আমাদের মস্তিষ্ক খুব অদ্ভুত এক যন্ত্র। এটি সত্য খোঁজার চেয়ে নিজেকে ‘সঠিক’ প্রমাণ করতে বেশি পছন্দ করে।
ধরুন, আপনি ফুটবল খেলায় আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুট করে একটা খবর দেখলেন—ব্রাজিলের কোনো এক খেলোয়াড় মাঠে চরম অসদাচরণ করেছেন। খবরটির সত্যতা কতটুকু, কোনো বড় সংবাদমাধ্যম এটি প্রকাশ করেছে কিনা—এসব যাচাই করার আগেই আপনার মন অবচেতনভাবেই খবরটি বিশ্বাস করে নেবে। কারণ খবরটি আপনার ভেতরের বিশ্বাসকে তৃপ্ত করছে।
অথচ, একই ধরণের কোনো নেতিবাচক খবর যদি আপনার প্রিয় দল আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড়ের নামে আসে, আপনার মস্তিষ্ক সাথে সাথে ডিফেন্সিভ মোডে চলে যাবে। আপনি ভাববেন, “নিশ্চয়ই এটা এডিটেড ভিডিও,” বা “প্রতিপক্ষ দল হিংসা করে এসব ছড়াচ্ছে।”
এই যে নিজের পছন্দের বিষয়ের পক্ষে যেকোনো দুর্বল বা মিথ্যা প্রমাণও সহজে গিলে ফেলা, আর বিপক্ষে থাকা পাহাড়সম সত্যকেও ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া—এটি কোনো নির্দিষ্ট দলের বা দেশের মানুষের একক সমস্যা নয়। এটি মানব মস্তিষ্কের এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর পেছনে কাজ করে দুটি মূল বিষয়: কনফার্মেশন বায়াস (Confirmation Bias) এবং কগনিটিভ ডিজোনেন্স (Cognitive Dissonance)।
১. কনফার্মেশন বায়াস: আমাদের মনের ‘পছন্দের ফিল্টার’
আমাদের মন সব সময় তার পুরনো বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে চায়। যখন আমরা কোনো কিছুকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি (তা হতে পারে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ, কোনো ধর্ম, কোনো প্রিয় ফুটবল দল বা এমনকি নিজের পরিবারের কোনো সদস্য), তখন আমাদের মস্তিষ্ক একটি অদৃশ্য ফিল্টার বসিয়ে দেয়। এই ফিল্টারের কাজ হলো—আপনার বিশ্বাসের পক্ষে যা যা আসবে, সব লুফে নেওয়া। আর বিপক্ষে যা আসবে, তাকে আটকে দেওয়া।
- রাজনীতির মাঠে: বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াতের কট্টর সমর্থকদের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট বোঝা যায়। এক দলের সমর্থক অন্য দলের বিরুদ্ধে যেকোনো প্রমাণহীন বা আজগুবি গুজবও মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বাস করে শেয়ার দিয়ে দেয়। কিন্তু নিজের দলের ভেতরের কোনো বড় দুর্নীতি বা অপরাধের অকাট্য প্রমাণ সামনে এলেও তারা বলে, “এগুলো সব বিরোধীদের চাল!”
