কুরআন – সহীহ হাদিস এবং সিরাত পাঠ করলে এমন বহু ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে স্পষ্ট দেখা যায় যে, যখনই নবী মুহাম্মদ কোনো ব্যক্তিগত সংকট, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা নিজস্ব কামনার মুখোমুখি হতেন—ঠিক তখনই অলৌকিক সমাধান হিসেবে কোরআনের আয়াত নাজিল হতো।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী এগুলোকে ‘ঐশ্বরিক নির্দেশ’ হিসেবে দেখা হলেও, নিরপেক্ষ ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রশ্ন জাগে—এগুলো কি আসলেই স্রষ্টার বাণী ছিল, নাকি নিজের সুবিধা ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য তৈরি করা সাময়িক সমাধান? স্বয়ং তাঁর প্রিয় স্ত্রী আয়েশা (রা.)-র একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য এই সন্দেহের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
নিচে কুরআন, সহীহ হাদিস ও সিরাতের আলোকে এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরা হলো, যেখানে ওহীর সুবিধাজনক টাইমিং ও ব্যক্তিগত স্বার্থের স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়।
১. আয়েশা (রা.)-র সেই ঐতিহাসিক ক্ষোভ, সন্দেহ ও সম্পর্কিত আয়াত
নবী মুহাম্মদের সমসাময়িক যুগে এমন কিছু নারী ছিলেন যারা নিজেদের কোনো মোহরানা বা শর্ত ছাড়াই নবীর কাছে আত্মনিবেদন (হিবা) করতেন। সাধারণ নারীদের এভাবে পুরুষের কাছে নিজেদের সমর্পণ করা দেখে আয়েশা (রা.) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন—
“কোনো নারীর কি লজ্জা করে না যে সে নিজেকে একজন পুরুষের কাছে সমর্পণ করে?”
কিন্তু সাধারণ মুসলিমদের জন্য মোহরানা প্রদান বাধ্যতামূলক হলেও, কেবল নবীর জন্য এই নিয়ম শিথিল করে ওহী নাজিল হয়:
“হে নবী, আমি আপনার জন্য বৈধ করেছি… এমন যেকোনো মুমিন নারীকে, যে নিজেকে নবীর কাছে নিবেদন করে এবং নবী তাকে বিয়ে করতে চান—এটি কেবল আপনার জন্য বিশেষ সুবিধা, অন্য মুমিনদের জন্য নয়।”
— সূরা আল-আহযাব: ৫০পরবর্তীতে যখন একের পর এক আয়াত নাজিল হয়ে নবীর ইচ্ছামতো স্ত্রী নির্বাচন, যেকোনো স্ত্রীকে বাদ দিয়ে অন্য স্ত্রীর কাছে যাওয়ার অধিকার (সূরা আহযাব: ৫১) এবং এসব বিশেষ বিবাহাধিকার দেওয়া হচ্ছিল, তখন আয়েশা (রা.) আর নিজের বিস্ময় ও ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি। তিনি সরাসরি নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:
“আমি তো দেখছি আপনার রব স্রেফ আপনার মনপূত ইচ্ছা পূরণ করতেই তড়িঘড়ি করেন!”
— সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৪৭৮৮আয়েশার এই তীব্র ক্ষোভ ও বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, তৎকালীন সময়ে নবীর একদম কাছের মানুষও ওহীর এই ‘সুবিধাজনক টাইমিং’ ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি নিয়ে কতটা সচেতন ছিলেন।
২. নিজের ব্যক্তিগত কামনার কারণে মানবিক দত্তক প্রথা বিলুপ্ত করতে ওহি ও পরবর্তী সামাজিক বিপর্যয়
প্রাচীন আরবের ‘দত্তক প্রথা’ ছিল এক দারুণ মানবিক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন পিতৃহীন শিশুরা পরিবার ও বংশপরিচয় পেত, অন্যদিকে সন্তানহীন ও বন্ধ্যা পিতা-মাতারাও কোলজুড়ে সন্তান লাভের আনন্দ পেতেন। কিন্তু নবীর পালক পুত্র জায়েদের সুন্দরী স্ত্রী জয়নব বিনতে জাহাশের প্রতি নবীর আকর্ষণ তৈরি হলে এই সুন্দর প্রথাটিই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আরবে পালক পুত্রের প্রাক্তন স্ত্রীকে বিয়ে করা ছিল জন্মদাতা সন্তানের স্ত্রীকে বিয়ে করার মতোই চরম সামাজিক অপরাধ।তাই সামাজিক লোকলজ্জার ভয় কাটাতে এবং নিজের পথ পরিষ্কার করতে ওহী নাজিল করা হয়:
“আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার ওপর অনুগ্রহ করেছেন, তাকে যখন বলছিলেন: তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রাখো… তখন আপনি মানুষের ভয়ে তা মনে গোপন করছিলেন… অতঃপর জায়েদ যখন তার সাথে সম্পর্ক শেষ করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ করলাম…”
— সূরা আল-আহযাব: ৩৭নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা মেটাতে এক ওহীতেই এই মানবিক প্রথাটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হলো এবং পালক সন্তানদের ক্ষেত্রে পিতার নাম ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হলো (সূরা আহযাব: ৫)।
পরবর্তী সামাজিক সংকট ও বয়স্ক স্তন্যপান:
আইনটি বাতিলের পর ঘরে ঘরে চরম সংকট দেখা দেয়। যে পালক সন্তান বা পিতাকে এতদিন পরম আপন ভাবা হতো, তারা রাতারাতি পরপুরুষ ও বেগানা নারী হয়ে যায়। এই অস্বাভাবিক জটিলতা সামাল দিতে নবী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মাহরাম বানাতে স্তন্যপান করানোর নির্দেশ দেন (রেজাআতুল কাবীর), যাতে স্তন থেকে দুধ চুষিয়ে কৃত্রিম দুগ্ধ-সম্পর্ক বানিয়ে পর্দার বিধান শিথিল করা যায়।
ছাগলে খাওয়া ও কোরআন থেকে বাদ পড়া:
বয়স্ক পুরুষকে স্তন্যপান করানো এবং ব্যভিচারের সাজা সম্পর্কিত ‘রজমের আয়াত’—এই দুটো বিধানের লিখিত কপি আয়েশা (রা.)-র ঘরে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা ছাগলে খেয়ে ফেলে। যার ফলে আয়াতগুলো কোরআন থেকে বাদ পড়ে গেলেও নিয়মগুলো সহীহ হাদিসে সংরক্ষিত থেকে যায় (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৯৪৪)।
একটি সুন্দর ও মানবিক সামাজিক প্রথাকে স্রেফ নিজের ইচ্ছার বলি বানিয়ে বাতিল করা এবং পরবর্তীতে তা সামলাতে এমন নিয়ম তৈরি করা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, ওহীর এই ব্যবহার জনকল্যাণে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্যই হয়েছিল।
৩. অতিথিদের খোশগল্প ও দ্রুত যৌনাচারের সুবিধার্থে ওহী
পালকপুত্রের স্ত্রী জয়নব বিনতে জাহাশকে বিয়ের পর নবী সাহাবীদের সান্ধ্যকালীন নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পরও কিছু সাহাবী নবীর ঘরে বসে খোশগল্প করছিলেন। নবী বারবার ঘরে ঢুকছেন আর বের হচ্ছেন, কিন্তু সাহাবীরা উঠছিলেন না। নতুন স্ত্রীর সাথে সহবাসের তাগিদ থাকা সত্ত্বেও তিনি মুখে কিছু বলতে লজ্জা পাচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই নবীর সহবাস ত্বরান্বিত করতে নাজিল হয় কুরআনের আয়াত :
“হে মুমিনগণ, তোমরা নবীর ঘরে প্রবেশ করো না… আর খাওয়া শেষ হলে স্রেফ ছড়িয়ে পড়ো, কথাবার্তায় মজে থেকো না। কারণ এটি নবীকে কষ্ট দেয়, আর সে তোমাদের বলতে লজ্জা পায়। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে লজ্জা পান না…”
— সূরা আল-আহযাব: ৫৩ (রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৪৭৯১)একটি সাধারণ পারিবারিক আড্ডা শেষ করানোর মতো তুচ্ছ ঘটনার জন্যও কায়েনাতের স্রষ্টাকে আয়াত নাজিল করতে হয়েছিল, ভাবা যায়!
৪. স্ত্রীদের জন্য পুনর্বিবাহের নিষেধাজ্ঞা; যৌবনের ওপর চিরস্থায়ী শৃঙ্খল ও চরম স্ববিরোধিতাপূর্ণ আয়াত:
নবী মুহাম্মদ নিজে তাঁর জীবদ্দশায় যা যা ভোগ করার—ইচ্ছামতো একের পর এক বিয়ে, যুদ্ধবন্দী দাসী সহবাস এবং বিশেষ ওহীর মাধ্যমে হীবা প্রথার সুবিধা—তার সবই আমৃত্যু উপভোগ করে গেছেন। কিন্তু নিজের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদের যেন অন্য কোনো পুরুষ স্পর্শ বা বিয়ে করতে না পারে, সেজন্য সূরা আল-আহযাবের ৫৩ নম্বর আয়াতে বিশেষ ‘ওহী’ নাজিল করে তাঁদের ওপর আমৃত্যু নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সেখানে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, নবীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদের কখনো বিয়ে করা বৈধ নয় এবং এটি আল্লাহর কাছে চরম গুরুতর অপরাধ।
এই সিদ্ধান্তটির ভেতরের চরম নিষ্ঠুরতা ও নৈতিক স্ববিরোধিতা বোঝার জন্য নবীর মৃত্যুর সময় তাঁর স্ত্রীদের বয়সের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন আয়েশার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর, সাফিয়ার ২১ বছর, জুয়াইরিয়ার ২৩ বছর এবং হাফসার বয়স ছিল ২৬ বছর। যৌবনের প্রারম্ভে থাকা এই তরুণী নারীদের সারা জীবনের জন্য প্রেম, যৌনতা, নতুন সংসার ও মাতৃত্বের মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করে দেওয়া হয়। আয়েশার মতো তরুণীকে তাঁর জীবনের পরবর্তী প্রায় ৪০ বছর বাধ্য হয়ে একাকী কাটাতে হয়েছিল।
অনেক ধর্মতাত্ত্বিক এই সিদ্ধান্তকে ঢাকতে দাবি করেন যে, নবীর স্ত্রীরা ছিলেন ‘উম্মুল মুমিনীন’ (বিশ্বাসীদের মাতা) এবং তাঁদের ও নবীর মর্যাদা রক্ষার্থেই এই পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘সম্মানের’ দোহাই দিয়ে কোনো সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া আসলে সম্মানের মোড়কে এক ধরনের চরম নির্যাতন।
যদি পুনর্বিবাহ করলে সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—প্রথম স্ত্রী খাদিজার মৃত্যুর পর নবী মুহাম্মদ নিজে কেন একের পর এক নতুন বিয়ে করলেন এবং দাসী সম্ভোগ করলেন? খাদিজার মর্যাদা কি মুহাম্মদের চেয়ে কম ছিল? যদি মর্যাদা রক্ষার্থেই পুনর্বিবাহ বন্ধের নীতি হতো, তবে খাদিজার মৃত্যুর পর মুহাম্মদের জন্যও তো পুনর্বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত ছিল! সর্বকালের সবচেয়ে ‘মর্যাদাবান’ ব্যক্তি হয়েও তিনি নিজে যদি খাদিজার মৃত্যুর পর একের পর এক নতুন নারী গ্রহণ করতে পারেন এবং তাতে খাদিজার মর্যাদায় টান না পড়ে, তবে তাঁর মৃত্যুর পর কেবল তরুণী স্ত্রীদের বেলাতেই কেন ‘মর্যাদার দোহাই’ দিয়ে পুনর্বিবাহের পথ বন্ধ করা হলো?
এখানে আরও এক গভীর স্ববিরোধিতা ও প্রশ্ন জাগে নবীর নিজের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে। নবীর মতো একজন সম্মানিত ব্যক্তি যখন একাধিক দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখেন, কিংবা সমাজে বিতর্কের ঝড় তুলে নিজের পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করেন—তখন কি তাঁর মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় না? নবীর মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব কি আল্লাহর সবচেয়ে বেশি ছিল না?
যদি মর্যাদা ও ভাবমূর্তি রক্ষাই প্রধান লক্ষ্য হতো, তবে খাদিজার মৃত্যুর পর নবীর নিজেরই তো আর কোনো বিয়ে না করা কিংবা দাসী ভোগ ও পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকা উচিত ছিল। তা করলে তো তৎকালীন মদীনার হুয়াই ইবনে আখতাবের মতো ইহুদি নেতারা কিংবা সমালোচকরা তাঁকে ‘নারীলোভী’ বা কামাসক্ত বলে আখ্যা দেওয়ার এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে আঙুল তোলার কোনো সুযোগই পেত না! নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জায়গায় অফুরন্ত সুযোগ গ্রহণ করা হলো, অথচ মৃত্যুর পর সেই ‘মর্যাদার দোহাই’ চাপিয়ে দেওয়া হলো শুধুই অল্পবয়সী স্ত্রীদের ওপর।
এখানে আরও এক স্পষ্ট ভণ্ডামি হলো—নিজের বেলায় রক্তের সম্পর্ক না থাকার দোহাই দিয়ে দত্তক প্রথা তুলে দিয়ে নিজ পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা হলো, অথচ নিজের মৃত্যুর পর তরুণী স্ত্রীদের আটকানোর জন্য কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তাদের বানিয়ে দেওয়া হলো পুরো জাতির “পাতানো মা”! নিজের সুবিধামতো নীতি বানানো এবং নিজের সুবিধাতেই নীতি উল্টে দেওয়ার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর হতে পারে না। আরও একটি প্রশ্ন হলো, কোনো পরিবারে বা সম্পর্কে নারী যদি ‘মা’ হন, তবে যুক্তি ও সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়মে তাঁর স্বামী হবেন সকলের ‘পিতা’। কিন্তু মজার বিষয় হলো, কুরআন মুহাম্মদকে মুমিনদের ‘পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
কুরআনের সূরা আল-আহজাবের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
”মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।”
অর্থাৎ, নিজের বেলায় অফুরন্ত যৌন সুবিধা রাখা আর নিজের মৃত্যুর পর অল্পবয়সী স্ত্রীদের পুনর্বিবাহ বন্ধে পাতানো মা বানিয়ে সারা জীবনের জন্য বঞ্চিত করা মূলত একনায়কতান্ত্রিক ঈর্ষাপরায়ণতা ও চরম দ্বিচারিতারই প্রকাশ।
৫. দাসী সহবাস করতে গিয়ে ধরা পড়া; কসম ভাঙার ও অল্লাহকর্তৃক স্ত্রীদের তালাকের হুমকির আয়াত
নবী মুহাম্মদের মিসরীয় দাসী ছিলেন মারিয়া কিবতিয়া। স্ত্রী হাফসা (রা.)-র অনুপস্থিতিতে তাঁর ঘরে ও তাঁর বিছানায় নবী মারিয়া কিবতিয়ার সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। হঠাৎ হাফসা ঘরে ফিরে এসে নিজ বিছানায় এই ঘটনা দেখে ফেলেন এবং চরম ক্ষুব্ধ হন। হাফসাকে শান্ত করতে এবং এই কেলেঙ্কারি ঢাকতে নবী শপথ (কসম) করেন যে, তিনি আর কখনো মারিয়ার সাথে সহবাস করবেন না বা মারিয়াকে নিজের জন্য হারাম করে নিলেন। একইসাথে তিনি হাফসাকে এই গোপন ঘটনা আয়েশাসহ অন্য কারও কাছে প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
কিন্তু হাফসা তা গোপন না রেখে আয়েশাকে জানিয়ে দিলে নবীর ঘরে প্রবল অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ইসলামি গবেষক ও বিশ্লেষকদের সবচেয়ে শক্তিশালী মতামত অনুযায়ী, কসম ভাঙা ও স্ত্রীদের এই ক্ষোভ সামাল দিতেই সূরা তাহরীম নাজিল হয়। (যদিও অনেক মুসলিম ব্যাখ্যাকার এটিকে স্রেফ ‘মধুপান’ করার ঘটনা বলে হালকা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু সীরাত ও ঐতিহাসিক বিবরণ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে নিছক মধু খাওয়ার মতো তুচ্ছ বিষয়ে এত বড় পারিবারিক ও ঐশ্বরিক তোলপাড় হওয়ার যুক্তি নেই; মূল ঘটনা ছিল দাসী মারিয়া কিবতিয়ার সাথে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিই এবং সহিহ হাদিসটি থেকে তা একদম স্পষ্ট হয়ে যায়।
সহীহ নাসায়ী (হাদিস নম্বর ৩৯৫৯): আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীর একটি দাসী ছিল, যার সাথে তিনি সহবাস করতেন। আয়েশা ও হাফসা (রা.) এই নিয়ে তার পেছনে লেগে থাকলে নবী ঐ দাসীকে নিজের জন্য হারাম করেন। তখন আল্লাহ সূরা তাহরীমের ১নং আয়াত নাজিল করেন—”হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, আপনি তা কেন হারাম করছেন?”
নিজের করা দাসী সহবত না করার কসম ভাঙতে এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ঢাকতেই এই আয়াত নাযিল হয়।
এমনকি আয়েশা ও হাফসাসহ অন্য স্ত্রীদের সোজা করতে এবং নবীর ওপর চাপ সৃষ্টি বন্ধ করতে ওহীর মাধ্যমে স্বয়ং স্রষ্টাকে দিয়ে তালাকের সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়:
“নবী যদি তোমাদের তালাক দেন, তবে তাঁর রব শীঘ্রই তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে এমন স্ত্রী দান করবেন যারা তোমাদের চেয়ে উত্তম হবে…”
— সূরা আত-তাহরীম: ৫
৬. গনিমতের মাল ও ‘লাল চাদর’ চুরির সন্দেহ ধামাচাপা দিতে ওহী
বদরের যুদ্ধের গনিমতের (যুদ্ধলব্ধ) মালপত্র একত্র করার সময় একটি অত্যন্ত মূল্যবান ‘লাল চাদর’ (ক্বতীফাহ হামরা) হারিয়ে যায়। সাহাবীদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয় এবং অনেকে বলাবলি করতে শুরু করে—হয়তো রাসুলুল্লাহ নিজেই গোপনে চাদরটি নিজের জন্য তুলে নিয়েছেন!
নিজের প্রতি অনুসারীদের এই চুরি বা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার সাথে সাথেই নিজের অবস্থান নিষ্কলঙ্ক করতে ওহী নাজিল হয়:
“কোনো নবীর পক্ষে সম্ভব নয় যে সে আত্মসাৎ বা খিয়ানত করবে…”
— সূরা আল-ইমরান: ১৬১ (রেফারেন্স: সুনান আবু দাউদ ৩৯৭১, তিরমিজী ৩০০০)
৭. যুদ্ধে প্রতিপক্ষের গাছ পোড়ানো ও পরিবেশ ধ্বংসের বৈধতা দিতে ওহী
বানু নাযীর নামক ইহুদি গোত্রকে অবরুদ্ধ করার সময় তাদের অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে দিতে নবী তাদের মূল্যবান ও ফলবন্ত ‘লাইনা’ খেজুর গাছ কাটার ও জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তৎকালীন আরবে যুদ্ধের সময়ও ফলজ গাছ কাটা নিষিদ্ধ ছিল, তাই সাহাবীরা এই পরিবেশ ও সম্পত্তি ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং কিছু সাহাবি বলেন এসব বাগান তো আমাদের দখলেই আসবে, নষ্ট করে লাভ কি!
সাহাবীদের মুখ বন্ধ করতে সঙ্গে সঙ্গে আয়াত নাজিল হয়:
“তোমরা যে নরম খেজুর গাছগুলো কেটেছ কিংবা যেগুলো কাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ, তা তো আল্লাহর অনুমতিতেই হয়েছে…”
— সূরা আল-হাশর: ৫
৮. বিবাহিত যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথে সহবাসে সাহাবীদের অপরাধবোধ দূরীকরণ
আওতাসের যুদ্ধে (হুনাইনের যুদ্ধের অংশ) বিজয়ের পর কাফেরদের বহু নারী মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়। তবে ওসব নারীদের মুশরিক স্বামীরা জীবত থাকায় সাহাবীরা সেই বন্দী নারীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে চরম ইতস্তত ও দ্বিধাবোধ করছিলেন।সাহাবীদের এই নৈতিক বাধা ও মানসিক অপরাধবোধ দূর করে বিবাহিত যুদ্ধবন্দী নারীদের সাথেও যৌন সম্পর্ককে বৈধ ও সুগম করতে তৎক্ষণাৎ ওহী নাজিল করা হয়:
“এবং নারীদের মধ্যে যারা সধবা (বিবাহিত), তারা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ—তবে তোমাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে (যুদ্ধবন্দী দাসী) তারা ছাড়া। এটি তোমাদের জন্য আল্লাহর বিধান।”
— সূরা আন-নিসা: ২৪
এই বিষয়টি কেবল ব্যাখ্যার বিষয় নয়, বরং তাওহীদ পাবলিকেশন কর্তৃক প্রকাশিত সহীহ মুসলিম হাদীসে এই ওহী নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট একদম স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে:
সহীহ মুসলিম (তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদীস নম্বর ৩৫৭৩/১৪৫৬):
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, হুনাইনের যুদ্ধের দিন রসূলুল্লাহ অওতাস অভিমুখে এক সৈন্যদল প্রেরণ করেন। তারা শত্রুপক্ষের মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে এবং বহু বন্দী হস্তগত করে। কিন্তু রসূলুল্লাহর কয়েকজন সাহাবী বন্দী নারীদের সাথে সহবাস করাকে অপরাধ মনে করছিলেন, কারণ তাদের মুশরিক স্বামীরা তখনও জীবিত ছিল। তখন আল্লাহ তাআলা মহাগ্রন্থ কুরআনের এই আয়াত নাজিল করেন: “এবং নারীদের মধ্যে যারা সধবা, তারা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ—তবে তোমাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে তারা ছাড়া।” অর্থাৎ স্বামী জীবিত থাকা সত্ত্বেও এরা তাদের হস্তগত হওয়ার মাধ্যমে তাদের জন্য হালাল হয়ে গেছে।ইসলামি আইন অনুযায়ী এই এক আয়াতের মাধ্যমে বন্দী হওয়া মাত্রই ঐ নারীদের আগের সমস্ত বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং তাদের অমতে বা অনিচ্ছাতেও বিজয়ী পুরুষদের জন্য তাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করা বৈধ হয়ে পড়ে।
৯. একান্তে কথা বলার জন্য সাহাবীদের ওপর ফি (ট্যাক্স) ধার্যের আয়াত
সাহাবীরা প্রায়ই ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে নবীর কাছে এসে একান্তে দীর্ঘ সময় কথা বলতেন, যা সামাল দেওয়া নবীর জন্য বিরক্তিকর ও কঠিন হয়ে উঠেছিল। এই আনাগোনা ও দীর্ঘ আলাপ কমাতে হঠাৎ ওহীর মাধ্যমে একান্তে কথা বলার আগে অর্থ প্রদান বা ‘সদকা’ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়:
“হে মুমিনগণ, তোমরা যখন রসূলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাও, তার আগে কিছু সদকা প্রদান করো…”
— সূরা আল-মুজাদালাহ: ১২
ওহীর এই অদ্ভুত নিয়মের পর দেখা গেল ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সাহাবীরা পয়সা খরচের ভয়ে নবীর সাথে একান্তে কথা বলাই বন্ধ করে দেন। বর্ণনা অনুযায়ী, একমাত্র আলী (রা.) ছাড়া আর কোনো সাহাবী এই ফি দিয়ে একান্তে কথা বলার সাহস বা সামর্থ্য দেখাননি। ফলে নবীর সাথে অনুসারীদের এক ধরনের সামাজিক দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।
যখন দেখা গেল এই নিয়মটি কার্যকর করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগই স্থবির হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই চরম তড়িঘড়ি করে পরবর্তী আয়াতেই (সূরা মুজাদালাহ: ১৩) আগের আদেশটি মনসূখ বা বাতিল করে দেওয়া হয়। এক আয়াত পরেই বলা হয়—যদি সদকা দিতে না পারো তবে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করলেন, এখন সালাত কায়েম করো ও যাকাত দাও!
