ইসলামি ধর্মতত্ত্বে দাবি করা হয়, নবী নিজ থেকে কিছু বলতেন না, বরং আল্লাহ তাঁকে যা বলতেন তাই তিনি বলতেন। কিন্তু ইসলামের নিজস্ব নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থগুলোর পাতা উল্টালে ইবনে সাইয়্যাদের ঘটনা এবং তার প্রেক্ষাপট এক বিশাল কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ায়। মদিনার কিশোর ইবনে সাইয়্যাদের সাথে নবীর আচরণ এবং তাঁর একটি ভুল ধারণার কারণে সেই ছেলেটির জীবনের নির্মম ট্র্যাজেডি আজ ওহীর সত্যতা এবং নবীর দূরদর্শিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাছাড়া, ইসলাম অনুযায়ী ওহী ছিল সম্পূর্ণ অভ্রান্ত এবং নিখুঁত জ্ঞানসম্পন্ন। কিন্তু এমন বেশকিছু ঘটনায় দেখা যায় নবী মুহাম্মদ অনেক সময় সাধারণ মানুষের মতোই অন্ধ অনুমান, কুসংস্কার এবং চরম অমূলক ভীতি বা আতঙ্কে ভুগতেন।
১. খেজুর বাগানে নবীর লুকোচুরি ও আজব কর্মকাণ্ড
মদিনায় ইবনে সাইয়্যাদ নামে আনুমানিক ১৫-১৬ বছরের এক ইহুদি কিশোর ছিল, যে কিছুটা অন্যরকম বা আধ্যাত্মিক স্বভাবের ছিল। নবী মুহাম্মদ এবং তাঁর সাহাবীরা মনে মনে চরম আতঙ্কিত ছিলেন যে, এই ছেলেই হয়তো পৃথিবীর শেষ সময়ের সবচেয়ে বড় খলনায়ক বা “মহাপ্রতারক দাজ্জাল”।
একজন নবী ও আরবের একচ্ছত্র অধিপতি হয়েও তিনি এই কিশোরটিকে এতটাই ভয় পেতেন যে, তার আসল পরিচয় জানার জন্য সাধারণ মানুষের মতো চোরের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে খেজুর বাগানের ঝোপের পেছনে দাঁড়িয়ে তার কথা শুনতেন।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী, একবার নবী মুহাম্মদ সাহাবী উবাই ইবনে কাবকে সাথে নিয়ে সেই কিশোরের খেজুর বাগানে যান। ইবনে সাইয়্যাড তখন একটি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে গুনগুন করছিল। নবী চোরের মতো পা টিপে টিপে খেজুর গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন, যাতে ইবনে সাইয়্যাড তাঁকে দেখতে না পায় এবং তিনি তার গোপন কথা শুনতে পারেন। কিন্তু ছেলেটির মা নবীকে দেখে ফেলে চিৎকার করে ওঠে, “হে সাফ! (ইবনে সাইয়্যাদের ডাকনাম), এই যে মুহাম্মদ!” এতেই ইবনে সাইয়্যাড সতর্ক হয়ে যায় এবং নবীর সেই গোপন গোয়েন্দাগিরি ব্যর্থ হয়।
যিনি দাবি করতেন তাঁর কাছে মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষ থেকে ওহী আসে, তিনি কেন একটি ১৬ বছরের বাচ্চার মনের কথা জানতে খেজুর গাছের আড়ালে চোরের মতো লুকোচুরি খেলবেন? সর্বজ্ঞানী ওহী কেন তাঁকে সরাসরি বলে দিল না যে এই ছেলের আসল পরিচয় কী?
