কুরআন অনুযায়ী কি পৃথিবী গোলাকার? সকল গোঁজামিলের জবাব

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে দাবি করা হয় যে, কুরআন ও হাদিস একটি মহাজাগতিক ও সর্বজ্ঞানী সত্তার বাণী, যাতে কোনো বৈজ্ঞানিক ভুল থাকা অসম্ভব। কিন্তু কুরআন ও হাদিসের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা মহাজাগতিক বর্ণনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধর্মগ্রন্থে আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো আলো তো নেই-ই, বরং এটি তার সমসাময়িক প্রাচীন গ্রিক, ব্যবিলনীয় ও হিব্রু মিথলজির “সমতল পৃথিবী এবং গম্বুজাকৃতির আকাশ” ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

Table of Contents

পর্ব ১: সমতল পৃথিবীর সপক্ষে কুরআনের আয়াত ও বাস্তব টেক্সটের যুক্তি:

কুরআনের এমন অনেক আয়াত রয়েছে যেখানে পৃথিবীকে বিছানা, কার্পেট কিংবা সমতল মেঝে হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আয়াতগুলোর বাস্তব টেক্সট এবং এর ভেতরের আর্গুমেন্ট নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সূরা আল-বাকারাহ (২), আয়াত: ২২

“যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা (ফিরাশা- فِرَاشًا) এবং আকাশকে ছাদ করেছেন…”

এখানে আরবি ‘ফিরাশা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো মাদুর, কার্পেট বা বিছানা—যা সমতল মেঝেতে বিছিয়ে দেওয়া হয়। একটি গোলাকার বস্তুর ওপর মানুষ স্বাভাবিকভাবে বিছানা তৈরি করে না। আরব মরুভূমির যাযাবর মানুষ সমতল মাটিতে যেভাবে চামড়া বা চাদরের বিছানা পাতত, কুরআন ঠিক সেই চিরচেনা রূপকটিকেই পৃথিবীর আকার বোঝাতে ব্যবহার করেছে। যদি পৃথিবী গোল হতো, তবে সর্বজ্ঞানী সত্তা ‘কুরাহ’ (গোলক) শব্দটি ব্যবহার করতে পারতেন, যা কুরআনের কোথাও নেই।

২. সূরা আল-গাসিয়াহ (৮৮), আয়াত: ২০

“এবং পৃথিবীর দিকে যে, তাকে কীভাবে সমতল (সুতীহাত- سُطِحَتْ) করা হয়েছে?”

এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘সুতীহাত’ শব্দটি এসেছে ‘সাতহুন’ থেকে, যার অর্থ হলো পুরোপুরি ফ্ল্যাট বা সমতল পৃষ্ঠ (যেমন টেবিলের উপরিভাগ)। বিখ্যাত ক্লাসিক্যাল তাফসীরকারক ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী তাঁর বিখ্যাত ‘তাফসীরে জালালাইন’-এ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে লিখেছেন: “জ্যামিতিবিদ বা বিজ্ঞানীদের দাবি অনুযায়ী পৃথিবী গোল… নয়, বরং এটি সমতল (ফ্ল্যাট); এবং শরীয়তের আলেমদের মতই এটি।” ওহীর দাবিদার স্বয়ং কুরআনের শব্দ এবং ইসলামের প্রথম সারির স্কলারদের প্রাচীন ব্যাখ্যা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে এই আয়াত দ্বারা পৃথিবীকে সমতলই বিশ্বাস করা হতো।

৩. সূরা আন-নাবা (৭৮), আয়াত: ৬-৭

“আমি কি পৃথিবীকে বিছানা (মিহাদা- مِهَادًا) এবং পর্বতগুলোকে খুঁটি (আоতাদা- أَوْتَادًا) করিনি?”
‘মিহাদ’ শব্দের অর্থ দোলনা বা বিছানা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্বতগুলোকে “খুঁটি” বা পেরেক বলার ধারণাটি। একটি তাঁবুকে সমতল মাটিতে ধরে রাখার জন্য যেমন চারকোনা খুঁটি বা পেরেক পোঁতা হয়, আরবরা মনে করত সমতল পৃথিবী যেন কেঁপে না ওঠে বা উল্টে না যায়, সেজন্য আল্লাহ পাহাড়গুলোকে ভারী খুঁটি হিসেবে গেঁথে দিয়েছেন। আধুনিক প্লেট টেকটোনিক্স বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে পাহাড় খুঁটি নয়, বরং মহাদেশীয় প্লেটের ধাক্কায় পর্বত তৈরি হয় এবং পর্বতমালা অঞ্চলগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প হয়। সুতরাং, সমতল তাঁবুর উপমাই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।

৪. সূরা নোয়াহ (৭১), আয়াত: ১৯

“এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন কার্পেটের মতো বিস্তৃত (বিসাতা- بِسَاطًا)।”
‘বিসাত’ মানে হলো মেঝের কার্পেট বা দস্তরখান। একজন সর্বজ্ঞানী সৃষ্টিকর্তা মহাকাশ থেকে ঝুলন্ত একটি গোলকাকার গ্রহকে বর্ণনা করতে গিয়ে বারবার কেন বিছানা, মাদুর আর কার্পেটের উপমা দেবেন? কারণ, তৎকালীন আরবের মানুষ দিগন্তের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীকে একটি বিশাল থালার মতো সমতল দেখতে পেত, কুরআন কেবল তাদের সেই চাক্ষুষ ভ্রমকেই আল্লাহর অলৌকিকতা হিসেবে সিলমোহর মেরেছে।

পর্ব ২: সমতল পৃথিবীর সপক্ষে সহীহ হাদিস ও কাবার ভৌগোলিক প্রমাণ

কুরআনের পাশাপাশি সহীহ হাদিস এবং ইসলামের মৌলিক ইবাদতের পদ্ধতিগুলোতে এমন কিছু অকাট্য মহাজাগতিক বর্ণনা রয়েছে, যা পৃথিবী সমতল না হলে কোনোভাবেই ঘটা সম্ভব নয়:

১. সূর্যের আল্লাহর আরশের নিচে সেজদা করা ও উল্টো পথে যাত্রা (সহীহ বুখারী)

সহীহ বুখারীর ৪৮০২ নম্বর হাদিসে নবী আবু যর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি জানো সূর্য ডোবার সময় কোথায় যায়?” নবী নিজেই উত্তর দেন: “এটি চলতে চলতে আল্লাহর আরশের (সিংহাসন) নিচে গিয়ে পৌঁছায় এবং সেজদা করার অনুমতি চায়… এরপর কিয়ামতের দিন তাকে বলা হবে, ফিরে যাও এবং যেখান থেকে উদিত হয়েছিলে (অর্থাৎ পশ্চিম দিক) সেখান থেকেই আবার উদিত হও।”

আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী সূর্য স্থির এবং পৃথিবী ঘোরে। সূর্য কখনো “ডোবে” না বা নির্দিষ্ট কোনো সময়ে “যেতে যেতে আরশের নিচে” পৌঁছায় না। এই হাদিস প্রমাণ করে, আরবের মানুষ ভাবত পৃথিবী সমতল, যার ওপরে গম্বুজের মতো আকাশ আর আকাশের ওপরে আল্লাহর আরশ। সূর্য দিনের বেলা সমতল পৃথিবীর ওপর ভ্রমণ শেষে রাতের বেলা নিচে অন্ধকার কোনো জায়গায় গিয়ে আল্লাহর সিংহাসনের নিচে বিশ্রাম নেয় ও সেজদা করে। আর কিয়ামতের দিন সূর্যকে আক্ষরিক অর্থেই তার বাস্তব গতিপথের “উল্টো দিকে” ফিরে যেতে বলা হবে—যা কেবল একটি সমতল পৃষ্ঠের ওপরেই সম্ভব, ঘূর্ণায়মান গোলকাকার পৃথিবীতে অবাস্তব।

২. কাবা পৃথিবীর কেন্দ্রে এবং তার ঠিক উপরে বাইতুল মামুর

ইসলামি মিথলজি অনুযায়ী, মক্কার কাবা শরিফ হলো পৃথিবীর একদম কেন্দ্র বা মাঝখানে অবস্থিত। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কাবার ঠিক সোজাসুজি সপ্তম আকাশে ‘বাইতুল মামুর’ নামক ফেরেশতাদের ইবাদতগাহ রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত কাবার উপর ঘুরছে বা অবস্থান করছে। হাদিসে বলা হয়েছে, বাইতুল মামুর থেকে যদি একটি পাথর ফেলে দেওয়া হয়, তবে তা সরাসরি মক্কার কাবার ছাদের ওপর এসে পড়বে।