একটি নীতি ওহী হিসেবে নাজিল করা, সাহাবীরা
অর্থের ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে আবার পরক্ষণেই সেই ওহী বাতিল করে দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট করে যে এটি কোনো মহাজাগতিক বা চিরন্তন ঐশ্বরিক পরিকল্পনা ছিল না; বরং সাময়িক পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে তড়িঘড়ি নেওয়া এক চরম অসফল ও সুবিধাজনক পদক্ষেপ ছিল।
১০. আয়েশার বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগের আয়াত (ইফকের ঘটনা)
বনু মুস্তালিকের যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে আয়েশা কাফেলা থেকে পিছিয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে সফওয়ান ইবনুল মুয়াত্তাল নামক এক তরুণ সাহাবীর সাথে পরদিন সকালে মদিনায় পৌঁছান। এতে মদিনায় আয়েশার চরিত্র নিয়ে তীব্র গুঞ্জন ও ব্যভিচারের অভিযোগ ওঠে। নবী মুহাম্মদ এই ঘটনায় গভীরভাবে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন যে আয়েশা সত্যিই পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছেন কি না। এমনকি আলি এবং সাবিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীরাও আয়েশার বিরুদ্ধে চলে যায়। এমনকি এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাহাবীদের দুপক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা, মারামারি ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রশ্ন জাগে, যদি কোরআন সর্বজ্ঞানী সত্তার ওহীই হতো, তবে কোনো বিলম্ব ছাড়াই সাথে সাথে আয়াত নাজিল করে এই পারিবারিক ও সামাজিক কলহ থামিয়ে দেওয়া হলো না কেন?
দীর্ঘ এক মাস ওহী না আসার আসল রহস্য ছিল নবী একটি সুনির্দিষ্ট শারীরিক প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করছিলেন—তা হলো আয়েশার মাসিক (ঋতুস্রাব) বন্ধ হয়েছে কি না। এক মাস পর আয়েশার মাসিক স্বাভাবিক হতে দেখে নবী নিশ্চিত হন তিনি গর্ভবতী নন এবং নিজের ও পরিবারের মান-সম্মান বাঁচাতে সূরা আন-নূরের ১১ নম্বর আয়াত নাজিল করান: “যারা এই অপবাদ রচনা করেছে, তারা তো তোমাদেরই একটি দল…”।
যদিও মাসিক সাময়িক হওয়া মানেই যে শারীরিক সম্পর্ক হয়নি এমনটি নিশ্চিত নয়। কারণ সাফওয়ান যদি সহবাসের সময় সেকালের বহুল প্রচলিত ‘আজল’ (বীর্য বাইরে ফেলা) করে থাকেন, তবে পরকীয়া হলেও গর্ভধারণ বা মাসিক বন্ধ হওয়ার সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ, দীর্ঘ এক মাস অপেক্ষা করে মান-সম্মান রক্ষার্থে এই ওহী নাজিল করা ছিল মূলত নিজ পরিবারের সম্মান রক্ষার কৌশল।
১১. আপন চাচার প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ, অকৃতজ্ঞতা ও অভিশাপ
নবী মুহাম্মদের জন্মের পর যে চাচা আনন্দে দাসী মুক্ত করে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন (সীরাত : আর রাহীকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা :৭৬), সেই আপন চাচা আবু লাহাবের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত জুটলো অন্ধ ক্রোধ আর অভিশাপ। ইসলামের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস অনুযায়ী, মুহাম্মদের জন্মসংবাদে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আবু লাহাব তাঁর প্রিয় দাসী সুওয়াইবাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বছর গড়িয়ে যখন সেই ভাইপোই নিজেকে পয়গম্বর দাবি করলেন এবং নিজের নতুন ভাবাদর্শ প্রচার শুরু করলেন, তখন এক পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি হিসেবে আবু লাহাব কেবল একটু কড়া প্রতিবাদ ও সমালোচনা করেছিলেন।
অথচ সামান্য সামাজিক বিরোধিতা ও কড়া কথা সহ্য করতে না পেরে, একজন মুরুব্বি চাচার বিগত জীবনের সমস্ত স্নেহ-ভালোবাসাকে এক নিমেষে মাটিতে পিষে দেওয়া হলো। কোনো বিশ্বজনীন নৈতিক শিক্ষা, ক্ষমা বা মহৎ দর্শনের বার্তা না দিয়ে, স্রেফ আপন চাচা ও তাঁর স্ত্রীর ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ ও তীব্র অভিশাপ বর্ষণ করে মহাজাগতিক বাণী হিসেবে পুরো একটি সূরা নাজিল করানো হলো:
“আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক… আর তার স্ত্রীও, যে জ্বালানি কাঠ বহনকারী, তার গলদেশে খেজুর গাছের আঁশের রশি।”
— সূরা আল-মাসাদ (লাহাব): ১-৫যে চাচা জন্মের দিনে পরম স্নেহে কোলে তুলে নিয়েছিলেন, তাঁর প্রতি ন্যূনতম কৃপাবোধ বা পারিবারিক সৌজন্যটুকুও দেখানো হয়নি। বিশ্বজগতের মহান সৃষ্টিকর্তা নাকি কেবল একজন বালখিল্য মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়ে এক বৃদ্ধ দম্পতিকে অভিশাপ দিতে, তাঁদের হাত ভেঙে ফেলার প্রার্থনা করতে এবং গলায় রশি বাঁধার গালিগালাজ করতে আয়াত পাঠাচ্ছেন—এটি ভাবতেও অবাক লাগে! আপন চাচার স্নেহের প্রতি এমন চরম অকৃতজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে ঈশ্বরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা মূলত কোনো ঐশ্বরিক মহত্ত্ব নয়, বরং অন্ধ প্রতিশোধপরায়ণতা ও চরম নিষ্ঠুরতারই প্রমাণ।
১২. গনিমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ ও রক্তপাতহীন বিজয়ের ১০০% নিজের দখলে নিতে আয়াত:
যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমতের মাল সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টনের নিয়ম থাকলেও, ওহীর মাধ্যমে বিজিত সম্পদের ২০% (খুমুস) সরাসরি “আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের” জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় (সূরা আল-আনফাল: ৪১)। অন্যদিকে, যেসব অভিযানে কোনো রক্তপাত হতো না বা শত্রু পক্ষ অবরোধ ও আত্মসমর্পণের মুখে জায়গা ছেড়ে পালিয়ে যেত, সেগুলোর ক্ষেত্রে সূরা আল-হাশরের ৬-৭ নম্বর আয়াত নামিয়ে পুরো ১০০% সম্পদকেই ‘ফায়’ ঘোষণা করে নবীর একক ও ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টরা একে রাষ্ট্রীয় বা বায়তুল মালের খরচ বলে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি অসংগত। কারণ, এটি যদি স্রেফ রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক বাজেটই হতো, তবে কোনো ব্যক্তি বা ঈশ্বরের নাম যুক্ত করার প্রয়োজন ছিল না—সোজা “রাষ্ট্রীয় তহবিল” বললেই চলতো। মূলত ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল সিদ্ধান্তের ওপর ঐশ্বরিক সিলমোহর বসিয়ে অনুসারীদের প্রশ্ন করার মুখ বন্ধ রাখতে। বাস্তব প্রমাণ হলো, নবী এসব সম্পদ দিয়ে আগেই নিজ পরিবারের জন্য পুরো এক বছরের খাবার অগ্রিম মজুত রাখতেন এবং স্বগোত্রীয়দের ভাগ দিতেন। এমনকি নবীর মৃত্যুর পর তাঁর কন্যা ফাতেমা এগুলোকে ব্যক্তিগত বাপের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেছিলেন—যা প্রমাণ করে এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছিল না। আর তথাকথিত দারিদ্র্যের যেসব গল্প বলা হয়, তা কেবল এসব খাইবার ও ফাদাকের বিপুল জমিজমা ও সম্পদ পাওয়ার আগের প্রাথমিক সময়ের ঘটনা; বৈভব হস্তগত হওয়ার পর তিনি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচুর্যের মধ্যেই ছিলেন।
উপসংহার
উপরের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো সীরাত ও হাদিসের অকাট্য দলিলে সংরক্ষিত ইতিহাস। যখনই ব্যক্তিগত সুবিধা, যৌন আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক সমালোচনা কিংবা পারিবারিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে, তখনই ওহীর ঢাল ব্যবহার করে সেগুলোকে ঐশ্বরিক রূপ দেওয়া হয়েছে।একটি বৈশ্বিক ধর্মের সৃষ্টিকর্তা কি সত্যি একটি নির্দিষ্ট মানুষের ঘরোয়া আড্ডা থামানো, তাঁর ১৮ বছরের তরুণী স্ত্রীদের আমৃত্যু যৌনতাহীন জীবনে বাধ্য করা, কিংবা তাঁর দাসী ভোগ ও পছন্দের নারীকে বিয়ে করার পথ তৈরি করতে বারংবার আয়াত নাজিল করবেন? নাকি এগুলো ছিল শুধুই ওহীর নাম দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করার একটি চতুর কৌশল? পাঠক হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আপনার।
বি:দ্র: সহিহ হাদিসের রেফারেন্সগুলো তাওহীদ পাবলিকেশন্স থেকে দেয়া।





