ইসলামের বহু শতাব্দী আগেই গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর কিংবা যীশু খ্রীষ্টের মতো প্রাচীন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরা প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি অহিংসা, সমবেদনা ও সহানুভূতির বাণী প্রচার করে গেছেন। কোনো ঐশ্বরিক ওহী বা আসমানী কিতাবের দাবি ছাড়াই, স্রেফ মানবিক বিবেচনা ও বোধশক্তি থেকে তাঁরা প্রতিটি জীবনের বেঁচে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। অথচ এর সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে, নিজেকে মহাবিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তার বার্তাবাহক দাবি করা সত্ত্বেও, নবী মোহাম্মদের বাণীতে আমরা নির্দিষ্ট কিছু প্রাণীর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা ও ঢালাও নিধনের নির্দেশ দেখতে পাই।
নবী মোহাম্মদের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো দূরদর্শী করুণা বা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার লেশমাত্র ছিল না; বরং সাপে কাটার ভয় থেকে সব সাপকে ঢালাওভাবে মারার হুকুম, ইব্রাহিম নবীর আগুনে ফুঁ দেওয়ার মতো এক অবৈজ্ঞানিক পৌরাণিক গল্পের ভিত্তিতে নিরীহ টিকটিকি পিটিয়ে মারলে ‘১০০ পুণ্য’ পাওয়ার ঘোষণা, কুসংস্কারবশত নিরীহ কালো কুকুরকে ‘শয়তান’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করা কিংবা পৃথিবীর বুক থেকে শুকরকে সমূলে নিধন করার মতো তাঁর হিংসাত্মক বাণীগুলো সরাসরি তাঁর গভীর প্রাণীবিদ্বেষকে প্রকাশ করে। এই ব্লগে আমরা সহীহ হাদিসের রেফারেন্সসহ নবী মোহাম্মদের সেই বিতর্কিত নির্দেশনাসমূহ এবং এই বিষয়ে ধর্মীয় অপপ্রচারকারীদের দেওয়া অদ্ভুত গোঁজামিলগুলো ও সেগুলোর অকাট্য খণ্ডনগুলো তুলে ধরবো।
একটি জরুরি দ্রষ্টব্য: ‘তৎকালীন আরবের প্রেক্ষাপট’ ও ইসলামি শরিয়তের শাশ্বত রূপ
এই অমানবিক ও অবৈজ্ঞানিক নির্দেশগুলোর মুখোমুখি হলেই আধুনিক মুসলিমগণ সাধারণত একটি পরিচিত খোঁড়া যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন—“এগুলো তৎকালীন আরবের বিশেষ প্রেক্ষাপটে (Context) সাময়িকভাবে বলা হয়েছিল।”
কিন্তু ইসলামি আকীদা, হাদিসের ভাষা এবং বাস্তব সমাজচিত্রের নিরিখে এই অজুহাতটি একটি বিশাল স্ববিরোধিতা এবং গোঁজামিল মাত্র। কারণ:
- ইসলামের দাবি অনুযায়ী বিধানগুলো শাশ্বত: ইসলামের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হলো—নবী মোহাম্মদের বাণীবদ্ধ শরিয়ত ও সুন্নাহ কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা কালের (Time and Space) ফ্রেমে বন্দি নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত বা সর্বকালের জন্য অপরিবর্তনীয় ও প্রযোজ্য।
- হাদিসের ভাষায় কোনো মেয়াদের উল্লেখ নেই: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্দেশনামূলক হাদিসগুলোর নিজস্ব শব্দ বা ব্যাকরণে কোনো ধরনের সময়সীমা, মেয়াদ বা শর্তের (যেমন: “যতদিন না অমুক পরিস্থিতি তৈরি হবে” বা “শুধুমাত্র মদিনার এই বছরের জন্য”) বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত নেই। আদেশগুলো দেওয়া হয়েছে চিরন্তন, সাধারণ ও স্থায়ী আইন হিসেবে।
- প্রেক্ষাপট দিয়েও জাস্টিফাই করার অযোগ্যতা: কোনো কোনো অপব্যাখ্যাকারী দাবি করতে পারেন যে তৎকালীন আরবের বাস্তবতায় এগুলো ঠিক ছিল। কিন্তু সত্য হলো—সেকালের কোনো সামাজিক বা পরিবেশগত প্রেক্ষাপট দিয়েও এই বর্বরতাকে জাস্টিফাই করা যায় না।কুসংস্কারবশী হয়ে কালো কুকুর হত্যা করা, বাস্তুতন্ত্রের পরম উপকারী সাপ ও নিরীহ টিকটিকি নির্বিচারে নিধন করা, মানুষের বিকৃত অপরাধের জন্য অবলা পশুকে হত্যা করা, এসব সপ্তম শতকেও যেমন চরম ক্ষতিকর ও নীতিহীন ছিল, আজকের দিনেও তা সমান ক্ষতিকর। প্রকৃতির নিয়ম বা নৈতিকতার মৌলিক আদর্শ কোনো কালেই বদলে যায় না।