একটি সমতল থালার মতো পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতেই কেবল কাবার সোজাসুজি আকাশের ছাদ বা বাইতুল মামুর স্থাপন করা সম্ভব। পৃথিবী যদি গোল হতো এবং নিজের অক্ষে অবিরাম ঘুরত, তবে মক্কার সাপেক্ষে আকাশের কোনো নির্দিষ্ট বিন্দু ২৪ ঘণ্টা স্থির থাকতে পারত না। ঘূর্ণন গতির কারণে প্রতি সেকেন্ডে কাবার মাথার ওপরের আকাশ পরিবর্তন হয়ে যেত, ফলে বাইতুল মামুর থেকে পাথর ফেললে তা মহাকাশে ছিটকে যেত, কাবার ওপর পড়ত না।

৩. দূরবর্তী দেশ থেকে কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার জ্যামিতিক অসম্ভবতা

ইসলামি বিধান অনুযায়ী বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মুসলিমকে মক্কার কাবার দিকে (কিবলা) মুখ করে নামাজ পড়তে হয়। যেমন বাংলাদেশ বা ভারত থেকে মুসলিমরা পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। পৃথিবী যদি সমতল একটি মেঝে হয়, তবে যেকোনো দূরবর্তী স্থান থেকে সরলরেখা টানলে তা কাবার সাথে মিলে যায়। কিন্তু পৃথিবী যদি গোল বা গোলকাকার হয়, তবে আপনি যখন সোজা পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়াচ্ছেন, তখন আপনার দৃষ্টির সরলরেখাটি গোল পৃথিবীর বাঁকানো পৃষ্ঠ স্পর্শ না করে সরাসরি মহাশূন্যের দিকে চলে যাচ্ছে।

গোলকার পৃথিবীতে মক্কা থেকে হাজার মাইল দূরের কোনো মানুষ যদি সোজা পশ্চিম দিকে তাকায়, তবে জ্যামিতিক নিয়মেই সে কাবার ওপর দিয়ে সোজা মহাকাশের দিকে মুখ করে আছে, কাবার দিকে নয়। গোলাকার পৃথিবীতে কাবার দিকে মুখ করতে হলে মানুষকে মাটির নিচের দিকে কোণ করে তাকাতে হতো, যা প্রমাণ করে কিবলার পুরো ধারণাটিই সমতল পৃথিবীর মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। চিত্রটিতে লক্ষ্য করুন :

সমতল পৃথিবী বনাম গোল পৃথিবীতে কাবার দিকে মুখ করার জ্যামিতিক চিত্র

৪. তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহর প্রথম আসমানে নেমে আসা

সহীহ বুখারীর ১১৪৫ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে (ভোররাতে বা তাহাজ্জুদের সময়) আল্লাহ দুনিয়ার আকাশ বা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন।

পৃথিবী যদি সমতল হতো, তবে পুরো পৃথিবীর জন্য ভোররাত একসাথেই হতো এবং আল্লাহর একবার নেমে আসাই যুক্তিযুক্ত হতো। কিন্তু গোল পৃথিবীতে প্রতিটা সেকেন্ডেই কোথাও না কোথাও ভোররাত বা রাতের শেষ তৃতীয়াংশ চলছে। বাংলাদেশ যখন ভোররাত, আমেরিকায় তখন দুপুর। এর অর্থ দাঁড়ায়, গোল পৃথিবীর হিসাব অনুযায়ী আল্লাহকে ২৪ ঘণ্টার প্রতিটি সেকেন্ডেই অবিরাম প্রথম আসমানেই বসে থাকতে হচ্ছে, কারণ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তখন ভোররাত! সর্বব্যাপী সময়ের এই চক্রাকার জ্যামিতি প্রমাণ করে যে, এই হাদিসের রচয়িতা মনে করতেন পৃথিবীর সব জায়গায় রাত-দিন একসাথেই ঘটে, যা কেবল সমতল পৃথিবীতেই সম্ভব।

৫. জান্নাত থেকে দাজলা ও ফোরাত নদীর উৎপত্তি


সহীহ মুসলিমের ২৮৯৪ নম্বর হাদিসে নবী পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন: “চারটি নদী জান্নাত থেকে প্রবাহিত হয়েছে—নীল, ফোরাত (Euphrates), সিহান ও জিহান।” দাজলা (টাইগ্রিস) ও ফোরাত নদীর ভৌগোলিক উৎপত্তি আমরা সবাই জানি—তুরস্কের পাহাড় থেকে বরফগলা পানি এসে এই নদীগুলো তৈরি করেছে।

সপ্তম শতকের আরবরা মনে করত সমতল পৃথিবীর ঠিক ওপরেই জান্নাত অবস্থিত এবং সেখান থেকেই এই নদীগুলোর পানি নিচে নেমে এসেছে। আধুনিক ভূগোল ও ভূতত্ত্বের সামনে মাটির ওপরের নদী সরাসরি অলৌকিক ‘জান্নাত’ থেকে নেমে আসার এই রূপকথা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ইসলামি বিশ্বতত্ত্ব কতটা আদিম ও সমতল-কেন্দ্রিক ছিল।

৬. নামাজের নিষিদ্ধ সময়

হাদিস অনুযায়ী, সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে থাকে (মধ্যগগন বা জাওয়াল) এবং সূর্য যখন উদয় ও অস্ত যায়, তখন নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ নবী বলেছেন, সূর্য কাফেরদের উপাস্য এবং তা শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝখান দিয়ে উদিত হয়।

পৃথিবী যদি সমতল হতো, তবে পুরো পৃথিবীর মানুষের জন্য সূর্য একসাথেই মাথার ওপরে আসত এবং একসাথেই নিষিদ্ধ সময় হতো। কিন্তু গোল পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তেই কোটি কোটি মানুষের মাথার ওপর সূর্য অবস্থান করছে। অর্থাৎ, গোল পৃথিবীর জ্যামিতি অনুযায়ী প্রতি সেকেন্ডেই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও নামাজ পড়া নিষিদ্ধ! এই নিষিদ্ধ সময়ের ধারণা স্পষ্ট করে যে, কুরআন-হাদিসের লেখক মনে করতেন সূর্য পুরো সমতল পৃথিবীর ওপর একসাথেই উদিত, মধ্যগগন ও অস্ত যায়।

৭. শুক্রবারে কেয়ামত বনাম গোলাকার পৃথিবীর টাইম জোন

ইসলামিক আকিদা ও সহিহ হাদিসের একাধিক বর্ণনা অনুযায়ী, এই মহাবিশ্বের মহাপ্রলয় বা কেয়ামত একটি নির্দিষ্ট বারে সংঘটিত হবে, আর সেই বারটি হলো জুমার দিন বা শুক্রবার। নবী হাদিসে বলেছেন:

“দিনসমূহের মধ্যে জুমার দিনই সর্বোত্তম… এই দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।” (সহিহ মুসলিম, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস নং: ১৮৫৭)

অন্য হাদিসে এসেছে, জুমার দিন ভোর থেকে নিয়ে সূর্যোদয় পর্যন্ত পৃথিবীর সমস্ত পশুপাখিও কেয়ামতের ভয়ে অত্যন্ত আতঙ্কিত ও কান খাড়া করে থাকে। (সুনানে আবু দাউদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস নং: ১০৪৬)

গোলাকার পৃথিবীতে এটি কেন অসম্ভব এবং কীভাবে এটি সমতল পৃথিবী প্রমাণ করে:

আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রত্যক্ষ উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে আমরা সবাই জানি যে পৃথিবী একটি ঘূর্ণায়মান গোলক। আর পৃথিবী গোলাকার হওয়ার কারণে এর সব জায়গায় কখনো একসাথে একই দিন বা রাত থাকে না। একেই বলা হয় টাইম জোন (Time Zone)। সূর্য উদয় ও অস্ত যাওয়ার নিয়মানুযায়ী, জাপানে যখন শুক্রবারের দুপুর, আমেরিকায় তখনো বৃহস্পতিবারের রাত। আবার অস্ট্রেলিয়ায় যখন শুক্রবার শেষ হয়ে শনিবারের ভোর হতে চলেছে, ইউরোপে তখন কেবল শুক্রবারের সকাল। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট ২৪ ঘণ্টার চক্রে পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর বুকে শুক্রবার আবর্তিত হয়। পুরো পৃথিবীতে একই সাথে, একই মুহূর্তে ‘শুক্রবার’ থাকা ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব।

