বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভিত্তিহীন অভিযোগ আছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি একটি হলো, তিনি নাকি মুসলিমবিদ্বেষী ছিলেন। এই অভিযোগটি এতবার বলা হয়েছে যে অনেক মানুষ এটাকে সত্য বলে ধরে নেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, প্রবন্ধ বা চিঠিপত্রে কি সত্যিই মুসলিমদের প্রতি কোনো ঘৃণা বা বিদ্বেষের প্রমাণ পাওয়া যায়? রবীন্দ্রনাথ কি আসলেই মুসলিমবিদ্বেষী?
অথচ, বাস্তবে রবীন্দ্রনাথকে পড়লে বরং ভিন্ন একটি চিত্র দেখা যায়।
রবীন্দ্রনাথ এমন একজন লেখক ছিলেন যিনি মানুষকে আগে মানুষ হিসেবে দেখতেন। ধর্ম, জাতি বা বর্ণ তাঁর কাছে মানুষের প্রধান পরিচয় ছিল না। তাঁর সাহিত্যজুড়ে বারবার যে বিষয়টি ফিরে আসে তা হলো মানবতা, সহমর্মিতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ।
এই প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত গল্প “কাবুলিওয়ালা”-র কথা না বললেই নয়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন আফগান মুসলমান। রবীন্দ্রনাথ চাইলে তাকে একজন অপরিচিত বিদেশি হিসেবেই দেখাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি দেখিয়েছেন একজন বাবার হৃদয়, তার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, তার একাকীত্ব এবং তার মানবিক অনুভূতি। গল্পটি পড়লে পাঠকের মনে কাবুলিওয়ালার প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়। একজন মুসলিম চরিত্রকে এত গভীর মানবিকতার সঙ্গে উপস্থাপন করা একজন মুসলিমবিদ্বেষী লেখকের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন।
শুধু “কাবুলিওয়ালা” নয়, রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক চিন্তাধারাও সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে ছিল। তিনি বহুবার লিখেছেন যে ধর্মের নামে বিভেদ, ঘৃণা এবং সংকীর্ণতা সমাজকে দুর্বল করে। তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদা ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড়।
অনেকেই ভুলে যান যে রবীন্দ্রনাথের জমিদারির একটি বড় অংশ ছিল পূর্ববঙ্গে, বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সেখানে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল মুসলিম কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং সাধারণ গ্রামীণ জনগণের সঙ্গে। তাঁর চিঠিপত্র, বিশেষ করে ছিন্নপত্র পড়লে দেখা যায় তিনি গ্রামীণ মানুষের জীবন নিয়ে কত গভীরভাবে ভাবতেন। সেই মানুষদের বড় একটি অংশই ছিলো মুসলিম জনগোষ্ঠী।
এটাও সত্য যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়ের সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। কখনও হিন্দু সমাজের কুসংস্কার নিয়ে লিখেছেন, কখনও মুসলিম সমাজের কিছু বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু কোনো সমাজের সমালোচনা করা আর সেই সমাজ বা ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করা এক বিষয় নয়। একজন চিন্তাবিদ সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমালোচনা করতেই পারেন। তিনি মূলত মুসলিমদের বিরোধিতা নয়, বরং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা করেছিলেন, যেমনটা কবি নজরুলও করেছিলেন। তবে নজরুল যতটা ইসলামী মৌলবাদের সমালোচনা করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ধারে কাছেও নেই। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন অমানবিক এবং গোঁড়ামির এবং প্রথার সমালোচনাই বেশি করেছেন।
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। তাঁর রাজনৈতিক মতামত বা দর্শনের সঙ্গে দ্বিমতও করা যেতে পারে। কিন্তু তাঁকে মুসলিমবিদ্বেষী বলার আগে তাঁর লেখা পড়া পড়া অবশ্যই জরুরী। কারণ তাঁর সাহিত্য পড়লে ঘৃণার চেয়ে মানবতার উপস্থিতিই অনেক বেশি চোখে পড়ে।
আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ এমন একজন লেখক, যিনি মানুষকে বিভক্ত করার চেয়ে মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সাহিত্য ধর্মের দেয়াল নয়, মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়ার কথাই বেশি বলা হয়েছে। ধর্মের চেয়ে মানবতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি এবং হিন্দু-মুসলিম যেন ধর্মীয় গোঁড়ামি উপেক্ষা করে মানবতার খাতিরে একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে সেটাই চেয়েছিলেন তিনি।
আসলে যারা তাঁকে মুসলিম বিদ্বেষী বলে তাদের উদ্দেশ্যটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এই কথাটি বলে মানুষকে রবীন্দ্রনাথ এবং ভারতবিদ্বেষী করতে চায়। আর ভারত বিদ্বেষ এবং পাকিস্তান প্রেমই তাদের রাজনীতির প্রধান পুঁজি। তাই তারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য একজন মহান সাহিত্যিককে যেকোনো অপবাদই দিয়ে থাকেন।