- বাস্তব প্রয়োগ ও স্কলারদের ঐকমত্য: এটি কেবল কোনো কেতাবি তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও পৃথিবীর কোনো মূলধারার ইসলামি স্কলার বা আলেম কিন্তু এই নির্দেশগুলোকে বাতিল বা সাময়িক বলে ফতোয়া দেননি। সাধারণ মুমিন মুসলিমরা আজও সমান বিশ্বস্ততার সাথে এগুলোকে পালন করে চলেছেন—তারা কালো কুকুরকে অপয়া ভাবছেন, সওয়াবের আশায় টিকটিকি পিটিয়ে মারছেন এবং সাপ দেখলেই অবৈজ্ঞানিক ভয়ে হত্যা করছেন। অর্থাৎ, খোদ মুসলিম উম্মাহর কাছেই এগুলো আজও জীবন্ত ও কার্যকর বিধান।
- ঐশ্বরিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা: যিনি নিজেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার ওহীপ্রাপ্ত বার্তাবাহক দাবি করেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কোনো নির্দিষ্ট শতকের কুসংস্কার ও ভয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকতে পারে না। যদি তাঁর আইনকে আজকের দিনে এসে “তৎকালীন প্রেক্ষাপটের দোহাই” দিয়ে জাস্টিফাই করতে হয়, তবে তা পরোক্ষভাবে এটাই প্রমাণ করে যে—তাঁর এই বিধানগুলো সর্বজনীন বা শাশ্বত নয়, বরং এগুলো ছিল স্রেফ প্রাচীন আরবের পরিবেশ ও মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতা থেকে জন্ম নেওয়া কিছু সাময়িক সামাজিক নিয়ম মাত্র।
অতএব, ঈমান বাঁচানোর তাগিদে “প্রেক্ষাপটের” অজুহাত দেওয়া প্রকারান্তরে ইসলামের নিজস্ব দাবি ও আলেমদের ঐকমত্যকেই বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল। আমরা তাই এই নির্দেশগুলোকে ইসলামের মূল দাবি—অর্থাৎ “সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য শাশ্বত বিধান” হিসেবেই আলোচনা করব।
১. সাপ হত্যার নির্দেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্টের নির্দেশ
হাদিসশাস্ত্রে সাপকে মানুষের চিরশত্রু হিসেবে গণ্য করে দেখামাত্র হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি নামাজের ভেতরে থাকলেও তা জারি রাখার কথা বলা হয়েছে।
হাদিসের রেফারেন্স (তাওহীদ পাবলিকেশনস):
- সহীহ বুখারী (হাদিস নং ১৮১০): রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “তোমরা নামাজের মধ্যেও দুটি কালো বস্তু হত্যা করো: সাপ এবং বিচ্ছু।”
- সহীহ বুখারী (হাদিস নং ৩২৯৭): ইবনু উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সাপ মারার নির্দেশ দিতে শুনেছেন।
- সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ৫৮২৭): রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সাপের প্রতিশোধের ভয়ে তাকে ছেড়ে দিল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
এপোলজিস্টদের গোঁজামিল ও তার অকাট্য খণ্ডন:
ধর্মীয় প্রবক্তারা (এপোলজিস্ট) আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রাণী অধিকারের চপেটাঘাত থেকে বাঁচতে দাবি করেন, “নবী আসলে সব সাপ মারতে বলেননি, তিনি কেবল বিষাক্ত এবং ক্ষতিকারক সাপ মারতে বলেছেন।” এই খোঁড়া যুক্তির চূড়ান্ত খণ্ডন নিচে দেওয়া হলো:
- ভাষাগত ও নির্দেশগত অসাড়তা: হাদিসের কোথাও “বিষাক্ত” বা “ক্ষতিকারক” সাপের শর্ত দেওয়া হয়নি। সেখানে সরাসরি ‘সাপ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। নবীকে যদি মুসলিমরা ওহীপ্রাপ্ত দাবি করে, তবে তাঁর এই সামান্যতম বোধশক্তি থাকার কথা ছিল যে বিষাক্ত আর বিষহীন সাপের মধ্যে পার্থক্য আছে। তাঁর এই ঢালাও বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আরবের সাধারণ মানুষের মতো তাঁরও সাপের প্রকারভেদ নিয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল না।
- ক্ষতি না করলেও মারার নির্দেশ: হাদিসে বলা হয়নি যে “সাপ আক্রমণ করলে তবেই তাকে মারো।” বরং নির্দেশটি সম্পূর্ণ ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা দেখামাত্র খুঁজে বের করে মারার। এমনকি কেউ যদি ভয়ে সাপ ছেড়ে দেয়, তাকে “নবীর দলভুক্ত নয়” বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