তাহলে প্রশ্ন জাগে— কেয়ামত যখন আকস্মিকভাবে একটি একক মুহূর্তে শুরু হবে, তখন পৃথিবীর কোন অঞ্চলের শুক্রবারকে হিসাব করা হবে? যদি মক্কার শুক্রবার ধরে কেয়ামত হয়, তবে আমেরিকার মানুষের জন্য তো সেটি হবে বৃহস্পতিবারের রাত! হাদিসের এই ঢালাও বক্তব্য তখনই কেবল নিখুঁতভাবে সত্য হতে পারে, যদি পুরো পৃথিবীটি একটি থালার মতো চ্যাপ্টা বা সমতল হয়। পৃথিবী সমতল হলেই কেবল সূর্য একযোগে সবার মাথার ওপর উঠবে এবং একযোগে অস্ত যাবে, যার ফলে পুরো পৃথিবীর জন্য ‘শুক্রবার’ দিনটি একটি একক ও অভিন্ন মুহূর্তে আসবে। গোলাকার পৃথিবীর বাস্তবতায় একটি একক মুহূর্তে বৈশ্বিক শুক্রবারের ধারণা একটি চরম ভৌগোলিক স্ববিরোধিতা, যা প্রমাণ করে ইসলাম অনুযায়ী পৃথিবী গোলাকার নয়, বরং সমতল।

৮. সাত আসমান ও সমান্তরাল সাত যমীনের স্তূপীকরণ

কোরআন ও হাদিসের বিবরণ: কোরআনে পরিষ্কারভাবে সাতটি আসমান এবং সমান্তরালভাবে সাতটি যমীনের কথা বলা হয়েছে:

“আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং অনুরূপ সংখ্যক যমীনও।” *(সূরা আত-তালাক, আয়াত: ১২)

হাদিসে এই সাতটি যমীনের গঠন ও অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমিও আত্মসাৎ করবে, কেয়ামতের দিন তার গলায় সাত তলা যমীন ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশনস, হাদিস নং: ৩১৯৮)

গোলাকার পৃথিবীতে এটি কেন অসম্ভব এবং কীভাবে এটি সমতল পৃথিবী প্রমাণ করে:

ইসলামিক বিশ্বতত্ত্ব (Cosmology) অনুযায়ী, সাতটি আসমান যেমন একের ওপর আরেকট স্তর হিসেবে সাজানো, সাতটি যমীনও ঠিক তেমনি নিচের দিকে একটির নিচে আরেকটি সমান্তরাল স্তর হিসেবে স্তূপীকৃত। এই ধারণাটি পুরোপুরি প্রাচীন সমতল পৃথিবীর মডেলের সাথে মিলে যায়।

যদি পৃথিবী গোলক বা উপবৃত্তাকার হয়, তবে একটি গোলক পৃথিবীর “নিচে” আরেকটি গোলক পৃথিবী থাকা জ্যামিতিক ও মহাজাগতিকভাবে অসম্ভব। মহাবিশ্বে ‘নিচে’ বলতে নির্দিষ্ট কোনো দিক নেই; গোলক পৃথিবীর চারদিকেই মহাশূন্য। যদি আমরা পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে যাই, তবে এক স্তর নিচে নামলে আমরা মূলত পৃথিবীর উত্তপ্ত কেন্দ্রের (Core) দিকে যাব। কেন্দ্রের নিচে আরেকটি আস্ত পৃথিবী থাকা অবৈজ্ঞানিক ও হাস্যকর। একটির নিচে আরেকটি যমীন থাকার ধারণা কেবল তখনই খাটে, যখন যমীনগুলোকে সমতল তাসের বা কাগজের স্তরের মতো একটির নিচে আরেকটি সাজানো কল্পনা করা হয়।

পর্ব ৩: ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টদের সমস্ত ‘গোঁজামিল’ এবং সেসবের খণ্ডন :

বিজ্ঞানের এই চরম যুগে এসে এই সমস্ত জ্যামিতিক, ব্যাকরণগত ও ভৌগোলিক ভুল ঢাকতে আধুনিক ইসলামি অ্যাপোলজিস্টরা ও জাকির নায়েকপন্থীরা যেসব চাতুর্যপূর্ণ ভাষার কারসাজি বা গোঁজামিল দিয়ে থাকেন, নিচে সেগুলো এক এক করে পুরোপুরি খণ্ডন করা হলো:

১. মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “কুরআনে পৃথিবীকে বিছানা বা কার্পেট বলা হয়েছে মানুষের সুবিধার দৃষ্টিভঙ্গি (Human Perspective) থেকে। এর অর্থ হলো মানুষের জন্য এটি সমতলের মতো আরামদায়ক করা হয়েছে, এর মানে এই নয় যে জ্যামিতিকভাবে পৃথিবী গোল নয়।”

খণ্ডন: এটি একটি চতুর আধুনিক অজুহাত। প্রথমত, কুরআন নিজেকে “স্পষ্ট কিতাব” বলে দাবি করে। যদি সৃষ্টিকর্তা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কথাই বলবেন, তবে তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারতেন—”যদিও আমি পৃথিবীকে গোল করেছি, কিন্তু তোমাদের হাঁটার জন্য একে সমতল অনুভূতির করেছি।” তা না করে আল্লাহ গোটা বিশ্বতত্ত্বের বিবরণ দিতে গিয়ে পাহাড়কে খুঁটি, আকাশকে খুঁটিহীন ছাদ এবং পৃথিবীকে বিছানা বলেছেন। এটি কোনো মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং এটি টেক্সটের ভেতরের অবজেক্টিভ ইউনিভার্সাল স্টেটমেন্ট। যদি কুরআনের প্রতিটি ভুলকে “মানুষের ভুল দেখার দৃষ্টিভঙ্গি” বলে পার পাওয়া যায়, তবে কুরআনের নিজস্ব কোনো বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতার দাবিই আর অবশিষ্ট থাকে না।

২. ‘দাহাহা’ (উটপাখির ডিম) জালিয়াতির গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “সূরা নাজিয়াত-এর ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘দাহাহা’ (دَحَاهَا), যার মূল অর্থ হলো উটপাখির ডিম। অর্থাৎ কুরআন ১৪০০ বছর আগেই বলেছে পৃথিবী উটপাখির ডিমের মতো গোল!”

খণ্ডন: এটি আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড়, জঘন্যতম বৈজ্ঞানিক জালিয়াতি এবং আরবি ব্যাকরণের ওপর এক চরম পৈশাচিক অত্যাচার। এর পেছনের অকাট্য ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত সত্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

বাক্য বা সেন্টেন্সের অসারতা (Grammatical Disaster): আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী আয়াতে ব্যবহৃত ‘দাহা’ একটি ক্রিয়াপদ বা ভার্ব (Verb), কোনো বিশেষ্য বা নাউন (Noun) নয়। আর এর সাথে যুক্ত ‘হা’ হলো একটি সর্বনাম বা প্রোনাউন (Pronoun), যার অর্থ ‘তাকে’ (এখানে পৃথিবীকে বোঝানো হয়েছে)। এখন অ্যাপোলজিস্টদের দাবি অনুযায়ী ‘দাহা’ শব্দটিকে ভার্ব না ধরে যদি আক্ষরিকভাবেই “উটপাখির ডিম” নামক নাউন বা বিশেষ্য ধরা হয়, তবে আয়াতের অনুবাদ দাঁড়ায়: “আর পৃথিবীকে, উহার পর তিনি তাহাকে উটপাখির ডিম…।” এখানে কোনো ক্রিয়াপদ বা ভার্বই থাকে না! একটি বাক্যে যদি ভার্ব বা অ্যাকশন না থাকে, তবে সেটি কোনো সম্পূর্ণ বাক্যই হয় না। ঈশ্বর কি ব্যাকরণ না জানা কোনো সত্তা যে তিনি ক্রিয়াপদের জায়গায় হুট করে একটা নাউন বসিয়ে বাক্য বিকল করে দেবেন? সুতরাং, এটিকে “ডিম” অর্থ করলে পুরো আয়াতের সেন্টেন্স স্ট্রাকচারটাই ধ্বংস হয়ে যায়।

আরবের কোনো অভিধান ও তাফসীরে দাহা শব্দের অর্থ ‘উটপাখির ডিম’ এমনটি নেই:

আরবের কোনো ক্লাসিক্যাল ডিকশনারি (যেমন: লিসানুল আরব, তাজুল আরুস) কিংবা কোনো প্রাচীন নির্ভরযোগ্য তাফসীর (যেমন: ইবনে কাছীর, তাবারী, জালালাইন)-এ ‘দাহা’ শব্দের অর্থ “উটপাখির ডিম” বা “ডিম্বাকৃতি” লেখা হয়নি। এর প্রকৃত অর্থ হলো “বিছানো”, “ছড়িয়ে দেওয়া” বা “সবদিক থেকে সমতল করা”। আরবরা উটপাখি যে সমতল বালির ওপর ডিম পাড়ে, তার আগে পা দিয়ে বালি সমান করে যে বাসা বানায়, সেই বালি সমতল করার জায়গাকে ‘উধূইয়াহ’ বা ‘উধূ’ বলে। অ্যাপোলজিস্টরা মূল ক্রিয়াপদের “সমতল করা” অর্থটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে, “বাসা বানানোর জন্য বালি সমতল করার স্থান” থেকে চতুরতার সাথে “ডিম” শব্দটিকে চুরি করে নাউন বানিয়ে কুরআনের ভেতরে জোরপূর্বক গুঁজে দিয়েছে।

পৃথিবীর আকৃতি কি উটপাখির ডিমের মতো?

উটপাখির ডিম এক প্রান্তে সরু এবং অন্য প্রান্তে মোটা অর্থাৎ পুরোপুরি উপবৃত্তাকার (Egg-shaped)। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে পৃথিবী উত্তর-দক্ষিণে সামান্য চাপা ও মেরু অঞ্চলে চ্যাপ্টা (Oblate Spheroid), এটি উটপাখির ডিমের মতো এক মাথায় চোখা বা একদিক মোটা নয়। সুতরাং, পৃথিবীর আকৃতি উটপাখির ডিমের মতোও নয়।

পৃথিবীর আকৃতি কি উটপাখির ডিমের মতো

৩. কাবার কেন্দ্রে থাকা ও কিবলা নির্ধারণের গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “কাবার দিকে মুখ করার অর্থ আক্ষরিক সরলরেখা নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা। আর কাবা পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত—এটি বৈজ্ঞানিকভাবেও সত্য, কারণ মক্কা হলো গোল পৃথিবীর ল্যান্ডমাসের সেন্টার।”

খণ্ডন: প্রথমত, একটি গোলকের বা গোল বলের উপরিভাগে কোনো “কেন্দ্র” বা সেন্টার থাকতে পারে না। গোলকের কেন্দ্র থাকে তার অভ্যন্তরে, পেটের ভেতরে। গোলকের উপরিভাগের যেকোনো বিন্দুই চারপাশের সাপেক্ষে সমান দূরত্বের। সুতরাং, মক্কা পৃথিবীর উপরিভাগের কেন্দ্র—এই দাবিটি জ্যামিতিকভাবেই একটি চরম মূর্খতা। দ্বিতীয়ত, ইসলামি ফিকহ বা আইন অনুযায়ী নামাজে কাবার “আইনুল কাবা” বা কাবার মূল কাঠামোর দিকে সরাসরি মুখ করা ফরজ। যদি এটি কেবলই আধ্যাত্মিক বা প্রতীকী হতো, তবে কিবলা ভুল হলে নামাজ ভেঙে যাওয়ার এত কঠোর নিয়ম থাকত না। গোলাকার পৃথিবীতে দূরবর্তী দেশ থেকে কাবার দিকে মুখ করা জ্যামিতিক কারণেই অসম্ভব, যা প্রমাণ করে ইসলামের নামাজ পদ্ধতি কেবল সমতল পৃথিবীর জন্যই ডিজাইন করা।

৪. আল্লাহর নিচে নেমে আসা ও নিষিদ্ধ সময়ের গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “আল্লাহর প্রথম আসমানে নেমে আসা মানুষের বুদ্ধির অতীত, এটি একটি মেটাফিজিক্যাল বিষয়। একইভাবে নামাজের নিষিদ্ধ সময়টা স্থানীয় সূর্যের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, তাই গোল পৃথিবীতেও কোনো সমস্যা নেই।”

খণ্ডন: এটি একটি চরম সুবিধাবাদী আর্গুমেন্ট। হাদিসে যখন স্পষ্ট বলা হচ্ছে “রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ নেমে আসেন”, তখন একে সময়ের ফিজিক্যাল প্যারামিটার দিয়েই বাঁধা হয়েছে। গোল পৃথিবীতে যদি ২৪ ঘণ্টার প্রতি সেকেন্ডেই আল্লাহকে দুনিয়ার আকাশে নেমে থাকতে হয়, তবে “নেমে আসা” বা “ফিরে যাওয়া” শব্দগুলোর কোনো অর্থই আর অবশিষ্ট থাকে না। একইভাবে, শয়তানের শিংয়ের মাঝখান দিয়ে সূর্য উদয় হওয়ার কারণে যদি নামাজ নিষিদ্ধ হয়, তবে গোল পৃথিবীর কারণে শয়তানকে অবিরাম প্রতি সেকেন্ডে সূর্যের সামনে শিং উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এই আদিম ও হাস্যকর কল্পনাগুলো কেবল তখনই খাপ খায়, যখন বিশ্বাস করা হয় পৃথিবী স্থির ও সমতল এবং সূর্য একটা নির্দিষ্ট সময়েই উদিত ও অস্ত যায়।

৫. জান্নাতের নদী ও বাইতুল মামুরের গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “নীল বা ফোরাত নদী জান্নাত থেকে এসেছে—এর অর্থ হলো এই নদীগুলোর পানি অত্যন্ত বরকতময় ও মিষ্টি, এটি রূপক। আর বাইতুল মামুর আধ্যাত্মিক জগতে কাবার ওপরে অবস্থিত, জড় জগতের বিজ্ঞানের সাথে এর তুলনা করা ভুল।”

খণ্ডন: অ্যাপোলজিস্টরা যখনই বিজ্ঞানের কাছে ধরা খায়, তখনই হাদিসের আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে “রূপক” বা “আধ্যাত্মিক”-এর আশ্রয় নেয়। হাদিসে স্পষ্ট করে নীল ও ফোরাতকে জান্নাতের নদী বলা হয়েছে, অথচ এই নদীগুলোর ভৌগোলিক উৎস আজ মানুষের জানা। একইভাবে, বাইতুল মামুর থেকে পাথর ফেললে তা কাবার ওপর পড়বে—এই বিবরণটি পরিষ্কারভাবে একটি উলম্ব সরলরেখা (Vertical straight line) নির্দেশ করে। ঘূর্ণায়মান গোলকাকার পৃথিবীতে মক্কার ওপরের আকাশ প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হওয়ায় এই মডেলটি সম্পূর্ণ অচল।

৬. শুক্রবারে কেয়ামত বনাম গোলাকার পৃথিবীর গোঁজামিল ও খণ্ডন

গোঁজামিল: এই টাইম জোনের ফাঁদ থেকে বাঁচতে আধুনিক ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টরা দুটি ব্যাখ্যা দেন। প্রথমত, এখানে শুক্রবার বলতে মক্কার সময়কে বোঝানো হয়েছে। মক্কার ঘড়িতে যখন শুক্রবার হবে, তখনই কেয়ামত হবে, বাকি পৃথিবীর সময় যাই হোক না কেন। দ্বিতীয়ত, কেয়ামত তো আর এক সেকেন্ডে শেষ হবে না; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শুক্রবার শুরু হয়ে এটি হয়তো কয়েকদিন ধরে চলবে, ফলে ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর সব দেশের মানুষই নিজ নিজ অঞ্চলের শুক্রবারের দেখা পাবে।

খণ্ডন: এই দুটি ব্যাখ্যাই চরম মাত্রায় গোঁজামিল এবং ইসলামের নিজস্ব টেক্সটের সাথে সাংঘর্ষিক। প্রথম ব্যাখ্যাটি সৃষ্টিকর্তাকে চরমভাবে মক্কা-কেন্দ্রিক এবং আঞ্চলিক এক সত্তায় পরিণত করে। হাদিসে জুমার দিনের মহাত্ম্যের কারণে এই দিনে কেয়ামত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমেরিকার বা অস্ট্রেলিয়ার একজন মুসলিমের জন্য তো সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তে জুমা বা শুক্রবারই নয়! তাহলে স্রষ্টা কেন বাকি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জন্য দিনটির কোনো মহাত্ম্য বা প্রাসঙ্গিকতা না রেখেই, কেবল মক্কার স্থানীয় ঘড়ি ধরে মহাবিশ্ব ধ্বংস করবেন? তাছাড়া, হাদিসে বলা হয়েছে কেয়ামতের ভয়ে জুমার দিন ভোরবেলা সব পশুপাখি কান খাড়া করে থাকে। বনের পশুপাখিরা কি মক্কার টাইম জোন ঘড়ি দেখে হিসাব করে কান খাড়া করে রাখে?

দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি সহিহ হাদিসের অন্য বর্ণনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। হাদিস অনুযায়ী কেয়ামত আসবে অত্যন্ত আকস্মিকভাবে, যা চোখের পলকে বা একটি একক মুহূর্তে ঘটবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুই ব্যক্তি কাপড় কেনাবেচা করার জন্য কাপড় মেলে ধরবে, কিন্তু তা গুটানোর আগেই কেয়ামত হয়ে যাবে। কেউ উটের দুধ দোহন করে মুখে তোলার আগেই কেয়ামত এসে পড়বে। (সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস নং: ৬৫০৬)।

অর্থাৎ, কেয়ামতের শুরু বা সূচনাটা হবে একটি একক মহাজাগতিক মুহূর্তে (Single Moment)। আর সেই নির্দিষ্ট মহাজাগতিক মুহূর্তে গোলাকার পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি অংশে শুক্রবার থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সুতরাং, এই খোঁড়া যুক্তিগুলো দিয়ে হাদিসের বৈশ্বিক ভৌগোলিক স্ববিরোধিতাকে ঢাকা যায় না, যা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে এই বিবরণগুলোর রচয়িতাদের কাছে পৃথিবীর গোলক আকৃতির কোনো ধারণাই ছিলনা।

৭. সাত জমিন সাত আসমান সম্পর্কিত গোঁজামিল ও খণ্ডন :

গোঁজামিল:  আধুনিক স্কলাররা বিজ্ঞান দিয়ে একে মেলাতে গিয়ে বলেন, “এখানে সাত যমীন বলতে আসলে পৃথিবীর অভ্যন্তরের সাতটি স্তরকে (Crust, Mantle, Core ইত্যাদি) বোঝানো হয়েছে।” আবার কেউ কেউ বলেন, “মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো আরও সাতটি গ্রহ আছে, এখানে সেই কথা বলা হয়েছে।”

খণ্ডন: দুটি দাবিই বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে ধোপে টেকে না। প্রথমত, ভূগোলের নিয়মে পৃথিবীর ভূত্বকের ভেতরের স্তরগুলো কোনো “আলাদা পৃথিবী” বা বসবাসের যোগ্য যমীন নয়, সেগুলো মূলত গলিত লাভা ও ফুটন্ত ম্যাগমার একেকটি স্তর। সেখানে মানুষের গলায় জমি ঝুলিয়ে দেওয়া বা সেখানে জীবনধারণের কোনো সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, যদি সাতটি আলাদা গ্রহ বোঝানো হতো, তবে “একটির নিচে আরেকটি” এবং “কারও গলায় সাত তলা যমীন ঝুলিয়ে দেওয়ার” মতো ফিজিক্যাল মেটাফোর হাদিসে আসত না।

কারণ মহাবিশ্বে অন্য গ্রহগুলো পৃথিবীর ‘নিচে’ অবস্থিত নয়, সেগুলো নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে। সুতরাং, একের নিচে অন্য যমীনের অবস্থান এবং অন্যায়কারীর গলায় সেই সাতটি যমীন ঝুলিয়ে দেওয়ার এই আদিম থিওরি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আরবের মানুষের সমতল স্তরীভূত পৃথিবীর আদিম রূপকথাকেই এখানে ঐশী বাণী হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

৮. ‘ইউকাউয়িরু’ (পেঁচানোর) গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল:”সূরা আয-যুমার (৩৯)-এর ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনি রাতের দ্বারা দিনকে এবং দিনের দ্বারা রাতকে আচ্ছাদিত করেন (ইউকাউয়িরু)’। ‘ইউকাওউইরু’ (يُكَوِّرُ) শব্দটিকে তারা “পাগড়ির মতো গোল করে পেঁচানো” অর্থ করে দাবি করেন যে, কুরআন এখানে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও গোলাকার আকৃতির ইঙ্গিত দিয়েছে। এছাড়াও, অনেকে দাবি করেন, ‘ইউকাউয়িরু’ শব্দটি এসেছে ‘কুরাহ’ থেকে, যার অর্থ বল বা গোলক। দিন-রাত গোল গোল হয়ে পেঁচায়—তার মানে কুরআন এখানে পরোক্ষভাবে পৃথিবীকে গোল বলেছে!”

খণ্ডন: এটি একটি চরম বিভ্রান্তিকর এবং অপ্রাসঙ্গিক গোঁজামিল। প্রথমত, আয়াতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে রাত ও দিনকে পরস্পরের ওপর পেঁচানো বা জড়ানোর কথা, পৃথিবীর কথা নয়। প্রাচীনকালের মানুষ বিশ্বাস করত, সমতল পৃথিবীর ওপরে একটি গম্বুজাকৃতির আকাশ বা গোল ছাদ রয়েছে। সেই সমতল থালার ওপর থাকা গম্বুজ আকৃতির আকাশে দিন এবং রাতের আলো চক্রাকারে বা গোল হয়ে একটির পর একটি ঘুরতে থাকে। দ্বিতীয়ত, দিন-রাতের এই চক্রাকার গতি সমতল পৃথিবীর ওপরেও হওয়া সম্ভব।

উদাহরণস্বরূপ, একটি সমতল টেবিলের ওপর যদি আপনি একটি বাটি উপুড় করে তার গায়ে গোল করে কাপড় পেঁচান, তবে কাপড়টি গোল হয়েই প্যাঁচাবে, কিন্তু নিচের টেবিলটি সমতলই থাকবে। কুরআন এখানে আকাশের গম্বুজে দিন-রাতের চক্রাকার আগমনকে বুঝিয়েছে, পৃথিবীর আকৃতিকে নয়। পুরো কুরআনে দিন-রাতকে গোল বা পেঁচানো বলা হলেও, ‘পৃথিবী গোল’—এই কথাটি একটিবারের জন্যও বলা হয়নি। নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন:

সমতল পৃথিবীর ওপর দিন ও রাতের আগমন এবং কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ

ক্লাসিক্যাল তাফসির ও শব্দের অপব্যাখ্যা:

ইউকাউয়িরু’ শব্দের মূল ধাতুর আদি অর্থ হলো ‘জড়ানো বা ভাঁজ করা’ (যেমন মাথায় পাগড়ির কাপড় একটার ওপর আরেকটা জড়ানো হয়)। ৭ম শতকের আরবরা এই আয়াত দিয়ে ‘পৃথিবী গোল’—এমন কিছুই বোঝেনি। ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাচীন মুফাসসির ইমাম তাবারী এবং ইবনে কাথির এর অর্থ করেছেন: “একটি এলে অন্যটি উধাও হয় (ক্রমান্বয় আগমন)”। এমনকি বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম কুরতুবী তাঁর তাফসিরে পরিষ্কার লিখেছেন—পৃথিবী সমতল, আর একে যারা গোল বলে তারা কুরআনের বিরোধী। সুতরাং, এটি আধুনিক অপব্যাখ্যা।

​সুবিধাবাদী যুক্তি বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড (Cherry-Picking Logical Fallacy)

​ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারীরা দিন-রাতের ‘পেঁচানো’ নামক একটি রূপক শব্দ দিয়ে পৃথিবীকে জোর করে গোল বানাচ্ছেন। অথচ কুরআন যখন সরাসরি পৃথিবীকে নিয়ে কথা বলে, তখন তারা চুপ হয়ে যান। যেমন:

​সূরা গাশিয়াহ (৮৮:২০): “ওয়া ইলাল আরদি কাইফা সুতিহাত” (এবং পৃথিবীর দিকে, তা কীভাবে সমতল/ফ্ল্যাট করা হয়েছে?)। জ্যামিতিতে ‘সাতাহ’ মানেই দ্বিমাত্রিক ফ্ল্যাট সারফেস বা সমতল উপরিভাগ।

​দিন-রাতের রূপক শব্দ দিয়ে পৃথিবীকে গোল বানানো, আর সরাসরি পৃথিবীর আকৃতি নিয়ে বলা স্পষ্ট ‘সমতল’ শব্দটিকে রূপক বলে উড়িয়ে দেওয়া—একটি স্পষ্ট ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ও লজিক্যাল ফ্যালাসি।

৯. ‘দিগন্ত বা দুই পূর্ব ও দুই পশ্চিম’-এর গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “কুরআনে ‘মাশরিকাইন’ ও ‘মাগরিবাইন’ (দুই পূর্ব ও দুই পশ্চিম) এবং ‘মাশারেক’ ও ‘মাগারেব’ (বহুবচন: অনেক পূর্ব ও অনেক পশ্চিম)-এর কথা বলা হয়েছে। পৃথিবী যদি ফ্ল্যাট বা সমতল হতো, তবে পূর্ব দিক একটা এবং পশ্চিম দিক একটাই হতো। যেহেতু পৃথিবী গোল এবং নিজের অক্ষে ঘোরে, তাই একেক গোলার্ধের জন্য পূর্ব ও পশ্চিম আলাদা। এটাই প্রমাণ করে কুরআন পৃথিবীর গোলকত্ব নির্দেশ করেছে।”

খণ্ডন: এই দাবিটি প্রাচীন আরবের ভৌগোলিক জ্ঞান এবং কুরআনের নিজস্ব টেক্সট সম্পর্কে অজ্ঞতার ফসল। প্রথমত, প্রাচীন আরবের মানুষ প্রতিদিন খালি চোখে দেখত যে, বছরের ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে (শীতকাল ও গ্রীষ্মকাল) সূর্য উদয় ও অস্ত যাওয়ার জায়গা বা কোণ পরিবর্তন করে। শীতকালে সূর্য যেভাবে একটু দক্ষিণ-পূর্ব দিকে উদিত হয়, গ্রীষ্মকালে ঠিক সেভাবে উদিত হয় না। এই যে শীতকালীন সর্বোচ্চ বিন্দু এবং গ্রীষ্মকালীন সর্বোচ্চ বিন্দু—এই দুই বিন্দুকে আরবরা “দুই পূর্ব ও দুই পশ্চিম” বলত।

ইমাম ইবনে কাছীরসহ সমস্ত প্রাচীন তাফসীরকারক এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এটি দ্বারা শীতকাল ও গ্রীষ্মকালের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দুই প্রান্তকে বোঝানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বছরের ৩৬৫ দিন সূর্য প্রতিদিন একটু একটু সরে ভিন্ন ভিন্ন বিন্দুতে উদিত ও অস্ত যায়। এই প্রতিদিনের ভিন্ন ভিন্ন উদয়-অস্ত যাওয়ার বিন্দুগুলোকে বোঝাতে কুরআনে বহুবচন (অনেক পূর্ব ও অনেক পশ্চিম) ব্যবহার করা হয়েছে। এর সাথে পৃথিবী গোল হওয়ার কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই। একটি সম্পূর্ণ সমতল থালার ওপরেও যদি একটি আলো প্রতিদিন তার উদয়ের কোণ পরিবর্তন করে, তবে সেখানেও একাধিক পূর্ব ও পশ্চিম তৈরি হবে।

১০. ‘তাহতাহা’ শব্দের অপব্যাখ্যার গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “সূরা আশ-শামস (৯১)-এর ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ওয়াল আরদ্বি ওয়ামা ত্বাহাহা’। এখানে ‘তাহা’ শব্দের অর্থ হলো—কোনো কিছুকে ধাক্কা দিয়ে গোল গোল করে ঘুরিয়ে ছুড়ে দেওয়া। যেমন মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং-এর পর পৃথিবী গোল হয়ে মহাশূন্যে ছিটকে এসেছিল। কুরআন সেটাই ইঙ্গিত করেছে।”

খণ্ডন:  এটি ‘দাহাহা’ শব্দের মতোই আরেকটি ভাষাতাত্ত্বিক জালিয়াতি। আরবি ভাষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এ পরিষ্কার বলা হয়েছে: “তাহা কাল আরদ্বা: দাহাহা” অর্থাৎ ‘তাহা’ এবং ‘দাহা’ সম্পূর্ণ সমার্থক শব্দ। আর ‘দাহা’ শব্দের অর্থ আমরা আগেই দেখেছি—কোনো কিছুকে বিছানো, সমতল করা বা ফ্ল্যাট করা। বিখ্যাত আরবী অভিধান ‘তাজুল আরুস’-এ বলা হয়েছে, উট বা কোনো পশু যখন তার পা দিয়ে মাটিকে চ্যাপ্টা বা সমতল করে ফেলে, তখন তাকে ‘তাহা’ বলে। সুতরাং, কুরআনের ওহীর ভাষা অনুযায়ী আল্লাহ পৃথিবীকে সবদিক থেকে পিটিয়ে সমতল করেছেন, কোনো কিছুকে “গোল করে মহাশূন্যে ছুড়ে মারা” এই শব্দের অর্থই নয়।

১১. ‘ফাতাক্বাল্লা বা গোল চক্রের’ বৈজ্ঞানিক আয়াতের গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “সূরা ইয়াসিনের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সূর্য ও চন্দ্রের প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে বা আবর্তন করছে (কুল্লুন ফী ফালাকিইঁ ইয়াসবাহূন)’। এখানে ‘ফালাক’ শব্দের অর্থ হলো মহাকাশের বৃত্তাকার বা গোল কক্ষপথ। এখন সূর্য-চন্দ্র যদি গোল পথে ঘোরে, তবে তাদের মাঝখানে থাকা পৃথিবী সমতল হয় কীভাবে? পৃথিবীও নিশ্চিত গোল!”

খণ্ডন: এটি একটি অত্যন্ত চতুর এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য বিকৃতির গোঁজামিল। প্রথমত, এই আয়াতে সূর্য এবং চন্দ্রের গতির কথা বলা হয়েছে, পৃথিবীর গতির কথা বা পৃথিবীর আকৃতির কথা কিন্তু বলা হয়নি। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় সত্য হলো, প্রাচীন যুগের “ফ্ল্যাট আর্থ বা সমতল পৃথিবী” মডেলেও মনে করা হতো পৃথিবী স্থির ও সমতল, আর সূর্য এবং চন্দ্র তার মাথার ওপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে গোল করে বা বৃত্তাকারে ঘুরে আসছে। এটি হচ্ছে প্রাচীন ভূ-কেন্দ্রিক মডেল (Geocentric model)। অর্থাৎ, সূর্য-চন্দ্রের কক্ষপথ গোল বা বৃত্তাকার হওয়া কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে নিচের পৃথিবীটিও গোল। সমতল পৃথিবীর ওপরেও সূর্য-চন্দ্র গোল হয়ে ঘুরতে পারে, যা প্রাচীন আরবরা খালি চোখেই দেখতে পেত এবং কুরআন সেটাই লিখেছে।

১২. চাঁদ-সূর্যের ‘পরস্পরকে ধরতে না পারা’র গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “কুরআনে বলা হয়েছে, ‘সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া, আর রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে ছাড়িয়ে যাওয়া’ (সূরা ইয়াসিন: ৪০)। পৃথিবী যদি ফ্ল্যাট বা সমতল হতো, তবে তো চাঁদ আর সূর্য একে অপরকে ধাক্কা দিত বা একটা আরেকটার ওপরে চলে আসত। যেহেতু তারা গোল পৃথিবীর দুই পাশে আলাদা কক্ষপথে ঘোরে, তাই তারা একে অপরকে ধরে না। কুরআন এখানে পরোক্ষভাবে গোল পৃথিবীর কথাই বলেছে।”

খণ্ডন:  এটি সম্পূর্ণ মনগড়া একটি ব্যাখ্যা। সপ্তম শতকের আরবের মানুষ মহাকাশকে একটি বিশাল থিয়েটার বা গম্বুজের মতো ভাবত, যেখানে সূর্য এবং চন্দ্র দুটি আলাদা ট্র্যাকে বা লাইনে চলে। তারা ভাবত, সূর্য দিনের বেলা আলো দেয় এবং রাতের বেলা চলে যায়, আর চাঁদ রাতে আসে। তাদের ভয় ছিল, কোনোদিন যদি সূর্য রাতে চলে আসে বা চাঁদ দিনে চলে আসে, তবে মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ এখানে আরবের মানুষদের আশ্বস্ত করে বলছেন যে, সূর্য ও চন্দ্রের ট্র্যাক বা লাইন আলাদা, কেউ কারও লাইনে ঢুকে ধাক্কা খাবে না বা কেউ কাউকে ওভারটেক করবে না। এই আদিম ধারণার সাথে গোল পৃথিবীর কোনো সম্পর্ক নেই। দুটি আলাদা লাইনে দুটি বস্তুর সমান্তরাল চলা সমতল পৃথিবীর ওপরেও অনায়াসে সম্ভব।