- পারিবারিক জীবনে: নিজের সন্তান বা ভাই কোনো অপরাধ করলে মন সহজে তা মানতে চায় না। আমরা অজুহাত খুঁজি—”আমার ছেলে তো এমন নয়, নিশ্চয়ই খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়েছে।” অথচ পাশের বাসার কেউ একই কাজ করলে আমরা এক সেকেন্ডও ভাবি না।
আমরা যখন কোনো বিষয়ে অন্ধ হয়ে যাই, তখন বিপক্ষের মানুষের যৌক্তিক কথাও আমাদের কাছে ‘অসার’ মনে হয়। আর নিজের পক্ষের কোনো বক্তা বা অ্যাপলজিস্ট যদি চরম দুর্বল, জোড়াতালি দেওয়া কোনো লজিকও (গজামিল) দেয়, আমাদের অবচেতন মন সেটাকেই পরম সত্য বলে ধরে নেয়। কারণ, সেই গজামিলটা আমাদের মনের ভেতরের বিশ্বাসকে একটা আরামদায়ক সান্ত্বনা দেয়।
২. কগনিটিভ ডিজোনেন্স: সত্যি জানার পরের ‘মানসিক যন্ত্রণা’
তাহলে মানুষ কি কখনো সত্যটার মুখোমুখি হয় না? অবশ্যই হয়। কিন্তু যখন এমন কোনো অকাট্য সত্য চোখের সামনে চলে আসে যা অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকে না, তখন মানুষের মনের ভেতরে এক তীব্র ঝড় শুরু হয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কগনিটিভ ডিজোনেন্স’ বা চিন্তার দ্বন্দ্ব।
ধরে নিন, আপনি দীর্ঘদিন ধরে একজনকে পরম ভালো মানুষ বলে জেনে এসেছেন। হঠাৎ তার এমন একটি অপরাধের ভিডিও প্রমাণ আপনার হাতে এলো যা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন আপনার মাথায় দুটি ভিন্ন তথ্য একসাথে ধাক্কা খাচ্ছে:
১. “মানুষটি খুব ভালো।” (আপনার পুরনো বিশ্বাস)
২. “সে একটি জঘন্য অপরাধ করেছে।” (নতুন অকাট্য সত্য)
এই দুটি বিপরীতমুখী চিন্তা যখন মনের ভেতর একসাথে অবস্থান করে, তখন এক ধরণের তীব্র মানসিক অস্বস্তি বা যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। মানুষ এই অস্বস্তি সহ্য করতে পারে না। তখন মনকে শান্ত করার জন্য সে আবার সেই ‘কনফার্মেশন বায়াস’-এর আশ্রয় নেয়। সে মনের ভেতরের সত্যটাকে মচকে দিয়ে একটা মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড়াচ্ছে—”ভিডিওটা সত্য, কিন্তু নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল, ও বাধ্য হয়ে এটা করেছে।”
আমরা সত্যকে মেনে নিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করার চেয়ে, নিজের মনগড়া বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে বেশি পছন্দ করি। কারণ, ভুল স্বীকার করার মধ্যে একটা মানসিক পরাজয় বোধ কাজ করে।
এজন্যই মার্ক টোয়েন বলেছিলেন,
“মানুষকে বোকা বানানো সহজ, কিন্তু তাকে এটা বুঝানো কঠিন যে বোকা বানানো হয়েছে। “
৩. ধর্মীয় ডাবল স্ট্যান্ডার্ড: অন্যের বেলায় কঠিন যুক্তি, নিজের বেলায় ভক্তি!
এই মানসিক পক্ষপাতিত্ব সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে। মানুষ অন্য ধর্মের ভুলত্রুটি বা দুর্বলতা ধরার সময় যে তীক্ষ্ণ যুক্তি আর বিজ্ঞানমনস্কতা দেখায়, নিজের ধর্মের বেলায় এসে সেই যুক্তিকে এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে দেয়। এখানে একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক।
ধরুন, হিন্দু ধর্মের কোনো পুণ্য অর্জন করতে গিয়ে বা কোনো রথযাত্রা বা কুম্ভমেলায় হুড়োহুড়িতে যদি কোনো পুণ্যার্থী মারা যান বা আহত হন, তখন অন্য ধর্মের (যেমন ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্মের) মানুষ সেটাকে খুব নেতিবাচকভাবে দেখে। তারা অবলীলায় মন্তব্য করে, “দেখো, এদের দেব-দেবীদের বাঁচানোর বা রক্ষা করার কোনো ক্ষমতাই নেই! কী অন্ধ বিশ্বাস!”