২. ওমরের তরবারি ও নবীর চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব
নবী মুহাম্মদ নিজেই নিশ্চিত ছিলেন না যে ছেলেটি দাজ্জাল কি না। একবার তিনি ইবনে সাইয়্যাদকে সরাসরি পরীক্ষা করতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আমি আল্লাহর রসূল?” ছেলেটি উল্টো রসূলকে দেখে বলল, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি উম্মীদের (নিরক্ষরদের) রসূল।” এরপর নবী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি মনে মনে একটা কথা লুকিয়ে রেখেছি, বলো তো সেটা কী?” (নবী মনে মনে সূরা দুখানের কথা ভাবছিলেন)। ইবনে সাইয়্যাদ সম্পূর্ণটা বলতে না পেরে ভাঙা ভাঙা শব্দে বলল, “দুখ…”। এতে নবী রেগে গিয়ে বললেন, “থামো! তুমি তোমার সীমার বাইরে যেতে পারবে না।”
এই ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখে পাশে থাকা উগ্র মেজাজের সাহাবী ওমর ইবনে খাত্তাব সাথে সাথে নিজের তরবারি বের করে বললেন, “হে আল্লাহর রসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই খবিসের মাথা কেটে দুই টুকরো করে দিই!”
অথচ একজন নবী হিসেবে এখানে ওমরের এই হিংস্রতাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য ওহীর অকাট্য প্রমাণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নবীর উত্তরটি ছিল চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভরা। নবী ওমরকে বললেন:
“ওমর! ও যদি সত্যিই দাজ্জাল হয়, তবে তাকে মারার ক্ষমতা তোমার নেই (কারণ দাজ্জালকে মারবেন ঈসা আ.)। আর ও যদি দাজ্জাল না হয়, তবে একে হত্যা করে তোমার কোনো লাভ নেই।”
নবীর এই উত্তরটি পরিষ্কার প্রমাণ করে যে, তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। তাঁর কাছে কোনো ওহী ছিল না, কোনো অলৌকিক জ্ঞান ছিল না। তিনি স্রেফ আন্দাজে এবং অনুমানের ওপর ভিত্তি করে একটি কিশোরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খলনায়ক ভেবে আতঙ্কে দিন পার করছিলেন।
৩. ভুল অনুমানের নির্মম খেসারত ও আজীবন ‘বুলিং’-এর শিকার
পরবর্তীতে ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, ইবনে সাইয়্যাদকে নিয়ে নবীর এই “দাজ্জাল সন্দেহ” সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কারণ, বড় হয়ে ইবনে সাইয়্যাদ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, মুসলিম হন, বিয়ে করেন, তাঁর সন্তান হয় এবং তিনি মক্কা-মদিনায় হজ্জ-ওমরাহ পালন করেন।
কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, ইসলামের সর্বোচ্চ নেতার দেওয়া ওই অন্ধ অপবাদ এবং সন্দেহের কারণে মদিনার সাধারণ মুসলিম সমাজ তাকে আর কোনোদিন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। ইসলাম গ্রহণ করার পরেও মুসলিম সমাজ তাকে অবিরত “দাজ্জাল” বলে ট্রল, কটূক্তি এবং চরম মানসিক নির্যাতন (Bullying) করতে থাকে।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় দেখা যায়, ইবনে সাইয়্যাড একবার মক্কার পথে সাহাবী আবু সাঈদ খুদরীর সাথে যাচ্ছিলেন। মানুষের অবিরত ট্রল ও বুলিংয়ে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ইবনে সাইয়্যাড কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি আবু সাঈদকে বলেন:
“লোকেরা যা বলে তাতে আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরতে ইচ্ছে করে। হে আবু সাঈদ! রসূলুল্লাহর হাদিস কি তোমাদের কাছে গোপন আছে? রসূল কি বলেননি যে দাজ্জাল কাফের হবে? অথচ আমি তো মুসলিম! রসূল কি বলেননি দাজ্জালের কোনো সন্তান হবে না? অথচ আমার সন্তান মদিনায় রয়েছে! রসূল কি বলেননি দাজ্জাল মক্কা ও মদিনায় ঢুকতে পারবে না? অথচ আমি মদিনা থেকে মক্কায় হজ্জ করতে যাচ্ছি!”
