যখনই কেউ প্রশ্ন করে, জন্মগতভাবে একটা শিশুকে প্রতিবন্ধী বানিয়ে বা ভয়ানক রোগ দিয়ে আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন? অবুঝ শিশুদের কষ্ট দিয়ে তিনি কিসের পরীক্ষা নেন? এগুলো কি আসলে দয়ার নমুনা নাকি নির্দয়তার নমুনা? আল্লাহ কি আসলেই পরম দয়ালু? নিজের বিবেককে একবার প্রশ্ন করুন তো! ধরুন, আপনি নিজে যদি আল্লাহ হতেন, তাহলে কি কখনো পরীক্ষার অজুহাতে এরকম অমানবিক কাজ করতে পারতেন?
এক্ষেত্রে মুমিনরা বেশ কিছু কুযুক্তি দেয় এবং আমি তাদের সবগুলো দাবি বা গোঁজামিল খন্ডন করলাম। আপনারা দয়া করে সম্পূর্ণটা পড়বেন।
১. বাবা-মা বা সমাজকে পরীক্ষার যুক্তি
মুমিনদের দাবি: প্রতিবন্ধী শিশুটি আসলে নিজে কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি নয়। তাকে মাধ্যম বানিয়ে তার বাবা-মা, পরিবার এবং সমাজকে পরীক্ষা করা হচ্ছে যে, তারা কতটা ধৈর্য ধরে এবং কতটুকু মানবিক আচরণ করে।
যৌক্তিক খন্ডন: এই যুক্তিটি চরম নৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। একজনকে পরীক্ষা করার জন্য অন্য একজন নিরপরাধ, নিষ্পাপ প্রাণকে আজীবন শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত বা দয়ালু শাসকের কাজ হতে পারে না।
ধরে নেওয়া যাক, একজন শিক্ষক তার ক্লাসের কোনো এক ছাত্রের ধৈর্য পরীক্ষা করতে চান। সেই পরীক্ষা নেওয়ার জন্য শিক্ষক যদি ক্লাসের অন্য একটি নিরীহ বাচ্চাকে চাবুক দিয়ে মারতে থাকেন এবং প্রথম ছাত্রটিকে বলেন, “দেখি তুমি কতটা ধৈর্য ধরতে পারো”—তবে সেই শিক্ষককে কি কেউ ‘দয়ালু’ বা ‘ন্যায়পরায়ণ’ বলবে? নাকি তাকে নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী বলা হবে?
সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে পরীক্ষা নেওয়ার মতো উপায়ের কোনো অভাব নেই। তিনি চাইলে বহু সভ্য উপায়ে মানুষের ধৈর্য পরীক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু একটি জীবন্ত, অনুভূতিসম্পন্ন শিশুকে আজীবন পঙ্গুত্ব বা কষ্টের মাঝে রেখে অন্যদের পরীক্ষা করাটা “উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য নির্মম উপায় অবলম্বন” (The end justifies the means) করার শামিল, যা পরম দয়ালু ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
২. পরকালের ক্ষতিপূরণের যুক্তি
মুমিনদের দাবি: দুনিয়ার কষ্ট সাময়িক। এই শিশুটি পরকালে সরাসরি জান্নাতে যাবে এবং সেখানে তাকে এত সুখ দেওয়া হবে যে সে দুনিয়ার সব কষ্ট ভুলে যাবে। সুতরাং, পরম দয়ালু ঈশ্বর পরকালে এর শতগুণ ক্ষতিপূরণ করে দেবেন।
যৌক্তিক খন্ডন: এই যুক্তিটি মূলত একটি “ভবিষ্যতের আশার” ওপর ভর করে বর্তমানের নির্মমতাকে আড়াল করার চেষ্টা।
প্রথমত, কোনো একজন নিরপরাধকে প্রথমে তীব্র কষ্ট দিয়ে, পরে তাকে ক্ষতিপূরণ বা পুরস্কার দেওয়াটা কোনো ‘পরম দয়ালু’ বা ‘পরম ক্ষমতাবান’ সত্তার লক্ষণ হতে পারে না। ধরুন, কেউ একজন একটি শিশুকে বিনা অপরাধে মারধর করল এবং পরে তাকে একটি দামি খেলনা বা রাজপ্রাসাদ উপহার দিয়ে বলল, “আমি তো ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিয়েছি, এখন সব ঠিক।” মানুষের তৈরি আদালতেও একে অপরাধ হিসেবে দেখা হবে।