অথচ, ঠিক একই ধরণের ট্র্যাজেডি যখন নিজেদের ক্ষেত্রে ঘটে—যেমন হজে গিয়ে প্রচণ্ড গরমে বা পদদলিত হয়ে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়, কিংবা কোনো ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মীয় সমাবেশ করতে গিয়ে কেউ মারা যায়—তখন কিন্তু তারা নিজেদের সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না। তখন তাদের ব্যাখ্যা বদলে যায়। তারা বলে, “আল্লাহর কী অসীম কুদরত! তারা পবিত্র কাজ করতে গিয়ে মারা গেছেন, তারা সরাসরি শহীদি মর্যাদা পেয়ে জান্নাতি হয়ে গেছেন।”
এই দ্বিমুখী নীতি কি শুধু মৃত্যুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ? একদমই নয়।
- একজন মুসলিম খুব সহজেই অন্য ধর্মের মূর্তিপূজা বা গাছপালাকে দেবতা মনে করাকে ‘চরম অযৌক্তিক’ মনে করে হাসাহাসি করবেন। কিন্তু নিজের ধর্মের কালো পাথরে চুমু খাওয়া, শয়তানকে পাথর মারা বা নির্দিষ্ট কোনো কূপের পানিকে অলৌকিক মনে করার পেছনে তিনি বিজ্ঞানের ছোঁয়া খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠবেন।
- আবার বিপরীতভাবে, অন্য ধর্মের একজন মানুষ যখন তার নিজের গ্রন্থে থাকা কোনো অবৈজ্ঞানিক রূপকথা বা অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে পরম সত্য বলে বিশ্বাস করেন, ঠিক তখনই তিনি অন্য কোনো ধর্মের অলৌকিক ঘটনাকে “গাঁজাখুরি গল্প” বলে উড়িয়ে দেন।
সহজ কথায়, আমরা অন্যের বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণে চরম যুক্তিবাদী, কিন্তু নিজের বিশ্বাসের অসারতা ঢাকার সময় চরম অন্ধ ধার্মিক। যদি মানুষ অন্যের বিশ্বাসের ভুল ধরার জন্য যে পরিমাণ যুক্তি খাটায়, ঠিক সমপরিমাণ যুক্তি নিজের বিশ্বাসের ওপরেও খাটাতে পারতো, তবে পৃথিবী থেকে সমস্ত অন্ধত্ব নিমেষেই দূর হয়ে যেত।
৪. ধর্মের ভেতরের উপদলীয় (Sect) অন্ধত্ব
এই পক্ষপাতিত্ব শুধু এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধর্মের ভেতরের বিভিন্ন উপদলের (Sects) মধ্যেও তীব্রভাবে কাজ করে।
যেমন ইসলামের কথাই ধরা যাক। এখানে সুন্নি, শিয়া, সালাফি, বা আহমদিয়াদের মতো অনেকগুলো উপদল রয়েছে। একজন সুন্নি মুসলিম খুব সহজেই একজন শিয়া বা আহমদিয়া মুসলিমের আকিদা বা বিশ্বাসের ভুলগুলো ধরে ফেলবেন এবং সেগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ বা ‘পথভ্রষ্ট’ বলে উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু ঠিক একই ধরণের কোনো অযৌক্তিক প্রথা বা হাদিস যখন তার নিজের উপদলের মধ্যে থাকবে, তখন তিনি সেটার পক্ষে অদ্ভুত সব সাফাই গাইবেন। অর্থাৎ, এখানে সত্য খোঁজা মূল উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হলো “আমার দলই সেরা এবং সঠিক” এই অহংকারকে টিকিয়ে রাখা।
৫. মিডিয়া ও সমাজের যৌথ ধোঁকাবাজি
আমাদের এই পক্ষপাতদুষ্ট মনকে আরও বেশি উস্কে দেয় আধুনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মিডিয়াগুলো খুব ভালো করেই জানি যে মানুষ নিরপেক্ষ সত্য জানতে চায় না, মানুষ সেটাই শুনতে চায় যা তার পুরনো বিশ্বাসকে আরাম দেয়।
