বড় বড় প্রতারণার দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।

​যুক্তিহীন মানুষ আর পশুর মধ্যে তফাত কোথায়?

​জগতে মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করা হয়েছে তার চিন্তাশক্তি এবং বিবেক দিয়ে। যুক্তি হলো সেই চিন্তাশক্তির প্রকাশ। যদি কোনো ব্যবস্থায় যৌক্তিক প্রশ্ন তোলাকে সরাসরি শয়তানের কাজ বলে বাতিল করে দেওয়া হয়, তার মানে দাঁড়ায় অন্ধভাবে সবকিছু গিলে নেওয়াই একমাত্র পুণ্য।

​কিন্তু অন্ধ অনুকরণ কখনো মানুষের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। যদি যুক্তি দেওয়া আসলেও শয়তানের কাজ হতো, তবে পরম সত্তা মানুষকে এই বিশাল উন্নত মস্তিষ্ক আর বিচারবুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাতেন না। যুক্তিকে ভয় পাওয়া মানে আসলে নিজের অজ্ঞতা এবং দুর্বলতাকেই আড়াল করার চেষ্টা করা।

​শেষকথা

​”শয়তানের যুক্তির অভাব নেই”—এই বুলিটি আসলে যুক্তি খণ্ডন করার কোনো উত্তর নয়, বরং যুক্তি থেকে পালিয়ে যাওয়ার একটি কাপুরুষোচিত কৌশল। যখন কেউ কোনো যৌক্তিক প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না, তখনই সে শয়তানের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজের পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করে।

​তাই পরের বার যখন কেউ আপনাকে বলবে যে আপনি বেশি যুক্তি দিচ্ছেন বা শয়তানের মতো কথা বলছেন, তখন বুঝে নেবেন আপনি ঠিক পথেই আছেন। কারণ শয়তানকে ট্যাগ দেওয়াটা তাদের শেষ আশ্রয়। যুক্তিকে সবসময় যুক্তি দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়, গালি বা ট্যাগ দিয়ে নয়। মানুষের বুদ্ধি আর যুক্তি কোনো অপশক্তি নয়, বরং এটিই অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে বড় আলো।

Related Posts

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মানুষ সাধারণত তার নিজের রূপ, অনুভূতি, কল্পনা এবং সীমাবদ্ধতা দিয়েই সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে চায়। এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism) বা মানব রূপারোপবাদ। সহজ ভাষায়, মানবীয় আবেগ, আকৃতি বা চরিত্রকে কোনো অ-মানবীয় বস্তু বা পরম সত্তার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াই হলো অ্যানথ্রোপোমরফিজম। কার্টুনে পশুপাখির কথা বলা যেমন অ্যানথ্রোপোমরফিজম, ঠিক তেমনি ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব ও ঈশ্বর ভাবনায় মানবীয় গুণাবলী আরোপ করা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।…

Read more

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

যখনই কেউ প্রশ্ন করে, জন্মগতভাবে একটা শিশুকে প্রতিবন্ধী বানিয়ে বা ভয়ানক রোগ দিয়ে আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন? অবুঝ শিশুদের কষ্ট দিয়ে তিনি কিসের পরীক্ষা নেন? এগুলো কি আসলে দয়ার নমুনা নাকি নির্দয়তার নমুনা? আল্লাহ কি আসলেই পরম দয়ালু? নিজের বিবেককে একবার প্রশ্ন করুন তো! ধরুন, আপনি নিজে যদি আল্লাহ হতেন, তাহলে কি কখনো পরীক্ষার অজুহাতে এরকম অমানবিক কাজ করতে পারতেন?

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন