বর্তমান যুগে ধর্মীয় গ্রন্থকে অলৌকিক প্রমাণ করতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত একটি কৌশল হলো ধর্মগ্রন্থ থেকে বিজ্ঞান খুঁজে বের করা। বিশেষ করে অনেকেই দাবি করেন যে, কুরআনে সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে এবং সূরা আন-নূরের ৪০ নম্বর আয়াতে আধুনিক বিজ্ঞানের ‘ইন্টারনাল ওয়েভ’ বা সমুদ্রের তলদেশের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা নাকি ১৪০০ বছর আগে মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল। আপাতদৃষ্টিতে এই দাবিটি চমকপ্রদ মনে হলেও ভাষাতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রাচীন তাফসীরের বিচারে এটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত? নিচে এই দাবির বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করা হলো।
১. কুরআনে সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত আয়াতটির ব্যাকরণ, রূপক কাঠামো এবং মূল বক্তব্য
সূরা আন-নূরের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
“অথবা (কাফেরদের আমল) গভীর সমুদ্রের অন্ধকারের মতো, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ওপরে রয়েছে মেঘমালা; অন্ধকারের ওপর অন্ধকার…।”
প্রথমত, এটি কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদানকারী আয়াত নয়, এটি একটি আলঙ্কারিক উপমা (Metaphor)। আয়াতে কাফেরদের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অন্ধকারের গভীরতা বোঝাতে সাগরের ঝোড়ো পরিবেশের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আরবি ব্যাকরণে কোনো কিছুর গাঢ়তা, তীব্রতা বা প্রাচুর্য বোঝাতে ‘স্তরের ওপর স্তর’ (مَوْجٌ\ مِنْ\ وْقِهِ\ مَوْجٌ) ব্যবহার করা অত্যন্ত সাধারণ একটি অলংকার। যেমন—দুঃখের ওপর দুঃখ, বা অন্ধকারের ওপর অন্ধকার। এর মানে এই নয় যে দুঃখের শারীরিক দুটি স্তর আছে! ঠিক তেমনি, উত্তাল সমুদ্রে ঝড়ের সময় অনবরত একটার পর একটা বিশালাকার ঢেউ আছড়ে পড়ে—এটি খালি চোখেই স্পষ্ট দৃশ্যমান। এই চিরচেনা রূপককেই আয়াতে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এটিকে কুরআনে সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কিত কোনো আধুনিক অলৌকিক তথ্য হিসেবে দাবি করা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়।
২. ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভুল উপস্থাপন: প্রাক-ইসলামিক সাগরের জ্ঞান
যারা কুরআনে সমুদ্রবিজ্ঞান দাবি করেন, তাদের প্রধান যুক্তি হলো —“মরুভূমির মানুষের পক্ষে সাগরের তলদেশের অন্ধকার বা তরঙ্গের কথা জানা সম্ভব ছিল না।” যা ইতিহাস ও ভূগোলের চরম অজ্ঞতা থেকে আসে।
আরবদের সামুদ্রিক অভিজ্ঞতা: আরবরা কেবল মরুভূমিতে উট চালাইনি। পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর এবং ওমান উপদ্বীপের আরবরা হাজার বছর ধরে মুক্তা সংগ্রহ (Pearl Diving) এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের সাথে যুক্ত ছিল। মুক্তা ডুবুরিরা খালি চোখে ও বিনা সরঞ্জামে ৪০ থেকে ১০০ ফুট গভীরে ডুব দিত এবং তারা খুব ভালো করেই জানত যে সাগরের গভীরে আলো পৌঁছায় না এবং নিচে তীব্র অন্ধকার থাকে।