ফলে, যেই সমাজে যেই ধর্মের বা যেই রাজনৈতিক দলের প্রভাব বেশি, সেই সমাজের মিডিয়াগুলো ঠিক সেই পক্ষের সংবাদই বেশি প্রচার করে। কারণ এতে তাদের ভিউ বা টিআরপি বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ:
- একটি মুসলিম প্রধান দেশে মিডিয়াগুলো এমনভাবে খবর পরিবেশন করবে যাতে ইসলাম ও মুসলিমদের সব সময় নির্যাতিত বা মহান হিসেবে দেখানো হয়, এবং অন্যান্য ধর্মের ত্রুটিগুলো বড় করে প্রচার করা হয়।
- আবার একটি খ্রিস্টান বা হিন্দু প্রধান দেশে গেলে দেখা যাবে সেখানকার মিডিয়াগুলো ঠিক উল্টো কাজটা করছে। তারা মুসলিমদের খলনায়ক বানিয়ে নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করছে।
আমরা সাধারণ মানুষরা মিডিয়ার এই চালটা ধরতে পারি না। আমরা ভাবি, “টিভি বা পেপারে যখন দেখাচ্ছে, তখন নিশ্চয়ই এটাই সত্য।” অথচ আমরা ভুলে যাই যে মিডিয়া আমাদের নিরপেক্ষ বানাচ্ছে না, বরং আমাদের ভেতরের কনফার্মেশন বায়াসকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে।
এই ফাঁদ থেকে মুক্তির উপায় কী?
অন্যের দোষ বা ভুল আমাদের চোখে খুব সহজে পড়ে, কিন্তু নিজের ভুলটা স্বীকার করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই একজন মুক্ত চিন্তার, নিরপেক্ষ এবং বুদ্ধিমান মানুষ হতে চাই, তবে আমাদের নিজেদের মনের সাথে লড়াই করতে হবে। কোনো তথ্য সামনে এলে নিজেকে ৩টি প্রশ্ন করার অভ্যাস করতে হবে:
- ১. আমি কি এটা সত্যি বলেই বিশ্বাস করছি, নাকি আমি দীর্ঘদিন ধরে এটা বিশ্বাস করে এসেছি বলেই অন্ধভাবে ধরে রাখছি?
- ২. বিপক্ষের মানুষটি যে যুক্তি দিচ্ছে, আমি কি সেটা মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি, নাকি শুরুতেই তাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য নিজের পক্ষে ওকালতি করছি?
- ৩. আমি অন্যের বিশ্বাসের ত্রুটি ধরার জন্য যে যুক্তির দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করি, সেই একই দাঁড়িপাল্লায় কি আমি নিজের বিশ্বাসকে মেপে দেখতে প্রস্তুত?
পৃথিবীর কোনো রাজনৈতিক দল পারফেক্ট নয়, কোনো মানুষ বা কোনো ধর্মই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আমরা যখন নিজের ভেতরের এই অন্ধত্ব আর পক্ষপাতিত্বের দেয়াল ভেঙে সত্যকে তার নিজস্ব আলোয় বিচার করতে শিখবো—ঠিক তখনই আমরা একজন সত্যিকারের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবো।
প্রিয় দল, প্রিয় মিডিয়া বা প্রিয় বিশ্বাসের চেয়েও কি ‘সত্য’ জানার আনন্দ অনেক বেশি হওয়া উচিত নয়?
লেখাটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, বিশেষ করে তাদের সাথে যারা যেকোনো বিষয়ে একটু বেশি অন্ধত্ব প্রকাশ করে। তাদের রাগিয়ে না দিয়ে, তাদের মনের ভেতরের এই মনস্তাত্ত্বিক খেলাটি বুঝতে সাহায্য করুন।