- বিজ্ঞানের চোখে সাপের গুরুত্ব ও বিষহীনতা: ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এবং আন্তর্জাতিক সরীসৃপ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৮৫% সাপই সম্পূর্ণ বিষহীন ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় (সূত্র: WHO Snakebite Resource)। সাধারণ মানুষের পক্ষে চট করে বিষাক্ত ও বিষহীন সাপের পার্থক্য বোঝা অসম্ভব। ফলে হাদিসের এই অন্ধ নির্দেশনার কারণে কোটি কোটি নিরীহ ও প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত উপকারী সাপ নির্বিচারে মারা পড়ে।
- মহামারীর ঝুঁকি বৃদ্ধি: সাপ ফসলের ক্ষতিকারক ইঁদুর ও কীটপতঙ্গ খেয়ে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করে। বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো অঞ্চল থেকে সাপ বিলুপ্ত হলে সেখানে ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি ঘটে জ্যামিতিক হারে, যা ফসল ধ্বংস করার পাশাপাশি প্লেগের মতো মহামারী ছড়ানোর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় (সূত্র: The Ecological Importance of Snakes – U.S. National Park Service)। এছাড়া সাপের বিষ থেকেই তৈরি হয় সাপে কাটার প্রতিষেধক (Anti-venom) এবং হার্টের জটিল রোগের ওষুধ।
২. টিকটিকি (গিরগিটি) হত্যা এবং অবৈজ্ঞানিক পুণ্য লাভ
টিকটিকি বা গিরগিটি জাতীয় প্রাণীকে ইসলামের ইতিহাসে ইব্রাহিম নবীর অগ্নিকুণ্ডে ফুঁ দেওয়ার একটি পৌরাণিক গল্পের সাথে জুড়ে দিয়ে হত্যার জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
হাদিসের রেফারেন্স (তাওহীদ পাবলিকেশনস):
- সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ৫৮৪৬): রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে টিকটিকি মারবে, তার জন্য একশত নেকি লেখা হবে…”
- সহীহ বুখারী (হাদিস নং ৩৩০৫): উম্মে শারিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, নবী তাকে টিকটিকি মারার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, “এটি ইব্রাহিমের আগুনে ফুঁ দিয়েছিল।”
ধর্মীয় ব্যাখ্যার খণ্ডন:
এপোলজিস্টরা দাবি করেন টিকটিকি ঘরে নোংরা করে বা জীবাণু ছড়ায়। কিন্তু হাদিসের নিজস্ব বয়ান অনুযায়ী একে মারার কারণ কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি নয়, বরং একটি পৌরাণিক ঘটনা। হাজার বছর আগে একটি প্রাণী আগুনে ফুঁ দিয়েছিল (যা বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিকভাবে অসম্ভব, কারণ একটি ছোট টিকটিকির ফুসফুসের বাতাস বিশাল আগুনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না)—সেই কাল্পনিক অপরাধের জন্য বর্তমানের নিরীহ প্রাণীকে পিটিয়ে মারা এবং তা থেকে ‘পুণ্য’ খোঁজা আধুনিক নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।
বাস্তবে, ঘরোয়া টিকটিকি ও গিরগিটি মূলত মশা, মাছি, মাকড়সা ও অন্যান্য রোগবাহী ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে ঘরের পরিবেশকে প্রাকৃতিক উপায়ে পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর রাখতে সাহায্য করে (সূত্র: Lizards as Natural Pest Control – Agriculture and Natural Resources, University of California)।
৩. কালো কুকুর নিধন ও শয়তানের প্রতীক
সাধারণ কুকুরের ব্যাপারে শিকার বা পাহারার অনুমতি থাকলেও, কালো কুকুরকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নেতিবাচক চোখে দেখা হয়েছে।
হাদিসের রেফারেন্স (তাওহীদ পাবলিকেশনস):
- সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ১০৩২): নবী বলেছেন: “…কালো কুকুর হলো শয়তান।”