১৩. ‘খিলাফাহ বা দিক পরিবর্তনের’ জ্যামিতিক গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “সূরা আল-ফুরকানের ৬২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনিই রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী বা পরিবর্তনশীল (খিফাতান) করেছেন।’ এর অর্থ হলো দিন ও রাত একে অপরের পেছনে তাড়া করছে। পৃথিবী গোল এবং নিজের অক্ষে ঘোরে বলেই দিন-রাতের এই চক্রাকার তাড়া করা সম্ভব।”

খণ্ডন: এটিও একটি দুর্বল এবং জবরদস্তিমূলক ব্যাখ্যা। ‘খিফাতান’ শব্দের অর্থ হলো একটির পর আরেকটির আগমন বা পর্যায়ক্রম (Alternation)। সমতল পৃথিবীর মডেলেও দিন ও রাত একটির পর একটি আসে। যখন আলো আসে তখন দিন হয়, আর যখন আলো চলে যায় তখন রাত হয়। এর জন্য পৃথিবীকে গোল হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। একটি সমতল ঘরের ভেতরেও যদি আপনি একটি লাইট জ্বালান ও নেভান, তবে আলো ও অন্ধকারের পর্যায়ক্রমিক আগমন ঘটবে। প্রাচীন আরবের মানুষ চাক্ষুষ যা দেখত—দিনের পর রাত আসা—কুরআন ঠিক সেটাই বর্ণনা করেছে, এর পেছনে কোনো লুকানো আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নেই।

১৪. ‘লাফজ বা রূপক’ (Metaphorical Language) এর গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, এটি একটি হেদায়েতের বই। এখানে পৃথিবীকে বিছানা বা কার্পেট বলা হয়েছে কাব্যিক ও রূপক অর্থে (Metaphor), যাতে মানুষ সহজে বুঝতে পারে যে পৃথিবী তাদের জন্য বসবাসের যোগ্য। এর আক্ষরিক বা ভৌগোলিক অর্থ নেওয়া যাবে না।”

খণ্ডন: এই অজুহাতটি টিকত যদি কুরআন কেবল এক বা দুই জায়গায় রূপক ব্যবহার করত। কিন্তু কুরআন যখন পৃথিবীর সৃষ্টিতত্ত্ব, পাহাড়ের কাজ, আকাশের ছাদ এবং সূর্য-চন্দ্রের গতিপথ নিয়ে ডজন ডজন আয়াত নাজিল করে, তখন সেটাকে “কাব্যিক রূপক” বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কুরআন যেখানেই পৃথিবীর আকৃতি নিয়ে কথা বলেছে, সেখানেই সমতলবাচক শব্দ (বিছানা, মেঝে, দোলনা, কার্পেট, সমতল পৃষ্ঠ) ব্যবহার করেছে। একটিবারের জন্যও কোনো গোলকবাচক শব্দ ব্যবহার করেনি।

সবচেয়ে বড় কথা, ওহী যদি দাবি করে যে এটি একজন সর্বজ্ঞানী ঈশ্বরের বাণী, তবে তিনি এমন বিভ্রান্তিকর ‘রূপক’ কেন ব্যবহার করবেন যা মানুষের মনে ভুল বৈজ্ঞানিক ধারণার জন্ম দেয়? এবং যা পড়ার পর ইসলামের প্রথম ১০০০ বছরের সমস্ত বড় বড় তাফসীরকারক ও সাহাবারা বিশ্বাস করে গেছেন যে পৃথিবী সমতল? ঈশ্বরের রূপক কি মানুষকে জ্ঞান দেওয়ার বদলে উল্টো কুসংস্কারের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য?

১৫. ইবনে হাজম বা ইবনে তাইমিয়াহর ফতোয়ার গোঁজামিল ও খণ্ডন:

গোঁজামিল: “প্রাচীন যুগের বিখ্যাত মুসলিম স্কলার ইবনে হাজম এবং ইবনে তাইমিয়াহ ফতোয়া দিয়েছেন যে মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) অনুযায়ী পৃথিবী গোল। সুতরাং, ইসলাম তো ১০০০ বছর আগেই পৃথিবীকে গোল বলে স্বীকার করেছে, তাহলে কুরআন সমতল বলে কীভাবে?”

খণ্ডন: এটি ইসলামের ইতিহাসের একটি চতুর ‘অর্ধ-সত্য’ বা প্রেক্ষাপটহীন উপস্থাপন। প্রথমত, ইবনে হাজম (১১ শতক) বা ইবনে তাইমিয়াহ (১৩ শতক) যখন পৃথিবীকে গোল বলেছিলেন, তখন মুসলিম বিশ্বে গ্রিক বিজ্ঞান ও দর্শনের (অ্যারিস্টটল ও টলেমির বইপত্রের) অনুবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গ্রিকদের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন যে পৃথিবী গোল। এই মুসলিম স্কলাররা তখন বিজ্ঞানের সাথে কুরআনকে মেলাতে গিয়ে জোরপূর্বক কুরআনের আয়াতগুলোর ‘তাউইল’ বা রূপক ব্যাখ্যা করা শুরু করেন।

দ্বিতীয়ত, তাদের এই ‘গোল পৃথিবী’র দাবি কিন্তু ইসলামের আদি যুগের সাহাবা, তাবেয়ী বা প্রাথমিক তাফসীরকারকদের (যেমন ইমাম তাবারী বা জালালাইন) মত ছিল না। ইসলামের প্রথম কয়েক শতকের মূল স্কলাররা সমতল পৃথিবীতেই বিশ্বাস করতেন। ইবনে তাইমিয়াহরা যখন বিজ্ঞানের চাপে পৃথিবীকে গোল মানতে বাধ্য হন, তখন তারা কুরআনের আক্ষরিক অর্থ ত্যাগ করে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দাঁড় করান। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারকে ইসলামের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে, সেটাকে “ইসলামের নিজস্ব আবিষ্কার” বলে দাবি করা এক ধরনের ঐতিহাসিক চাতুর্য।

অথচ কুরআনের হাজার বছর পূর্বে গ্রিকরা প্রমাণ করেছিলো পৃথিবী সমতল নয়

কুরআন রচনার এবং ইসলামের বহু শতাব্দী পূর্বে, এমনকি নবী মুহাম্মদের জন্মের হাজার বছর আগেই প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও নাবিকেরা কেবল পৃথিবী গোল হওয়ার কথা জানতেনই না, বরং তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণও করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বিজ্ঞানী পিথাগোরাস প্রথম পৃথিবীর গোলাকারত্ব নিয়ে গাণিতিক ধারণা দেন এবং পরবর্তীতে দার্শনিক অ্যারিস্টটল খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ অব্দে তিনটি অকাট্য চাক্ষুষ প্রমাণ হাজির করেন—

প্রথমত, চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়া সবসময় বৃত্তাকার বা গোল পড়ে, যা কেবল গোল বস্তুর পক্ষেই সম্ভব; দ্বিতীয়ত, উত্তর বা দক্ষিণে ভ্রমণ করলে দিগন্তে সম্পূর্ণ নতুন নতুন নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে, যা সমতল পৃথিবীতে অসম্ভব; এবং তৃতীয়ত, সমুদ্রের দিগন্ত থেকে কোনো জাহাজ যখন তীরের দিকে আসে, তখন প্রথমে তার মাস্তুলের উপরিভাগ এবং পরে পুরো জাহাজটি দৃশ্যমান হয়। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ২৪০ অব্দে বিজ্ঞানী ইরাটোস্থেনিস মিশরের সুয়েন এবং আলেকজান্দ্রিয়া শহরের একই সময়ে সূর্যের আলোর কোণের পার্থক্য মেপে জ্যামিতিক পদ্ধতিতে পৃথিবীর পরিধি (Circumference) প্রায় নিখুঁতভাবে গণনা করে ফেলেন।