দ্বিতীয়ত, একজন পরম দয়ালু ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যদি শিশুদের অনন্তকালের জন্য জান্নাতই দিতে চান, তবে তিনি তাদের সরাসরি জান্নাতেই সৃষ্টি করতে পারতেন; তার জন্য দুনিয়াতে এনে তাদের ক্যানসারের মতো যন্ত্রণাদায়ক রোগে ভুগিয়ে, ক্ষুধায় তড়পিয়ে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পিষে মারার কোনো নৈতিক বা যৌক্তিক প্রয়োজন ছিল না। এই যুক্তিটি আসলে ঈশ্বরের “পরম দয়াশীলতা” প্রমাণ করতে গিয়ে উল্টো তাঁর “সর্বশক্তিমান” রূপকে ক্ষুণ্ন করে— কারণ এটি দেখায় যে, ঈশ্বর যেন শিশুদের জান্নাত দেওয়ার জন্য দুনিয়ার এই নির্মম ও পৈশাচিক কষ্ট দিতে বাধ্য ছিলেন, যা কোনো পরম করুণাময় ও সর্বক্ষমতাবান সত্তার আচরণের সাথে সাংঘর্ষিক।
এখন কেউ ডাক্তারের তুলনা দিতে পারেন, তবে এই তুলনাটি ভুল। কারণ, একজন ডাক্তারের পক্ষে ইনজেকশন বা শিশুটিকে কষ্ট না দিয়ে সুস্থ করা সম্ভব না বলেই ডাক্তার কষ্ট দিতে বাধ্য। কিন্তু আল্লাহর কাছে তো অসম্ভব বলে কিছু নেই বা আল্লাহ তো শিশুদের এমন প্রতিবন্ধী করে তৈরি করতে বা কষ্ট দিতে বাধ্য নন। ডাক্তারের পক্ষে যদি কোন শিশুকে ইনজেকশন বা কষ্ট না দিয়েই সুস্থ করা সম্ভব হতো, তবে ডাক্তারও কখনো এইটুকু কষ্টও দিতেন না। তাই ডাক্তারের সাথে আল্লাহর তুলনাটি একটি ভুল উপমার কুযুক্তি।
৩. “স্রষ্টার অসীম জ্ঞান বনাম মানুষের সীমিত জ্ঞান” এর যুক্তি
মুমিনদের দাবি: মানুষের বুদ্ধি সীমিত। আমরা আপাতদৃষ্টিতে যা খারাপ বা অমানবিক দেখছি, তার পেছনে স্রষ্টার কোনো গভীর রহস্য বা কল্যাণ লুকিয়ে আছে যা মানুষ বুঝতে পারে না। (যেমন খিজির ও মূসা আ. এর ঘটনা)।
যৌক্তিক খন্ডন: এটি যুক্তিবিদ্যার ভাষায় একটি ‘কুযুক্তি’ বা ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি করার চেষ্টা। যখনই কোনো বিষয়ের যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, তখনই “স্রষ্টার রহস্য মানুষের বোঝার সাধ্য নেই” বলে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
যদি স্রষ্টার কাজ আমাদের বোঝার বাইরেই হয়, তবে স্রষ্টাকে ‘পরম দয়ালু’ বা ‘ন্যায়বিচারক’ বলার অধিকারও মানুষের থাকে না। কারণ ‘দয়া’ এবং ‘ন্যায়বিচার’ শব্দগুলোর একটি নির্দিষ্ট মানবিক সংজ্ঞা আছে। যে কাজের মধ্যে দয়া বা ন্যায়ের কোনো লক্ষণ নেই, তাকে “রহস্যময় দয়া” বলে চালিয়ে দেওয়াটা শব্দের অর্থের অপলাপ।
তাছাড়া, যদি শিশুর এই কষ্ট পাওয়ার পেছনে কোনো অদৃশ্য কল্যাণ থাকেই, তবে তো চিকিৎসা বিজ্ঞান দিয়ে সেই শিশুর কষ্ট দূর করার চেষ্টা করা ঈশ্বরের সেই ‘কল্যাণময় রহস্যের’ বিরোধিতা করার শামিল। এই যুক্তিটি আসলে মানুষকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখার এবং একটি স্পষ্ট অসঙ্গতিকে ঢাকবার একটি কৌশল মাত্র।
৪. মানবিক গুণের বিকাশ ও বৈচিত্র্যের যুক্তি