- সহীহ মুসলিম (হাদিস নং ৩৮২১): জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদের কুকুর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন… পরবর্তীতে তিনি বলেন, “তোমরা কেবল খাঁটি কালো কুকুর হত্যা করো, কারণ তা শয়তান।”
ধর্মীয় ব্যাখ্যার খণ্ডন:
ধর্মীয় প্রবক্তারা বলেন, কালো কুকুরের মধ্যে জিন বা অপশক্তি ভর করে। এটি একটি সম্পূর্ণ আদিম ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো প্রাণীর গায়ের রঙ কালো বা লাল হওয়ার পেছনে সম্পূর্ণ জিনগত মেলানিন (Melanin) বৈশিষ্ট্য দায়ী, কোনো আধ্যাত্মিক শয়তানি শক্তি নয় (সূত্র: Genetics of Coat Color in Dogs – National Institutes of Health, NIH)। একটি নিরীহ প্রাণীকে কেবল তার গায়ের রঙের কারণে “শয়তান” আখ্যা দিয়ে গণহারে হত্যা করার নির্দেশ কোনোভাবেই আধুনিক যুক্তি ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।
৪. শুকর নিধন ও চরম ঘৃণা
শুকরকে কেবল খাওয়ার জন্যই নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং একে পৃথিবীর বুক থেকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার একটি রণপরিকল্পনা হাদিসে পাওয়া যায়।
হাদিসের রেফারেন্স (তাওহীদ পাবলিকেশনস):
- সহীহ বুখারী (হাদিস নং ২২২২): রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “…অবশ্যই শীঘ্রই তোমাদের মাঝে ইবনু মারইয়াম (ঈসা) ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে অবতীর্ণ হবেন। তিনি ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন এবং শুকর নিধন করবেন…”
ধর্মীয় ব্যাখ্যার খণ্ডন:
এপোলজিস্টরা বলেন শুকর নোংরা। প্রথমত, আধুনিক পশুপালন বিদ্যায় প্রমাণিত যে শুকর অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সামাজিক প্রাণী। সঠিক ও পরিষ্কার পরিবেশে রাখলে এরা মোটেও নোংরা থাকে না।
দ্বিতীয়ত, বন্য শুকর বনের বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরা মাটির নিচে থাকা পচা আবর্জনা ও ফলমূল খেয়ে বনের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে। মাটি খুঁড়ে খাবার খোঁজার মাধ্যমে এরা বনের শক্ত মাটির স্তরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে (Soil Aeration) এবং মলত্যাগের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে বনায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (সূত্র: The Ecological Role of Wild Boars – European Journal of Wildlife Research). শেষ জামানায় এসে পৃথিবীর সমস্ত শুকর পাইকারি হারে মেরে ফেলার ধর্মীয় তত্ত্বটি এক বিশাল পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনবে।
৫. পশুকামিতা এবং নিরপরাধ পশুর মৃত্যুদণ্ড
কোনো মানুষ যদি কোনো পশুর সাথে যৌন সংসর্গ (পশুকামিতা) করে, তবে সেই অপরাধের শাস্তিস্বরূপ ওই নিরীহ পশুটিকেও হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধ করল মানুষ, অথচ অবলা পশুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে—এমন অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর আইন হাদিসগ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।
তাওহীদ পাবলিকেশনসের অনুবাদকৃত সহীহ হাদিসের রেফারেন্স:
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে যৌন মিলন করবে, তাকে হত্যা করো এবং তার সাথে ওই পশুটিকেও হত্যা করো।”
সুনান আবু দাউদ: হাদিস নম্বর ৪৪৬৪ (সহীহ)
সুনান ইবনে মাজাহ: হাদিস নম্বর ২৫৬৪ (সহীহ)
জামে আত-তিরমিজি: হাদিস নম্বর ১৪৫১ (হাসান)
ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টদের প্রচলিত গোঁজামিল:
১. লজ্জা ও কুৎসা এড়ানো: তারা বলেন, পশুর কোনো দোষ নেই ঠিকই, কিন্তু ওই পশুটি বেঁচে থাকলে মানুষ তাকে দেখে অপরাধের কথা স্মরণ করবে এবং সমাজে কুৎসা রটবে। তাই সমাজকে নোংরা আলোচনা থেকে বাঁচাতে পশুকে মেরে ফেলা উত্তম!