আন্তর্জাতিক নাবিকদের ঐতিহ্য: গ্রিক, ফিনিশীয়, রোমান এবং মিশরীয় নাবিকরা হাজার বছর আগে থেকেই গভীর সমুদ্রে দূরপাল্লার জাহাজ চালাত। খ্রিস্টপূর্বকালের বহু গ্রিক কবিতা ও নাবিকদের বর্ণনায় ঝড়ের রাতে “waves upon waves” (তরঙ্গের পর তরঙ্গ) এবং সমুদ্রের তলদেশের নিকষ অন্ধকারের বর্ণনা পাওয়া যায়। ৭ম শতাব্দীর একটি গ্রন্থে তৎকালীন সমুদ্রগামী মানুষের জানা একটি অভিজ্ঞতার রূপক চিত্র উঠে আসা কোনো অলৌকিক বিষয় নয়।
৩. কুরআনে সমুদ্রবিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি: সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ বনাম কুরআনের রূপক
বিজ্ঞানকে টেনে আনার চেষ্টায় এখানে মারাত্মক বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি তৈরি করা হয়েছে।
বিজ্ঞানের ভাষায় Internal Waves হলো ভিন্ন ঘনত্ব (Density) ও তাপমাত্রার পানির স্তরের সীমানায় ঘটে যাওয়া একটি অনুভূমিক আন্দোলন। বিজ্ঞানের এই অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ সমুদ্রের গভীরে রাসায়নিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্যের কারণে ঘটে, যা বায়ুমণ্ডলের বাতাস বা ঝড়ের সাথে সম্পর্কিত নয় এবং এটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য।
অন্যদিকে, আয়াতের বর্ণনায় স্পষ্ট বলা হচ্ছে ঘন মেঘ, ঝোড়ো বাতাস, অন্ধকার এবং তরঙ্গের ওপর তরঙ্গের কথা—যা উপকূলের দৃশ্যমান উত্তাল তরঙ্গের বিবরণ।
জটিল ডেন্সিটি গ্র্যাডিয়েন্ট দ্বারা সৃষ্ট সমুদ্রের তলদেশের অদৃশ্য তরঙ্গকে জোর করে ঝোড়ো বাতাসের দৃশ্যমান ঢেউয়ের ওপর বসিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিক পরিভাষার চরম অপব্যবহার (False Equivalence)।
৪. তাফসীরের বিবর্তন ও ব্যাখ্যাকারীদের চাতুরী
যদি সত্যিই কুরআনে সমুদ্রবিজ্ঞান বা সাগরের তলদেশের এই আধুনিক তথ্য থাকত, তবে ১৪০০ বছরের প্রাচীন কোনো না কোনো তাফসীরকারকের লেখায় অন্তত এর ইঙ্গিত পাওয়া যেত। কিন্তু, বাস্তবতা হলো—তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরে তাবারী, কিংবা কুরতুবীর মতো ধ্রুপদী তাফসীর গ্রন্থগুলোতে প্রাচীন কোনো পণ্ডিতই এখানে ‘পানির ভেতরের অদৃশ্য ঢেউ’ বা সাবমেরিনের কোনো ইঙ্গিত পাননি। তারা সবাই একবাক্যে লিখেছেন, এটি ঝড়ের সময় সমুদ্রের অনবরত আছড়ে পড়া ঢেউ ও ঘন মেঘের অন্ধকার।
বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান যখন সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ আবিষ্কার করল, তখন আধুনিক অপবিজ্ঞান প্রচারকরা প্রাচীন তাফসীর পাশে সরিয়ে রেখে নিজেদের মনমতো আয়াতের অর্থ নতুন করে লিখতে শুরু করলেন। অর্থাৎ, অলৌকিকত্ব কুরআনের বাক্যে নেই, অলৌকিকত্ব কাজ করছে আধুনিক ব্যাখ্যাকারীদের অর্থ বদলানোর কৌশলে।
৫. ‘মনগড়া রূপক’ এবং যেকোনো ধর্ম থেকে বিজ্ঞান বের করার রেসিপি
ইসলামি বিশ্বাসীরা দাবি করতে পারেন, “আমরা তো আক্ষরিক অর্থ নিচ্ছি না, রূপক অর্থ নিচ্ছি।”
ঠিক এখানেই মূল লুপহোল তৈরি হয়। যদি কোনো টেক্সটের মূল আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মেলাতে মনগড়া রূপক অর্থ নেওয়ার লাইসেন্স দেওয়া হয়, তবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ থেকে যেকোনো বিজ্ঞান বের করে ফেলা সম্ভব।