মুমিনদের দাবি: পৃথিবীতে যদি সবাই সুস্থ আর নিখুঁত হতো, তবে মানুষের মধ্যে দয়া, পরোপকার, সহানুভূতি বা ত্যাগের মতো গুণের বিকাশ ঘটত না। প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজে ভালোবাসার আদান-প্রদান বাড়াতে সাহায্য করে।
যৌক্তিক খন্ডন: এই যুক্তিটি অত্যন্ত স্বার্থপর এবং উপযোগবাদী (Utilitarian)। এর অর্থ দাঁড়ায়—অন্য মানুষের মনে দয়া বা সহানুভূতির অনুভূতি জাগানোর জন্য একটা শিশুকে “প্রপস” বা “টুল” (উপকরণ) হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
একটা শিশুর নিজেরও তো একটি স্বাধীন জীবন, অনুভূতি এবং চাওয়া-পাওয়া আছে। অন্যের মনকে নরম করার জন্য বা সমাজকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য একটা শিশুকে কেন তার স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে বলির পাঁঠা হতে হবে? মানুষের সহানুভূতি জাগানোর জন্য প্রকৃতিতে এমনিতেও অনেক উপাদান আছে—যেমন বয়স বৃদ্ধি, সাধারণ অসুস্থতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তার জন্য একটা নিষ্পাপ শিশুকে জন্মগতভাবে আজীবন কষ্টের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখা কোনো দয়ালু স্রষ্টার মহৎ পরিকল্পনা হতে পারে না।
বিবেক ও মানবিকতার আয়নায় চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
হে মুমিন ভাই, সত্য করে বলেন তো আপনি যে প্রশ্নটি তুলেছেন—”আপনি নিজে যদি আল্লাহ হতেন তবে কি এমন করতে পারতেন?”—এটাই হলো এই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি।
মানুষের ভেতর যে বিবেক, দয়া এবং সহানুভূতির বোধ রয়েছে, ধর্ম অনুসারীদের বিশ্বাস অনুযায়ী তা খোদ ঈশ্বরেরই দেওয়া। এখন একজন সাধারণ মানুষ, যার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত, সেও যদি একটি নিষ্পাপ শিশুকে কষ্ট পেতে দেখলে বুক ফেটে কেঁদে ওঠে এবং নিজের ক্ষমতা থাকলে এখনই তাকে সুস্থ করে দিত—তবে যিনি ‘পরম দয়ালু’ এবং যার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই, তিনি কেন চোখের সামনে নিষ্পাপ শিশুদের এই কষ্ট অবলীলায় দেখে যান এবং নিজেই তা তৈরি করেন?
নিজের সৃষ্টি করা মানুষের চেয়ে স্রষ্টার দয়া ও নৈতিকতাবোধ কম হতে পারে না। তাই মুমিন ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টরা পরকাল, পরীক্ষা বা রহস্যের যত দেওয়ালই খাড়া করুক না কেন, জন্মগত প্রতিবন্ধকতা এবং নিষ্পাপ শিশুদের যন্ত্রণার বাস্তবতার সামনে “পরম দয়ালু ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের” ধারণাটি একটি বড় ধরনের যৌক্তিক ও নৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়।
মুমিনরা আরও কিছু কুযুক্তি বা গোঁজামিল দিতে পারে, সেসবের জবাবও আমার কাছে আছে। তবে সেগুলো খুবই দুর্বল ও নিম্নমানের এবং লেখাটি বড় হয়ে যাবে বলে সেগুলো আমি উল্লেখ করিনি। তবে কোন মুমিন যদি সেসব গোঁজামিল দিয়ে থাকে, তবে সেগুলোর খণ্ডনও এই লেখায় যুক্ত করবো।