অর্থাৎ, আরবের মরুভূমিতে যখন সমতল পৃথিবীর আদিম লোকগাথা বিশ্বাস করা হতো, তার অন্তত ৮০০ থেকে ১০০০ বছর আগেই গ্রিক সভ্যতায় গোল পৃথিবী একটি প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য ছিল, যা স্পষ্ট করে দেয় যে গোল পৃথিবীর ধারণাটি কোনো ঐশী ওহীর অলৌকিকত্ব নয়, বরং প্রাচীন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্যামিতিক দক্ষতারই ঐতিহাসিক ফসল।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:

ইসলামের ইতিহাস, ক্লাসিক্যাল তাফসীর এবং ওহীর ভাষাতাত্ত্বিক ও জ্যামিতিক বিশ্লেষণ একথাই প্রমাণ করে যে—কুরআন ও হাদিসের রচয়িতারা সপ্তম শতকের সাধারণ মানুষের চিরচেনা সমতল পৃথিবীর বৈশ্বিক মডেলের বাইরে কিছুই জানতেন না। কাবার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া, বাইতুল মামুরের অবস্থান, আল্লাহর আসমানে নেমে আসা, কিংবা শয়তানের শিংয়ের সাথে সূর্যের উদয়-অস্ত—এই সব কটি মৌলিক ইসলামি ধারণা কেবল একটি স্থির ও সমতল পৃথিবীর ওপর ভিত্তি করেই টিকে থাকতে পারে।

আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এসে প্রাচীন আরবের এই ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ভুলগুলোকে অলৌকিক প্রমাণ করার জন্য আধুনিক স্কলাররা যে অবৈজ্ঞানিক শব্দার্থের জاليةতি, ব্যাকরণ বিকৃতি ও সস্তা রূপকের আশ্রয় নেন, তা মুক্তবুদ্ধি ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়।

নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র (প্রকাশনীসহ):

পৃথিবী বিছানা ও সমতল হওয়ার আয়াত: আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারাহ (২): ২২; সূরা আন-নাবা (৭৮): ৬-৭; সূরা আল-গাসিয়াহ (৮৮): ২০ [তাফসীরে জালালাইন]।

সূর্যের আরশের নিচে সেজদা ও উল্টো পথে ফেরা: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৪৮০২, ৩১৯৯।

আল্লাহর প্রথম আসমানে নেমে আসা: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ১১৪৫; সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নং ১৬৫৬।

চারটি নদী জান্নাত থেকে আসার বিবরণ: সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ২৮৯৪; (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নং ৭১০৪।

বাইতুল মামুর কাবার সোজাসুজি ও পাথর পড়ার বিবরণ: তাফসীরে ইবনে কাছীর (সূরা আত-তূর, আয়াত ৪-এর ব্যাখ্যা); সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩২০৭ (মেরাজের অধ্যায়)।

সূর্য উদয়-অস্তের নিষিদ্ধ সময় ও শয়তানের শিং: সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), হাদিস নং ৮২৮; সুনান নাসায়ী, হাদিস নং ৫৬০।

Related Posts

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

যখনই প্রাণের উদ্ভব কীভাবে কোনো অলৌকিক ঈশ্বরের সাহায্য ছাড়াই রাসায়নিক নিয়মে ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করা হয়, তখন ধার্মিকদের তোলা পরবর্তী এবং সর্বশেষ প্রচলিত প্রশ্নটি হয়: “তাহলে এই বিশাল মহাবিশ্ব কোথা থেকে এলো? শূন্য থেকে কি কোনো কিছু এমনি এমনি সৃষ্টি হতে পারে? কোনো না কোনো সৃষ্টিকর্তা বা প্রথম কারণ নিশ্চয়ই থাকতে হবে।” ধার্মিকদের এই আর্গুমেন্টটি দর্শনের ভাষায় ‘ক্যাল্যাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট’ বা কার্যকারণ তত্ত্ব এবং কন্টিনজেন্সি আর্গুমেন্ট নামে পরিচিত। প্রাচীন…

Read more

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া? ধর্মীয় বিতর্কগুলোতে ধার্মিকরা যখনই তাদের ধর্মের সত্যতা প্রমাণে ব্যর্থ হন, তখন একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন:  “তাহলে মানুষ বা প্রাণের সৃষ্টি কীভাবে হলো? কোনো সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কি এত জটিল জীবন তৈরি হওয়া সম্ভব?” ধার্মিকদের এই প্রশ্নের নেপথ্যে কাজ করে আধুনিক জীববিজ্ঞান, রসায়ন এবং বিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব। প্রাচীন ধর্মগুলো দাবি করে এসেছে, কোনো এক ঈশ্বর মাটি থেকে প্রাণীর মূর্তি বা অবয়ব বানিয়ে…

Read more

One thought on “কুরআন অনুযায়ী কি পৃথিবী গোলাকার? সকল গোঁজামিলের জবাব”

  1. ভাই, তবারি ঠিক কোন আয়াতের তাফসিরে পৃথিবীকে সমতল বলেছেন সেটা যদি বলতেন উপকৃত হতাম। তবে জালালাইন ও কুরতুবি যে গোলকের খণ্ডন করেছেন সেটা নিশ্চিত। কুরতুবি জালালাইন থেকেও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে দুই বার গোলকের খণ্ডন করেছেন, চাইলে দেখতে পারেন (১৩:৩, ১৫:১৯ কুরআন ডট কম তাফসীর)।

  2. ইমাম ইবনে জারির আত-তাবারী (র.) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীরে আত-তাবারী’-তে (যার মূল নাম জামি’উল বায়ান ‘আন তা’বীলি আয়িল কুরআন) বেশ কয়েকটি আয়াতের তাফসীরে পৃথিবীর সম্প্রসারণ ও বিছানোর ব্যাখ্যায় সমতল করার বিষয়টি আলোচনা করেছেন।

    এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি আয়াত ও তার ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো:

    ১. সূরা আল-গাশিয়াহ (আয়াত: ২০)

    وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ অর্থ: “এবং পৃথিবীর দিকে, কীভাবে একে সমতল বা বিস্তৃত করা হয়েছে?”

    তাফসীরে তাবারীর ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স:

    ব্যাখ্যা: এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারী (র.) বলেন, “আল্লাহ তাআলা বলছেন, তোমরা কি পৃথিবীর দিকে তাকাও না, কীভাবে একে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সমতল করা হয়েছে (بُسِطَتْ وَمُدَّتْ), যাতে মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু এর ওপর স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস ও চলাফেরা করতে পারে?”

    শব্দ বিশ্লেষণ: আয়াতে উল্লেখিত ‘সুতিহাত’ (سُطِحَتْ) শব্দটি ‘সাতাহ’ (سَطْح) মূলধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ সমতল করা বা বিস্তার করা।

    রেফারেন্স: তাফসীরে আত-তাবারী, ২৪তম খণ্ড, সূরা আল-গাশিয়াহ্, ২০ নম্বর আয়াতের তাফসীর।

    ২. সূরা আর-রা’দ (আয়াত: ৩)

    وَهُوَ الَّذِي مَدَّ الْأَرْضَ অর্থ: “এবং তিনিই সে সত্তা, যিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন।”

    তাফসীরে তাবারীর ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স:

    ব্যাখ্যা: ইমাম তাবারী এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন:

    يَقُولُ تَعَالَى ذِكْرُهُ: وَاللَّهُ الَّذِي مَدَّ الْأَرْضَ، فَبَسَطَهَا طُولًا وَعَرْضًا অর্থ: “আল্লাহ তাআলা বলছেন: এবং আল্লাহই তিনি যিনি পৃথিবীকে প্রসারিত করেছেন, অর্থাৎ তিনি একে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে বিছিয়ে ও সমতল করে দিয়েছেন।”

    রেফারেন্স: তাফসীরে আত-তাবারী, ১৬তম খণ্ড, সূরা আর-রা’দ, ৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

স্রষ্টা কি রাগেন বা খুশি হন? মানুষের বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে দেয়া কতটা যৌক্তিক?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

মহাবিশ্বের উৎপত্তি: পরম কারণ নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম?

প্রাণের উদ্ভব: ঈশ্বর নাকি প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া?

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

​আল্লাহ কেন শিশুদের কষ্ট দেন: ধর্মীয় গোঁজামিলের যৌক্তিক খণ্ডন

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

নবী মুহাম্মদের গাছ বিদ্বেষ: অলৌকিক কাহিনীর অন্তরালে কুসংস্কার ও পরিবেশবিরোধী চেতনা

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন

ইসলামে নারীরা কি আসলেই পুরুষের চেয়ে বেশি সম্পত্তি পায়? ৫টি ভুল ধারণা ও খণ্ডন