হিন্দুধর্ম: বেদের নাসদীয় সূক্ত বা সৃষ্টির শ্লোকগুলোকে আধুনিক অপবিজ্ঞান প্রচারকারীরা ‘বিগ ব্যাং’ এবং ‘কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন’ বলে দাবি করে।
বাইবেল: বাইবেলের জেনেসিস বা জব বইয়ের কবিভাবাপন্ন লাইনগুলোকে চতুর ব্যাখ্যা দিয়ে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ‘মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ’ হিসেবে চালানো হয়।
গ্রিক পুরাণ: ডেমোক্রিটাসের পরমাণুবাদ বা গ্রিক উপকথা থেকে মনগড়া রূপক বের করে বিজ্ঞানের সাথে মেলানো যায়।
যদি রূপক অর্থ নিজের সুবিধামতো বানানোর সুযোগ থাকে, তবে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড কিংবা গোপাল ভাঁড়ের গল্প থেকেও বিংশ শতাব্দীর কোয়ান্টাম মেকানিক্স বের করা কোনো ব্যাপার নয়।
সারসংক্ষেপ
পরিশেষে বলা যায়, কুরআনে সমুদ্রবিজ্ঞান বা গভীর সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকার দাবিটি মূলত ‘কনফার্মেশন বায়াস’ (Confirmation Bias) এবং ‘প্যারাডোলিয়া’ (Pareidolia)—অর্থাৎ যেখানে যা নেই, নিজের বিশ্বাসের খাতিরে সেখানে তা দেখতে পাওয়া এমনই একটি বিভ্রান্তিকর প্রচারণামাত্র।
বিজ্ঞানের সত্য আবিষ্কৃত হয় প্রাকটিকেল পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও গবেষণাগারে; কোনো প্রাচীন সাহিত্যের রূপক বাক্যের ওপর আধুনিক পরিভাষা জোর করে চাপিয়ে দিয়ে নয়। যুক্তি, ইতিহাস, ব্যাকরণ ও বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে বিচার করলে এটি স্পষ্ট যে, ‘কুরআনে গভীর সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের অলৌকিক তথ্য’ থাকার দাবিটি একটি সম্পূর্ণ অসার, অকাট্যভাবে খণ্ডিত এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণামাত্র।
সূরা নূরের ৪০ নম্বর আয়াতে কি সত্যিই সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ (Internal Waves)-এর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে?
ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিচারে আয়াতে কোনো বৈজ্ঞানিক ‘ইন্টারনাল ওয়েভ’-এর কথা বলা হয়নি। এটি মূলত কাফেরদের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অন্ধকারের গভীরতা বোঝাতে ঝোড়ো সাগরের একটি আলঙ্কারিক উপমা মাত্র (Metaphor)।
১৪০০ বছর পূর্বে আরবের মানুষদের পক্ষে কি সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকারের কথা জানা সম্ভব ছিল?
হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব ছিল। প্রাচীন আরবরা পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে হাজার বছর ধরে মুক্তা সংগ্রহের জন্য ডুবুরি হিসেবে কাজ করত। এছাড়া গ্রিক ও রোমান নাবিকদের মাধ্যমেও গভীর সমুদ্রে ডুব দেওয়া ও সাগরের তলদেশের নিকষ অন্ধকারের অভিজ্ঞতা তৎকালীন যুগে বহুল পরিচিত ছিল।
কুরআনের এমন আরও বৈজ্ঞানিক দাবিগুলোর বস্তুনিষ্ঠ ও পৃথক পৃথক খন্ডন কোথায় পাওয়া যাবে?
কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞান খুঁজে বের করার এমন নানা অসার ও বিভ্রান্তিকর দাবিগুলোর বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ জানতে ভিজিট করুন আমাদের কুরআনে বিজ্ঞান নামক ট্যাগে।