২. বিকৃত মাংস থেকে রক্ষা: অনেকে দাবি করেন, মানুষের বীর্য বা সংসর্গের কারণে পশুর মাংস অপবিত্র বা রোগাক্রান্ত হয়ে যেতে পারে, তাই কেউ যেন ভুল করে তা না খায়।
বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক খণ্ডন:
অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীর শাস্তি: আধুনিক আইন ও নৈতিকতার প্রথম পাঠ হলো—অপরাধের শাস্তি কেবল অপরাধীকেই পেতে হবে, কোনো অবস্থাতেই ভুক্তভোগী বা অবোধ জীবকে নয়। পশুটির নিজস্ব কোনো সম্মতি ছিল না। এমতাবস্থায় কেবল “লোকে কথা বলবে”—এই ঠুনকো সামাজিক ওজুহাতে একটি জীবন্ত প্রাণীকে হত্যা করা চরম বর্বরতা।
মাংস অপবিত্র হওয়ার অবৈজ্ঞানিক দাবি: আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, মানুষের সাথে যৌন সংসর্গের কারণে পশুর মাংস বিষাক্ত বা অপবিত্র হয়ে যায় না। এটি সম্পূর্ণ মধ্যযুগীয় কুসংস্কার। তদুপরি, যদি মাংস খাওয়ার আশঙ্কাই মূল কারণ হতো, তবে যে পশু খাওয়া নিষেধ (যেমন গাধা বা কুকুর), সেটির সাথে যৌনচার করলে তাকে কেন হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হলো?
সৃষ্টিকর্তার আইনের দুর্বলতা: যিনি মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তাঁর আইন সমকালীন মানুষের কুৎসা রটানোর ভয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে না। এটি মূলত প্রাচীন আরব সমাজের অনার কিলিং (Honor Killing) মানসিকতারই প্রতিফলন।
যদিও এই হাদিসটি এবং এর হুকুম নিয়ে পরবর্তীকালের ইমামদের মধ্যে নানা মতভেদের ইতিহাস রয়েছে, কিন্তু আধুনিক যুগে এসে এই বিষয়টিকে আড়াল করার চেষ্টা করা যে ইসলামকে বাঁচানোর একটি মরিয়া অপচেষ্টা মাত্র, তা খুব সহজেই বোঝা যায়। কারণ, হাদিসটি মুসলিম সমাজের মূলধারার কিতাবগুলোতে আজও স্পষ্ট হুকুম হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং তা আধুনিক মানবিক মূল্যবোধের সামনে এই ধর্মীয় ব্যবস্থার নৈতিক অসারতাকেই প্রমাণ করে।
উপসংহার
হাদিসের এই বিবরণগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি মৌলিক ও এড়াতে না পারা প্রশ্ন সামনে চলে আসে: যিনি নিজেকে মহাবিশ্বের মহাজ্ঞানী ও পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার বার্তাবাহক দাবি করছেন, তিনি কীভাবে সেই সৃষ্টিকর্তারই আপন হাতে গড়া জীববৈচিত্র্যকে এভাবে ঢালাও হত্যার নির্দেশ দিতে পারেন? তৎকালীন সপ্তম শতকের আরবের সাধারণ মানুষ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বুঝত না, কিন্তু একজন ঐশ্বরিক জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি তো সমকালীন সেই অজ্ঞতা ও ভয়কে ছাড়িয়ে শাশ্বত হওয়ার কথা ছিল।
অথচ হাদিসের এই অবৈজ্ঞানিক ও নিষ্ঠুর নির্দেশনাসমূহ প্রমাণ করে যে, এগুলো কোনো মহাজাগতিক বাণী নয়; বরং প্রাচীন আরবের মানুষের আদিম ভয়, ভৌগোলিক কুসংস্কার এবং অজ্ঞতার সহজ প্রতিফলন। প্রকৃতির চোখে কোনো সৃষ্টিই ‘অপয়া’ বা ‘শয়তান’ নয়; প্রতিটি জীবেরই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে। আধুনিক মানুষ যখন জীববৈচিত্র্য ও প্রাণী অধিকার নিয়ে ভাবছে, তখন শত শত বছর আগের এই আদিম ও নিষ্ঠুর নির্দেশনাগুলোকে কোনোভাবেই ঐশ্বরিক বা মানবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। এহেন কর্মকাণ্ডের নির্দেশদাতা আর যাই হোক মহাজ্ঞানী দয়ালু সৃষ্টিকর্তার বার্তাবাহক হতে পারে না।
নবী মুহাম্মদের গাছবিদ্বেষ সম্পর্কে জানতে এই ব্লগটি পড়ুন।






অঅজ্ঞানতা বশত নবীর নির্দেশ, মানবিক মর্যাদা বোধ সম্বলিত নয়। যে সব প্রাণী হত্যা করতে বললেন তা কোনো সুস্থ মনের লোকের হতে পারে না। অকাঠ্য প্রমাণ প্রতীয়মান হয়, ধর্মিয় অনুশাসন মানা বর্বরতা।
পড়ে ভালো লাগলো।