একটি নিষ্পাপ ছেলে ইসলাম গ্রহণ করার পরেও আজীবন ধার্মিক মুসলিমদের দ্বারা সাইকোলজিক্যাল টর্চারের শিকার হলো, যার কারণে তাকে মানুষের সামনে কান্নাকাটি করতে হতো। ওহী যদি এতই সত্য ও ত্রিকালজ্ঞ সত্তার কাছ থেকে আসত, তবে একটি মানুষের জীবন এভাবে কুসংস্কারের বলি হতো না।
ইবনে সাইয়্যাদের ঘটনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
ইবনে সাইয়্যাদের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা নবীর ভবিষ্যদ্বাণী বা ওহীর নিখুঁত হওয়ার যে দাবি করে, তা স্রেফ একটি অন্ধ ভক্তি মাত্র। মদিনার একজন সাধারণ কিশোরকে নিয়ে সর্বজ্ঞানী ওহীর দাবিদার একজন নবী মাসের পর মাস কুসংস্কারে ও আতঙ্কে ভুগলেন, ঝোপের আড়ালে লুকোচুরি করলেন, অথচ ওহী তাকে একটাবারের জন্যও স্পষ্ট করে বলল না যে—এই ছেলেটি দাজ্জাল নয়, বরং সে ভবিষ্যতে মুসলিম হবে! নবীর এই অপ্রমাণিত অন্ধ অনুমান এবং ওহীর এই স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করে যে, ইসলামের ঐশ্বরিক জ্ঞান বা ওহীর দাবিটি ছিল সম্পূর্ণ জাগতিক এবং মানবীয় চিন্তাপ্রসূত।
ইবনে সাইয়্যাদ কে ছিলেন?
ইবনে সাইয়্যাদ বা সাফ ইবনে সাইয়্যাদ ছিলেন মদিনার এক ইহুদি পরিবারের কিশোর। নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবীদের কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন যে তিনি শেষ জামানার খলনায়ক ‘দাজ্জাল’ হতে পারেন। তবে পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইবনে সাইয়্যাদ কি সত্যিই দাজ্জাল ছিল?
না, ইবনে সাইয়্যাদ দাজ্জাল ছিলেন না। হাদিস অনুযায়ী দাজ্জালের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ (যেমন: নিঃসন্তান হওয়া, কাফের হওয়া, মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করতে না পারা) রয়েছে, যার কোনোটিই ইবনে সাইয়্যাদের সাথে মেলেনি। তিনি পরবর্তীতে মুসলিম হন এবং মক্কা-মদিনায় হজ ও ওমরাহ পালন করেন।
ইবনে সাইয়্যাদের ঘটনা থেকে কোন হাদিস পাওয়া যায়?
ইবনে সাইয়্যাদের ঘটনা সম্পর্কিত বিবরণ সহীহ বুখারী (হাদিস ১৩৫৪, ৩০৫৫) এবং সহীহ মুসলিম (হাদিস ৭২০৩, ৭২৮১-৭২৮৪)-সহ একাধিক প্রধান হাদিস গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণিত রয়েছে।
নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র (প্রকাশনীসহ):
১.খেজুর বাগানে নবীর লুকোচুরি ও ওমরের হত্যা করার অনুমতি চাওয়া: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ১৩৫৪, ৩০৫৫, ৬১৭৫; সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নং ৭২০৩, ৭২০৪।
২. ইবনে সাইয়্যাদের ইসলাম গ্রহণ, কান্না এবং মুসলিমদের দ্বারা বুলিং-এর শিকার হওয়া:** সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৭২৮১, ৭২৮২, ৭২৮৩ ও ৭২৮৪; সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), ভলিউম-৭, হাদিস নং ৭২০৫ ও ৭২০৬।
৩. ইবনে সাইয়্যাদের সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের বিবাদ: সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৭২৮৫; সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নং ৭২০৭।
কুরআনিক রেফারেন্স:
সূরা আদ-দুখান (৪৪:১০) — “অতএব আপনি অপেক্ষা করুন সেই দিনের, যখন আকাশ স্পষ্ট ধোঁয়ায় ছেয়ে যাবে।”
(নবী মুহাম্মদ এই নির্দিষ্ট আয়াতটিই মনে মনে গোপন রেখে ইবনে সাঈয়্যাদকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন, যা থেকে ইবনে সাঈয়্যাদ কেবল ‘আদ-দুখ’ শব্দটি ধরতে পেরেছিল।)





